ওঃ! তাই তো! আমার ভীষণ ভুল হয়ে গিয়েছিল।
যেভাবে লাবুকে মাঝে মাঝে ভোলায় ঠিক সেইভাবে প্রীতমকে ভুলিয়ে বিলু বলল, আচ্ছা, তাহলে অল্প করে দেব।
বলে বিলু চলে যায়।
বিলুর যাওয়ার দিকে চেয়ে থেকে দীপ মাথা নেড়ে বলে, বিলুকেও আজ একটু ব্রাইট দেখাচ্ছে।
শুধু তোমাকেই দেখাচ্ছে না, সেজদা।
গোটা দুনিয়াটারই ব্রাইটনেস কমে যাচ্ছে রে প্রীতম, আমি কোন ছাড়!
আমার কাছে পৃথিবীর ব্রাইটনেস একটুও কমছে না, বরং বাড়ছে। দিনে দিনে বাড়ছে। বেঁচে থাকাটাই যে কী ভীষণ আনন্দের তা লোকে বোঝে না কেন বলল তো!
দীপনাথ একটু চুপ করে বসে মিটিমিটি হাসে। তারপর আচমকা বলে, আজকাল যেন বিলুর সঙ্গে তোর একটু বেশি ভাবসাব হয়েছে রে, প্রীতম!
যাঃ, কী যে বলো! আমাদের ভাব আবার কবে ছিল না?
সে ছিল ঠান্ডা ভাব। এখন যেন সম্পর্কটা ফ্রিজ থেকে বের করে উনুনে চড়ানো হয়েছে। বেশ হাতে-গরম!
খুব হাসে প্রীতম। রান্নাঘরের দিকে মুখ ঘুরিয়ে উঁচু গলায় বলে, বিলু! বিলু! শুনে যাও সেজদা কী বলছে।
২০. হাসিমুখে, স্নিগ্ধ মনে
হাসিমুখে, স্নিগ্ধ মনে কিছুক্ষণ দীপনাথের দিকে চেয়ে থাকে প্রীতম। বাইরের ঘরে কোনও বাচ্চা বুঝি কচি গলায় ইংরিজি গান গাইছে। বেশ সাহেবি উচ্চারণ। সঙ্গে বোঙ্গো আর মাউথ-অর্গান। মন দিয়ে শোনে প্রীতম। তারপর বলে, ও ঘরে কী হচ্ছে তা আমার খুব দেখতে ইচ্ছে করছে।
দীপনাথ জিজ্ঞেস করল, যাবি?
প্রীতম মাথা নেড়ে বলে, না। থাকগে।
দীপনাথ বলে, নতুন কিছু হচ্ছে না। সেই কেক কাটা, মোমবাতি নেভানো, সাহেবরা যা সব করত আর কী।
বলে একটু হাসে দীপ।
প্রীতমও হাসে। বলে, সাহেবরা দেশ ছেড়ে গেলেও সাহেবদের ভূত তো আর আমাদের ছেড়ে যায়নি সেজদা। আমার জন্মদিনে মা পুজো দিত, পায়েস রাঁধত। আজও তাই করে শুনেছি, আমি কাছে না থাকলেও করে।
থাকগে। তুই এ নিয়ে বিলুকে কিছু বলতে যাস না। তোদের সম্পর্কটা একটু ভাল যাচ্ছে দেখছি। সেটা যেন বজায় থাকে।
ও নিয়ে ভেবো না। আমি কখনও ঝগড়া করি না। তাছাড়া, বিলু যা করে আনন্দ পায় তাই করুক।
বলে প্রীতম ছাদের দিকে চেয়ে একরকম উদাস অভিমান মুখ করে শুয়ে থাকে। অনেকক্ষণ বাদে বলে, তোমার কথা বলো সেজদা, শুনি।
আমার আর কী কথা! নাথিং নিউ।
আমি তোমার কথা মাঝে মাঝেই ভাবি। মনে হয়, তোমার সত্যিই আরও ওপরে ওঠার কথা ছিল। এতদিনে একটা বেশ হোমরাচোমড়া হতে পারতে তুমি। একজন সুন্দরী মহিলাকে বিয়ে করতে পারতো কিছুই করলে না। কেমন যেন উদাস হয়ে যাচ্ছে।
দীপ হাসছিল মৃদু-মৃদু। বলল, দুনিয়াটা যে সস্তা নয় তা কি নিজে এতদিনেও বুঝিসনি প্রীতম?
দুনিয়া সস্তা নয় জানি। কিন্তু তোমার যে ভীষণ রোখ ছিল। স্কুলে তুমি কত ভাল ছাত্র ছিলে। বিলু খুব দ্রুত পায়ে এসে প্রীতমের বিছানায় একটা প্লাস্টিক ফেলে তার ওপর চিনেমাটির বড় প্লেট রেখে বলল, লাগলে বোলো, বিন্দু দেবে।
বলেই বাইরের ঘরের দিকে চলে গেল বিলু। ওই ঘর থেকে হট্টগোল আর গানবাজনার শব্দ আসছিল কিছুক্ষণ ধরে। বিলু সাবধানে মাঝখানের দরজাটা ভেজিয়ে দিল।
প্রীতম প্লেটের দিকে তাকাল, কিন্তু নড়ল না।
খা।—দীপনাথ সস্নেহে বলে।
ইচ্ছে করছে না।
এই তো বলছিলি খিদে পেয়েছে।
এইমাত্র খিদেটা চলে গেল।
দীপনাথ মৃদু হেসে বলে, আসলে বোধ হয় কিছু একটা ভেবে তোর মনটা খারাপ হয়েছে।
প্রীতম ক্লিষ্ট একটু হাসে। বলে, তোমার মতো এত ভাল করে আমাকে কেউ চেনে না মেজদা। তুমি খুব সহজেই আমাকে বুঝতে পারো। কী করে পারো বলো তো!
দূর পাগলা!—দীপনাথ উদাস মুখ করে বলে, আসলে তোকে ছেলেবেলা থেকেই দেখছি তো!
তাই হবে।বলে প্রীতম আবার ছাদের দিকে চেয়ে থাকে। বলে, তোমার কথা ভেবেই আমার মনটা খারাপ লাগছে সেজদা। তোমাকে এত আনসাকসেসফুল দেখব বলে কোনওদিন ভাবিনি।
তবে তুই কী ভেবেছিলি? এয়ারকন্ডিশনড চেম্বার? চার হাজার টাকা মাইনে? ফ্লুয়েন্ট ইংরিজি বলিয়ে বাঙালি-মেম বউ নিয়ে পার্টিতে যাওয়া?
প্রীতম উদাস গলায় বলে, হলেই বা দোষ কী ছিল?
দোষ কিছু নয়। তবে সেরকম হলে এই যেমন তোর কাছটিতে এসে বসে আছি এরকম বসতে পারতাম না। বাইরের ঘর থেকেই হয়তো বিদায় নিতাম। নয়তো লাবুর জন্মদিনে আসতামই না। হয়তো লাবুর জন্মদিনের চেয়েও ইমপর্ট্যান্ট কোনও পার্টি থাকত।
তাও মেনে নিতে রাজি আছি সেজদা। আমার কাছে এসে তোমাকে বসতে হবে না, লাবুর জন্মদিনের কথাও না হয় ভুলে গেলে, তবু সাকসেসফুল হও।
এসব কথায় ঠিক হাসি আসে না দীপনাথের। একটু বিষঃ স্বরে সে বলে, তুই আমাকে খামোখা হিরো বানাচ্ছিস। এর চেয়ে বড় কিছু হওয়ার যোগ্যতাই আমার ছিল না। আমি এই বেশ আছি। আমার উচ্চাকাঙ্ক্ষা নেই, তাই কমপিটিশনও নেই কারও সঙ্গে, আর তাই অযথা উদ্বেগ নেই, অশান্তি নেই। এই একরকম কেটে যাচ্ছে তো।
প্রীতম দীপনাথের মুখের দিকে চেযে বুঝল, প্রসঙ্গটা আর বানানো ঠিক হবে না। দীপনাথ সত্যিকারের অস্বস্তি বোধ করছে। সে আবার ছাদের দিকে চেয়ে রইল। তারপর যেন দীপনাথের নয়, খুব দুরের কাউকে উদ্দেশ্য করে বলল, তোমার মনে আছে সেজদা, একবার আমার দশ বারো বছর বয়সের সময় তুমি আমাকে হাকিমপাড়ার রাস্তায় খুব মেরেছিলে?
দীপনাথ প্রথমে জবাব দিল না। স্থির হয়ে বসে রইল। তারপর মৃদু স্বরে বলল, হুঁ, তখন তো ছেলেমানুষ ছিলাম।
আমি জানি সেজদা, সে কথা ভাবলে তুমি আজও দুঃখ পাবে। কিন্তু মজা কী জানো?
