সন্ধে সাতটা নাগাদ বিলু নার্সিং হোমে ভর্তি হয়ে গেল। তখনও ব্যথা-ট্যথা ওঠেনি ভাল করে। একজন সিস্টার প্রীতমকে বললেন, আপনি বাড়ি চলে যান। এখও অনেক দেরি আছে।
মানুষের আত্মীয়স্বজন কাছে না থাকা যে কত মারাত্মক তা সেদিন হাড়ে-হাড়ে টের পেয়েছিল। প্রীতম। কেউ কাছে নেই, একটা সান্ত্বনার কথা বলার মতো লোক নেই, আগ বাড়িয়ে সাহায্য করার মতোও কেউ নেই, আছে শুধু পকেটভর্তি টাকা। কিন্তু টাকা দিয়ে কি সব কেনা যায়?
ডাক্তার বোস চিকিৎসক খারাপ নন। স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে নামও আছে। কিন্তু লোকটা অসম্ভব টাকা চেনে। অফিসের এক কলিগই প্রীতমকে ডাক্তার বোসের কথা প্রথম বলেছিল। কিন্তু সেই সঙ্গে সে এও বলেছিল, দেখবেন, এ কিন্তু কথায় কথায় সিজারিয়ান করে। সিজারিয়ানে টাকা বেশি তো! আপনি সহজে সিজারিয়ানে রাজি হবেন না।
কিন্তু রাজি হতে হয়ওনি প্রীতমকে। নার্সিং হোমে মাদ্রাজিদের ফ্ল্যাটের ফোন নম্বর দেওয়া ছিল। সারা রাত জেগে দুশ্চিন্তা ভোগ করে যখন সকালের দিকে একটু ঘুমিয়েছে প্রীতম, তখনই তাকে জাগিয়ে সেই বুড়ি খবর দিয়ে গেলেন, অপারেশন করে বিলুর বাচ্চা বের করতে হবে। অবস্থা ভাল নয়। বিছানা ছেড়ে কোনও রকমে পোশাক পরে প্রায় মুক্তকচ্ছ হয়ে ছুটেছিল প্রীতম।
নার্সিং হোমে গিয়ে গাড়লের মতো দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া কিছুই করার ছিল না প্রীতমের। বিলুকে ও টি-তে নিয়ে গেছে। তার অবস্থা কীরকম তা কেউই বলতে পারছে না।
কতগুলো সময় আসে যখন মানুষের কিছুই করার থাকে না। তখন তাকে অসহায়ভাবে দর্শকের আসনে বসে থাকতে হয়। তার সামনে তখন যা করার তা করে যায় ভাগ্য বা নিয়তি। প্রীতম নার্সিং হোমের লাউঞ্জে বসে রইল স্থির হয়ে! শরীর স্থির, কিন্তু মনের মধ্যে এক ঘূর্ণিঝড়। বিশাল, ব্যাপ্ত প্রচণ্ড এক সর্বনাশের ভয়। তার ওপর সে একা, একদম একা। বোজানো চোখের পাতা ভিজিয়ে জল নেমে এল ফোঁটায় ফোঁটায়, বিলুর মৃত্যু সে সহ্য করতে পারবে না। বিড় বিড় করে সে বলল, ওকে বাঁচিয়ে দাও, বাঁচিয়ে দাও। কাকে বলল কে জানে! এমন সময় ডাক্তার বোস এসে কাঁধে হাত রাখলেন।
বিলু তখন হতচেতন। হাতে ছুঁচ, কবজি বাঁধা। আয়া ন্যাকড়ায় জড়ানো রক্তের দলা বাচ্চাটাকে এনে দেখাল। হতবুদ্ধি প্রীতম তখন কী দেখল, কীই-বা বুঝল, তা আজ আর মনে করতে পারে না। শুধু মনে আছে বিলুর হাতে বেঁধানো সেই স্যালাইনের চুঁচ, ফ্যাকাসে মুখ, মৃত্যুনীল চোখের দুটো পাতা। আর রক্তাভ একটা মাংসের পুঁটলির মতো সদ্যোজাত লাবু। কোনও ভালবাসা, টান, স্নেহ কিছুই বোধ করেনি সেদিন।
কিন্তু তারপর যত দিন গেছে, যত লাবুর চোখ-মুখ স্পষ্ট হয়েছে, যত পাকা হয়ে উঠেছে সে ক্রমে ক্রমে, তত তার দিকে ভেসে গেছে প্রীতম। কিন্তু সে কি তিন বছর? এই তো মোটে সেদিনের কথা!
নিজের কৃতিত্বে খুবই তৃপ্ত হল প্রীতম। মোট পনেরোটা বেলুন ফুলিয়েছে সে। তার মধ্যে অন্তত চারটে বিশাল লম্বা, আর চারটে বিশাল গোল। বিছানা উপচে ফোলানো বেলুনগুলো লাফিয়ে লাফিয়ে নেমে ঘরময় ছড়িয়ে পড়ছিল। গোটা দুই দুমদাম ফেটেও গেল।
ছুটে এসে লাবু অবাক।
ওমা, কত কটা ফুলিয়েছ, বাবা!
প্রীতম গর্বের হাসি হেসে বলে, আরও ফোলাব। তুমি বেলুনগুলো কুড়িয়ে আনো, তোড়া বেঁধে দিই। সিলিং থেকে ঝুলিয়ে দিলে সুন্দর দেখাবে।
কে ঝোলাবে? তুমি?
কে ঝোলাবে সেইটেই প্রশ্ন। প্রীতম একটু গম্ভীর হয়ে যায়। তাদের যে কেউ নেই। সে, বিলু আর লাবু। ব্যস, এইটুকুতেই তারা শেষ।
প্রীতম বলল, কেউ না ঝোলালে আমিই ঝুলিয়ে দেব।
পারবে?
পারব। চেষ্টা করলে পারা যায়।
মা বকবে না?
বকলে বকবে।
লাবু বেলুন কুড়িয়ে নেয়। খুব যত্নের সঙ্গে অতিকায় বেলুনের তোড়া বাঁধতে বসে যায় প্রীতম। হাত-পায়ের প্রবল আড়ষ্টতা, শরীরের দুর্বলতা, কোনওটাকেই গ্রাহ্য করে না। দাঁতে দাঁত চেপে সে মনে মনে বলে, ভাল আছি। ভাল আছি। কিছুই হয়নি আমার।
এবং পারেও প্রীতম। গোড়ায় গোড়ায় বেঁধে বেলুনের একটা সুন্দর তোড়া তৈরি করে ফেলে সে।
ভীষণ অবাক হয়ে যায় লাবু। স্তম্ভিত হয়ে বাবার হাতের এই শিল্পকর্ম দেখে সে। দেখতে দেখতে মুগ্ধ হয়ে সে বাবার খুব কাছে চলে আসে। এমনকী বাবার ঊরুর ওপর কনুইয়ের ভর রেখে মাথাটা পাঁজরে ঠেকিয়ে বসে লাবু। তারপর বলে, আরও বেলুন আনব, বাবা?
আগে চলো এটা ঝুলিয়ে দিই।
বিন্দুদিকে ডাকি? ডাকো। ওকে বাইরের ঘরে ফ্যানের নীচে একটা চেয়ার দিতে বলো।
ফ্যানের সঙ্গে বাঁধবে?
হ্যাঁ।
দৌড়ে গিয়ে লাবু বিন্দুকে ধরে আনে।
বিন্দু এমনিতে বেশি কথা বলে না। সারাদিনই সে চুপচাপ। কিন্তু এখন থাকতে না পেরে বলল, আপনি টাঙাবেন? একা বাথরুমে যেতে পারেন না আপনি, টাঙাতে গেলে পড়ে যাবেন যে।
পারব। তুমি চেয়ারটা একটু ধরে থেকো।
আমিও ধরব, বাবা।–লাবু বলল।
সবটাই প্রীতমের কাছে লড়াই। সাংঘাতিক এক লড়াই। কোটি কোটি জীবাণুর বিরুদ্ধে মরণপণ যুদ্ধ।
শোওয়ার ঘর থেকে বসার ঘরের দূরত্ব তার কাছে এখন কয়েক মাইল। বিন্দু বাইরের ঘরে ফ্যানের নীচে একটা কাঠের মজবুত চেয়ার পঁড় করিয়েছে। প্রীতম বিছানা থেকে নেমে তার শুকিয়ে আসা দুই থরোথরো পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়াল। দাঁড়িয়েই মনে হয়, পারব না।
বিন্দু পরদা সরিয়ে দেখছিল। সেও বলল, পারবেন না।
প্রীতমের পা দুটো এই কথা শুনেই যেন লোহার শিকের মতো শক্ত হয়ে গেল। বাতাসে হাত বাড়িয়ে অভ্যাসবশে একটা অবলম্বন খুঁজল প্রীতম। পেল না।
