তুমি চুপ করে থাকে। দরকার আছে কি না আমি বুঝব।
না, প্লিজ ডেকো না। আজকে আনন্দের দিনে ডাক্তার এলে সব মাটি হয়ে যাবে।
এখন তো আর কিছু করাব নেই। ডাক্তাবকে ফোন করে দিয়েছি। এক্ষুনি চলে আসবে।
আবার ফোন করো। আসতে বারণ করে দাও। আমার কিছুই হয়নি।
হয়নি কী করে বুঝব?
হঠাৎ প্রবল চেষ্টায় উঠে বসে প্রীতম, এই দেখো, উঠেছি। এই দেখো হাত, এই দেখে পা। বুকে হাত দাও। দেখো, হাট ঠিক ঠিক চলছে। দাও না হাত।
বিলু তবু সন্দিহান চোখে চায়। কিন্তু প্রীতমের মুখ-চোখে কোনও অস্বাভাবিকতা নেই। তবু সে বলে, তা হলে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলে কেন?
ওটা পড়ার ইমপ্যাকটে। সকলেরই হয়। এখন যাও ডাক্তারকে আসতে বারণ করে দিয়ে এসো।
বলতে বলতে প্রীতম বিলুকে বিছানা থেকে প্রায় ঠেলে নামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে।
বিলু বলে, আচ্ছা, আচ্ছা, যাচ্ছি।
বিলু ঘর থেকে বেরিয়ে গেলে প্রীতম মেয়ের দিকে চেয়ে একটু বুঝদারের হাসি হাসে। লাবুর কান্না থেমেছে। কিন্তু চোখভরা জল নিয়ে সে ফোঁপাচ্ছিল। বাবার দিকে চেয়ে সেই ফোঁপানি আর চোখের জল নিয়েই গাল ভরে হাসল।
প্রীতম জরুরি গলায় বলে, রঙিন কাগজ নেই? না থাকলে বিন্দু দোকান থেকে নিয়ে আসুক। দরজায় কাগজের শিকলি না টাঙালে কি ভাল লাগে?
লাবু হি-হি করে হাসতে থাকে আনন্দে। হাততালি দেয়।
অগত্যা দোকান থেকে রঙিন কাগজ নিয়ে আসে বিন্দু। কাঁচি আর আঠার শিশি নিয়ে বিছানায় শিকলি বানাতে বসে যায় প্রীতম। লাবু মাছির মতো লেগে আছে গায়ের সঙ্গে। বিলু দেখল, কিন্তু কিছু বলল না। শুধু খুব থমথমে দেখাচ্ছিল তাবে।
বিলু বুঝবে না, এ শুধু লাবুর নয়, প্রীতমেরও জন্মদিন। বিলু কেন, পৃথিবীর কেউই কোনওদিন বাইরে থেকে টের পাবে না, প্রীতমের ভিতরে এক ধুন্ধুমার কুরুক্ষেত্রে চলছে কৌরব আর পাণ্ডবের লড়াই। আজ সেই লড়াইতে অনেকখানি হারানো জমি দখল করে নিয়েছে প্রীতম। লাবুর সঙ্গে তাই আজ তারও জন্মদিন।
প্রীতমের শিকলি তৈরির অভ্যাস ছিল ছেলেবেলায়। সরস্বতী পূজোর প্যান্ডেল সে বড় কম সাজায়নি আবার সেই উত্তাপ ফিরে এল আজ। অল্প সময়ের মধ্যেই সে মস্ত মস্ত শিকলি বানিয়ে ফেলে। ঘরদোর সাজাতে সাজাতে এসে বিলুও মাঝে মাঝে অবাক হয়ে দেখছে। কিছু বলছে না, কিন্তু চোখের দৃষ্টিতে অবাক হওয়ার ভাবটা স্পষ্টই ফুটে উঠেছে। একবার মুখ ফুটে বলেই ফেলল,
আমি তো ভেবেছিলাম তোমার অসুখ বলে এবার লাবুর জন্মদিনটা নমো-নমো করে সারব।
প্রীতম একটু বিবর্ণ হয়ে বলে, আমার অসুখ! না, আমার তো অসুখ নেই। আমি ভাল আছি। শোনো বিলু, লাবুর জন্মদিনে কেবল দোকানের খাবার দিয়ে অতিথিদের বিদেয় করাটা কি ভাল?
তবে কী করব? আমার তো খাবার তৈরি করার সময় নেই।
বেশি নয়, অন্তত একটা কোনও আইটেমে এই ঘরের কীর হাতের ছোঁয়া থাকা ভাল।
বিলু একটা ক্লিষ্ট শ্বাস ফেলে বলে, এখন তো সময়ও নেই। তবু হুকুম করো, করব।
প্রীতম হেসে ফেলে। বলে, দুঃখের সঙ্গে নয়, আনন্দের সঙ্গে যদি করতে পারো তা হলে বলি।
বিলু ক্ষীণ একটু হাসল, ঠিক আছে। আনন্দের সঙ্গেই করব না হয়।
বলছিলাম কী, লুচির সঙ্গে একটু বেগুন ভেজে দাও। অতিথির সংখ্যা তো খুব বেশি নয়। পারবে না?
পারব।
ভারী তৃপ্ত হল প্রীতম। গভীর শ্বাস ছাড়ল একটা। মনে মনে বলল, আজ আমারও জন্মদিন! আমারও জন্মদিন! ভাবতে ভাবতে ক্লান্ত শরীরে ঝিমুনি এল। বালিশে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ল প্রীতম।
যখন আবার চোখ মেলল তখন বাইরের ঘরের দরজায় রঙিন শিকলি ঝুলছে, ঘরের এ-কোণ ও-কোণ জোড়া রঙিন কাগজের ফেস্টুন, বেলুনের তোড়া থেকে বহুরঙা আনন্দ ঝরে পড়ছে। বাইরের ঘর গম গম করছে অতিথিদের কলরোলে।
এসো সেজদা।–বলে বিছানায় উঠে বসল প্রীতম। দীপ ঘরে ঢুকে একটা চেয়ার টেনে বিছানার কাছে বসল।
কেমন আছিস, প্রীতম?
ফাইটিং। জোর লড়াই দিচ্ছি সেজদা।
তোকে একটু ব্রাইট দেখাচ্ছে।
ভিতরেও খুব ব্রাইটনেস ফিল করছি।
খুব ভাল। খুব ভাল। তোর কোনওদিন খারাপ কিছু ঘটতেই পারে না। তুই বড় ভাল যে।
প্রীতম লজ্জায় লাল হয়ে বলে, বহুকাল আসোনি, সেজদা। ব্যস্ত ছিলে?
ব্যস্ত? তা বলা যায়। আসলে একটা হুইমজিক্যাল লোকের খিদমত করতে হয় তো। মাঝখানে দুম করে আমেদাবাদ, বোম্বে আর হায়দ্রাবাদ ঘুরে আসতে হল বাসের সঙ্গে।
বেশ চাকরি তোমার, সেজদা। খুব টুর পাও!
দীপনাথ বিষণ্ণ হেসে মাথা নেড়ে বলল, টুর পাওয়াটা তখনই ভাল লাগে যখন দুশ্চিন্তা থাকে।
তোমার আবার দুশ্চিন্তা কী? বিয়ে করোনি, দায়দায়িত্ব নেই। ঝাড়া হাত-পা।
অনেক উঞ্ছবৃত্তি করতে হয় রে, প্রীতম। তুই বুঝবি না।
প্লেট হাতে বিলু খুব ব্যস্তভাবে রান্নাঘরের দিকে যেতে যেতে থমকে দাঁড়িয়ে বলল, ঘুম ভাঙল কখন?
এইমাত্র।—প্রীতম হাসিমুখে বলে, বেগুনভাজা কি করেছ, বিলু?
করিনি আবার! কতার হুকুম, না করে উপায় আছে? তোমাকে এবার কিছু খেতে দিই। অনেকক্ষণ খাওনি।
দাও।—খুব আগ্রহের সঙ্গে বলে প্রীতম, সব আইটেম দিয়ে।
বিলু চোখ কপালে তোলে, সব আইটেম মানে? তোমার জন্য স্টু করা আছে, পাউরুটি টোস্ট করে দিচ্ছি।
প্রীতম প্রবলভাবে মাথা নেড়ে বলে, না, না। আমি লাবুর জন্মদিনের নেমন্তন্ন খাব।
বিলু হাসে, তাই কি হয়? ওসব দোকানের জিনিস। তুমি রুগি মানুষ, সইবে কেন?
ফের বিবর্ণ হয়ে যায় প্রীতম, কে বলল আমি রুগি? তাহলে বেলুন টাঙাল কে? শিকলি বানাল কে?
