পারলেই কী? রোগা শরীরে যদি শেষে না সয়?
কিছু হবে না। লাবুর জন্মদিনে আমার তো কিছু করার সাধ্য নেই। এটুকু করতে দাও।
অনেকগুলো চোপসানো বেলুন দু’ হাতের আঁজলায় নিয়ে লাবু একটু থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে আছে বিছানার পাশে। বিকেল হয়ে এসেছে, তবু কেউ বেলুনগুলো ফোলাচ্ছে না দেখে তার একটু দুশ্চিন্তা হয়েছিল বলে সে শেষ পর্যন্ত বাবাকে এসে ধরেছিল, বেলুনগুলো একটু ফুলিয়ে দেবে, বাবা? সবাইকে বলেছি, কেউ শুনছে না। কিন্তু বাবার যে বেলুন ফোলানোও বারণ তা সে বুঝতে পারেনি।
বিলু মেয়ের দিকে ফিরে কঠিন চোখে তাকিয়ে বলল, বেলুন ফোলানোর জন্য আর লোক ছিল? কে তোকে বাবার কাছে আসতে বলেছে?
লাবু ভয়ে কাঁটা হয়ে বলে, বিন্দুদিকে বলেছিলাম। দিল না তো! তুমিও দিচ্ছ না।
তাই বাবার কাছে আসতে হবে?
প্রীতম গম্ভীর স্বরে বলে, ওকে বকছ কেন? ও কী বোঝে?
বিলুও বোঝে না। ওর যখন রাগ হয় তখন ও কিছুই বুঝতে চায় না। না যুক্তি, না ভাল কথা। একনাগাড়ে তখন কেবল নিজের ঝাল ঝেড়ে যায়। লঘু অপরাধে লাবু প্রায়ই অত্যন্ত গুরু দণ্ড ভোগ করে। প্রীতমের সে বড় জ্বালা। তার চেয়ে লাবুর জন্ম না হলেও বুঝি ভাল ছিল!
বিলু প্রীতমের দিকে চকিতে ফিরে দাঁড়িয়ে বলল, খুব বোঝে। তুমি ওর হয়ে একদম কথা বলবে না। সারাদিন আমি ভোগ করছি, শাসন করার অধিকারও আমার হাতেই ছেড়ে দাও।
প্রীতম মৃদু স্বরে বলে, আজকের দিনটা যাক। আজ ওর জন্মদিন।
বিলু মেয়েকে নড়া ধরে সরিয়ে নিতে নিতে বলল, ছেড়ে দিয়ে দিয়েই তো এরকম বেয়াড়া হয়ে উঠেছে।
প্রীতম বালিশে শরীরের ভর ছেড়ে দিল। চোখ বুজল। শরীরে তেমন কোনও ক্লান্তি নেই, কিন্তু এই ছোট্ট ব্যাপারটায় মনটা চুমকে গেল।
বাঁ হাতে ধরা বেলুনটাকে বার বার আঙুলে নিষ্পেষিত করল সে। স্থিতিস্থাপক রবার তার শক্তিহীন আঙুলের ফাঁকে লুকোচুরি খেলল কিছুক্ষণ।
লাবুর আজ তিন বছর পূর্ণ হল। তখন ডিসেম্বরের শেষ। জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ থেকেই লাবু একটা কিন্ডারগার্টেনে পড়তে যাবে। বিন্দু ওকে পৌঁছে দেবে, আবার নিয়ে আসবে ছুটির পর। তারপর একদিন একা একাই স্কুলে যাবে লাবু। ফ্রক ছেড়ে শাড়ি ধরবে। তখন প্রীতম কোথায়?
আমি তখন কোথায়? এ কথা ভাবতে গিয়েই বোধহয় প্রীতমের বুক থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গেই মৃত্যুর ওত পেতে থাকা জীবাণুরা কোলাহল করে ওঠে শরীর জুড়ে। তারা এই সব দুর্বল মুহূর্তগুলির জন্যই তো অপেক্ষা করে থাকে!
প্রীতম বিপদের গন্ধ পেয়ে টপ করে চোখ খোলে। বালিশ থেকে মাথা তুলে চারদিকে চায়। বলে, ভাল আছি। ভাল আছি। খুব ভাল আছি। কিছু হয়নি আমার।
বলতে বলতে হাতের বেলুনটা মুখে নিয়ে এক ফুয়ে টনটন করে ফুলিয়ে তোলে সে। তারপর ডাকে, লাবু! লাবু!
লাবু প্রথমে সাড়া দেয় না। আরও কয়েকবার ডাকে প্রীতম।
লাবু খুব মৃদু, ভিতু পায়ে পরদাটা সরিয়ে জড়োসড়ো হয়ে ঘরে ঢুকে চৌকাঠের কাছেই দাঁড়িয়ে চেয়ে থাকে।
বিছানায় ডিমসুতো রেখে গিয়েছিল লাবু। বেলুনের মুখটা বেঁধে ফেলতে পারল প্রীতম। একগাল হেসে বেলুনটা লাবুকে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল, হয়নি?
লাবুও ছোট ছোট ইঁদুরের মতো দাঁত দেখিয়ে হাসল।
প্রীতম বলল, সব বেলুন নিয়ে এসো, ফুলিয়ে দিই।
মা জানলে?
জানুক। তুমি আনো তো!
অধৈর্যের গলায় বলে প্রীতম! এক্ষুনি কোনও কাজ নিয়ে তার ব্যস্ত হয়ে পড়াটা দরকার। শরীরের ক্ষিপ্ত জীবাণুরা আফ্রিকার নরখাদকের মতো মৃত্যুনাচ নাচছে।
লাবু চোখের পলকে পাশের ঘর থেকে আঁজলা করা বেলুন নিয়ে এসে প্রীতমের বিছানায় ছড়িয়ে দিয়ে বলে, মা বাইরে গেছে। খুব তাড়াতাড়ি করো, বাবা।
মেয়ের সঙ্গে একটু বোঝাপড়ার চোখাচোখি হয় প্রীতমের। দু’জনেই একটু হাসে।
একটা বুটিদার হলুদ বেলুন ফুলিয়ে দিয়ে প্রীতম বলে, তোমার মা কোথায় গেছে?
মিষ্টির দোকানে। অর্ডার দেওয়া ছিল, নিয়ে আসতে গেছে। তুমি দেরি কোরো না।
প্রীতম দেরি করে না। যথেষ্ট দম পাচ্ছে সে। বুকভরা অফুরন্ত বাতাস। মুহুর্মুহু ফুয়ে সে বেলুনগুলি ফুলিয়ে তুলছে। আপনমনে হাসছেও সে। এ যেন এক অদ্ভুত জীবনমরণের খেলা।
মা আসছে কি না বারান্দায় গিয়ে দেখি, বাবা?
দেখো। আসতে দেখলেই একটা টু দিয়ে।
আচ্ছা।–বলে লাবু ছুটে ঝুলবারান্দায় চলে যায়।
আজ তিন বছর পূর্ণ হয়ে গেল লাবুর। কেমন যেন বিশ্বাস হয় না। তিন-তিনটে বছর যেন মাত্র কয়েক মাস বলে মনে হয়।
ডিসেম্বরের শেষ দিকে এক বিকেলে জগুবাজারে বিলুকে নিয়ে দু’-চারটে জিনিস কিনতে বেরিয়েছিল প্রীতম। বিলুর তখন দশমাস চলছে। যে-কোনওদিনই বাচ্চা হতে পারে। নার্সিং হোম ঠিক করা ছিল। ঘন ঘন চেক-আপ চলছিল।
জগুবাজারে এক মনোহারি দোকানে কেনাকাটা করার সময় বিলু হঠাৎ তার কানে কানে বলল, বাড়ি চলো। আমার শরীর ভাল লাগছে না।
কীরকম লাগছে?
ভাল নয়। চিনচিনে ব্যথা।
প্রীতম এক সেকেন্ডও দেরি করেনি। ট্যাক্সি না পেয়ে টানা-রিকশায় বিলুকে তুলে সোজা চলে গেল ডাক্তার বোসের চেম্বারে। বোস তৈরিই ছিলেন। হেসে বললেন, দেরি আছে। তবু এখনই ভরতি করে দেওয়া ভাল। নইলে বেশি রাত হয়ে গেলে বিপদ হতে পারে।
বাড়ি ফিরে এসে তারা নার্সিং হোমে যাওয়ার জন্য গোছগাছ করতে বসল। কিন্তু নিরেট অনভিজ্ঞতার দরুন কী লাগবে না লাগবে তা না জেনে সুটকেস বোঝাই করছিল শাড়ি আর ব্লাউজ আর কসমেটিকসে! বিলু একটু পরেই হাঁফিয়ে গিয়ে শুয়ে পড়ল। প্রীতম তখন বেডিং বাঁধছে। পাশের ফ্ল্যাটের মাদ্রাজি পরিবারের এক বুড়ি এসে এখন সহজ বাংলায় বিলুকে বললেন, তুমি এখন কেবল হাঁটাচলা করতে থাকো, একটুও বসবে না। তারপর প্রীতমকে ধমকে বললেন, নার্সিং হোমে বিছানা আছে। তোমাকে বেডিং নিতে কে বলেছে? সুটকেসে পাউডার-ক্রিম-ফাউন্ডেশন দেখে বুড়ি হেসেই খুন। বললেন, নার্সিং হোমে যা লাগে তা হল প্রচুর পরিমাণে পরিষ্কার ন্যাকড়া। যত পারো ছেড়া কাপড় নাও। আর পরবার জন্য দামি শাড়ি কক্ষনও নেবে না, নার্সিং হোমের জমাদারনি, আয়া, ঝি-রা সব নিয়ে নেবে।
