একটু টলে গেল সে। তারপর আবার সোজা হল। লাবু আর বিন্দুকে অন্যমনস্ক রাখার জন্য সে খুব স্বাভাবিক গলায় জিজ্ঞেস করল, আজ কাদের নেমন্তন্ন করেছ, লাবু?
পাশের ফ্ল্যাটের ঊষারা সবাই। আর সেজোমামা, অরুণমামা, ছোটমামা আরও অনেক আছে, বাবা।
প্রীতম চার-পাঁচ পা এগিয়ে গেল। দরজার চৌকাঠ হাতের নাগালে পেয়ে ধরে ফেলল। বলল, কী কী খাওয়াবে?
মিষ্টি, মাংস, লুচি।
আচ্ছা।–বলে চৌকাঠ পেরিয়ে প্রীতম নিরালম্ব হয়ে আবার কয়েক কদম এগোয়।
পারবে, বাবা?
পারব। ভেবো না।
বিন্দু চেয়ারটা শক্ত করে ধরে। নিচু সিলিঙের আধুনিক ফ্ল্যাট বলে পাখাটাও খুব উঁচুতে নয়। প্রীতম একটু দম নিয়ে ওপরের দিকে চেয়ে স্ট্র্যাটেজিটা ঠিক করে নিল। তারপর হামাগুড়ি দিয়ে চেয়ারে উঠে পড়ল ধীরে ধীরে।
মাথাটা একটু ঘুরছে।
সে বলল, মাংসটা কি বাড়িতেই রান্না হবে?
লাবু বলে, না তো। অরুণমামা বাইরে থেকে মাংস আনবে।
ও। খুব ভাল। আর লুচি?
লুচিও বাইরে থেকে আনা হবে।—এ কথাটা বিন্দু বলল।
ঘরে কিছু হচ্ছে না?
বলতে বলতে প্রীতম চেয়ারের পিঠে ভর দিয়ে ধীরে ধীরে দাঁড়ায়। হাত বাড়িয়ে ফ্যানের বাটিটা ধরেও ফেলে সে।
পারবেন তো?—বিন্দু প্রবল উৎকণ্ঠায় জিজ্ঞেস করে।
খুব পারব। কাজটা মোটেই শক্ত নয়।
বাবা ঠিক পারবে, দেখো। না, বাবা?
হ্যাঁ মা। এবার তোড়াটা আমার হাতে দাও। লাবু তোড়াটা বিন্দুর হাতে দেয়। বিন্দু সেটা তুলে ধরে প্রীতমের নাগালে। বুদ্ধি করে প্রীতম তোড়ার গোড়ায় আলগা সুতো রেখেছে। যাতে বাঁধতে অসুবিধে না হয়।
পা দুটো আবার থরথরিয়ে ওঠে যে। হাঁটু ভেঙে ভেঙে আসছে না? মাথাটা বেভুল চক্কর মারছে।
তুমি কবে থেকে স্কুল যাবে, লাবু?
জানুয়ারি ফার্স্ট উইক।
সুলটা কেমন?
খুব ভাল, বাবা। ইংলিশ মিডিয়াম।
ও।
বলতে বলতে ফ্যানের একটা ব্লেডের সঙ্গে তোড়ার সুতো জড়িয়ে দিতে পারে প্রীতম।
স্কুলে যেতে তোমার ইচ্ছে করে?
হ্যাঁ-অ্যাঁ!
ভয় করে না। আমার তো ছেলেবেলায় স্কুলে যেতে খুব ভয় করত।
আমার করে না। স্কুলে কত খেলা, গল্প, হইচই।
তোমাদের স্কুল খুব ভাল। আমার স্কুলটা তো ভাল ছিল না।
কেন, বাবা?
আমরা পড়া না পারলে স্কুলে খুব মারত।
আমার স্কুলে মারধর নেই।
সেইজন্যই তো ভাল।
বলতে বলতে দ্বিতীয় সূতোটা জড়িয়ে দেয় প্রীতম। অবাধ্য পা দুটোর পথবানি সমানে চলছে। মাথাটা অদ্ভুতভাবে ঘুরছে তার। চোখে ধাঁধা লেগে যাচ্ছে বারবার।
তোমাকে স্কুলে খুব মরত, বাবা?
হ্যাঁ মারত। ৩বে আমার চেয়েও বেশি মার খেত তোমার সেজোমামা। ভীষণ দুষ্টু ছিল।
ছি ছি। সেজামামা কাঁদত না?
বেলুনের তোড়া খুবই সুন্দরভাবে সিলিং ফ্যানটাকে ঢেকে ফেলেছে! প্রীতম পারল। ধোঁয়াটে চোখে নিজের এই তাসম্ভব দুর্দান্ত কীর্তিটি দেখে একটা বিরাট শ্বাস ছাড়ল সে। আর সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত শরীরটা হঠাৎ কাচের পুতুলের মতো ভেঙে পড়ল তার।
কী হল তা বুঝতেও পারল না প্রীতম। টেব পেল চেয়ারটা টাল খেয়ে তাকে নিয়ে পড়ে যাচ্ছে। ঘরের চারটে দেয়াল চোখের ওপর পর পর ঘুরে গেল। তারপর দেখল ঘরের মেঝেটা একশো মাইল বেগে ছুটে আসছে তার দিকে।
আতঙ্কে চিৎকাপ করছে বিন্দু তার লাবু। নিরালম্ব দুই হাতে বাতাস আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করতে করতে পড়ে গেল প্রীতম। হাড্ডিসার শরীব কঠিন শানের ওপর পড়ে ঝনৎকার তুলল।
নীলাভ এক অন্ধকারের মধ্যে অনেকক্ষণ ড়ুব রইল সে। চেতনা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত নয়। সে টির পাচ্ছিল, বহু দূরে কারা যেন কথা বলছে। কেউ কি কাঁদল? কিন্তু সেসব তাকে স্পর্শ করছে না। এক অপরূপ লীলাভ অন্ধকারের মধ্যে অগাধ সাঁতার দেয় প্রীতম। ভারী ঠান্ডা, বড় মোলায়েম ভীণ সুদ এই তান্ধকার। কোনও শব্দ নেই। শুধু বিস্তার আছে। সীমাহীন অগাধ অফুরান আকাশের মতো।
আস্তে আস্তে অন্ধকার থেকে আলোয় চোখ মেলল সে। এত আলো যে চোখে ধাধা লেগে যায়। চালদিকটা প্রবলভাবে তার্থহীন। একটা ঘর, আসবাব, কয়েকটা মুখ। কানও মানে নেই এর। এরা কারা, এসব কী, এ জায়গাটা কোথায়?
কিছুক্ষণ এরকম পন্দের মধ্যে কাটাবার পর পরিপূর্ণ চেতনায় ফিরে এল প্রীতম।
লাবু বিছানার কাছেই ফোঁস ফোঁস করে কাঁদছে। বিন্দু চোখে জলের ঝাপটা দিচ্ছে। বিলু হাত বুলিয়ে দিচ্ছে বুকে। কিন্তু প্রীতম টের পায়, তার শরীরে জীবাণুদের কোলাহল থেমে গেছে। কাছেপিঠে ওত পেতে থাকা মৃত্যুভয়ের বাঘটার গায়ের গন্ধও পাচ্ছে না সে। ভাল হতেই তার সমস্ত মনপ্রাণ ছুটে গেল লাবুর দিকে।
বিলুর দিকে চেয়ে প্রীতম বলল, লাবুকে মারোনি তো? ওর কিন্তু কোনও দোষ নেই।
বিলু প্রীতমের চোখ থেকে অস্বস্তিতে চোখ সরিয়ে নিয়ে বলে, একটা থাপ্পড় দিয়েছি। একটু বাইরে যেতে না যেতেই এসব কী কাণ্ড বাঁধালে তোমরা বলো তো? পাগল হয়ে গেছ নাকি সবাই?
প্রীতম মৃদু স্বরে বলে, লাবুর দোষ নেই। ওকে কেন মারলে?
তবে দোষটা কার? বেলুন বেলুন করে এতক্ষণ ও-ই সকলের মাথা গরম করে তুলেছিল।
ও আমাকে বেলুন ঝোলাতে বলেনি। আমি নিজে থেকেই যা কিছু করেছি।
কিন্তু কেন করতে গেলে? এসব বাহাদুরি কাকে দেখাচ্ছিলে?
লাবুর জন্মদিনে আমারও তো কিছু করতে ইচ্ছে হয়।
আমিই তো বেলুন সাজাতে পারতাম।
আমিও তো পেরেছি।
পেরেছ ঠিকই। কিন্তু পড়ে গিয়ে হাড়গোড ভেঙেছে কি না কিংবা আর কিছু হয়েছে কি না। বুঝতে এখন ডাক্তার ডাকতে হবে।
প্রীতম মাথা নেড়ে বলে, দরকার নেই।
