কাজে আজ মন লাগছিল না শ্রীনাথের। মাঝে মাঝে এক রকম হাঁফ ধরা একঘেয়েমির মতো লাগে। মাইনের টাকাটা এখন আর দিতে হয় না তৃষাকে, তার নিজের খাই-খরচও নেই। সুতরাং টাকাটা জমে বেশ মোটা অঙ্কে দাঁড়িয়েছে। বদ্রী যদি খোঁজ দিতে পারে তবে সে নিজস্ব আলাদা জমি কিনে ভেষজের চাষ করবে। চাকরি করবে না, সারাক্ষণ দাদা মল্লিনাথের বাসায় বাস করার অপরাধবোধ থেকেও মুক্ত হবে।
প্রুফ রিডার হলেও প্রেসে তার কিছু খাতির আছে। খাতিরটা ঠিক তার নয়, পয়সার। সবাই জানে শ্রীনাথবাবুর পয়সা হয়েছে। সেই খাতিরটুকু মাঝে মাঝে ভাঙায় শ্রীনাথ। বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত টেনে-মেনে কাজ করে সুপারভাইজারকে গিয়ে বলল, আমার ভগ্নিপতির বড্ড অসুখ। একটু যেতে হবে।
সুপারভাইজার বোসবাবুর সঙ্গে খুবই খাতির তার। বোসবাবু হেসে-টেসে বলেন, গেলেই হয়। ভগ্নিপতির অসুখের কথাটা বোধহয় বিশ্বাস হল না বোসবাবুর। শ্রীনাথের মনে খিচ থেকে গেল একটু। বিশ্বাস না করলেও বোসবাবুকে দোষ দেওয়া যায় না। মাঝেমধ্যেই আলতু-ফালতু অজুহাত দেখিয়ে সে অফিস থেকে কেটে পড়ে।
বাইরে শীতের ক্ষণস্থায়ী বেলা ফুরিয়ে সন্ধে নেমে এসেছে। বেশ শীত। শরীরের মধ্যে সকাল থেকে জিয়োল মাছের মতো ছটফট করে দাপাচ্ছে অদম্য সেই কামের তাড়না। তৃষার সঙ্গে সম্পর্কের জটিলতার দরুন শরীরের ব্যাপারটা বড় একটা হয়ে ওঠে না। তুষার প্রতি তার যেমন নিস্পৃহতা, তার প্রতি তুষারও তাই। কিন্তু তা হলে চল্লিশ-বিয়াল্লিশে তার পুরুষত্ব তো আর মরে যায়নি?
প্রীতমকে একবার দেখতে যাওয়া উচিত, এটা রাস্তায় দাঁড়িয়ে মনকে বোঝাল সে। এই মধ্য কলকাতা থেকে ভবানীপুর যে খুব একটা দূর তাও নয়। কিন্তু গণ-বিস্ফোরণে কলকাতার রাস্তাঘাট এত গিজগিজে, ট্রাম-বাসের এমনই আসন্নপ্রসবার চেহারা এবং এত ধীর তাদের গতি যে কোথাও যেতে ইচ্ছেটাই জাগে না।
ইচ্ছে-অনিচ্ছের মধ্যে খানিক হেঁটে সে গিরিশ পার্কের পিছনের এলাকায় চলে এল। এখানে সে যে নিয়মিত আসে তা নয়, তবে মাঝে মধ্যে কাম তাড়া করলে চলে আসে। মেয়েমানুষের দরদাম ঠিক করতে পারে না সে। যা চায় প্রায় দিয়ে দেয় এবং বোধহয় খুব ঠকে যায়। এ পর্যন্ত যে তিন-চারজন বেশ্যার কাছে সে গেছে তাদের মধ্যে সবচেয়ে কম বিপজ্জনক মনে হয়েছে দানা নামে। ত্রিশ-বত্রিশ বছরের একটি মেয়েকে। একটু বেশি কথা বলে, একটু বোকাও, কিন্তু কেমন একটু ধর্মভাব আছে তার।
সাড়ে পাঁচটাও বাজেনি ভাল করে। এটা ঠিক সময় নয়। তবু এ সময়টাই ভাল। অব্যবহৃত মেয়েদের পেতে হলে একটু আগে আসা ভাল।
এ পাড়াতেও গিজগিজ করছে লোকজন। বেশির ভাগই মতলববাজ লোক। মেয়ের দালাল, গুন্ডা, মাতাল, কামুক। সে এদেরই একজন, এ কথা ভাবতে তার অহংবোধে লাগে। কিন্তু বাস্তববোধ তার কিছু কম নয়। মুখটা রুমালে সামান্য আড়াল করে সে গলি থেকে আরও গহিন গলির অন্ধকারে ঢুকে যেতে লাগল।
দোতলা বাড়িটার ভাঙা সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে হাঁফ ছাডে সে। কিছু ক্লান্তি আর উদ্বেগে শরীরটা অস্থির। বুকে হৃৎপিণ্ডের শব্দ শোনা যাচ্ছে। দীনা তার ঘরের বাইরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। মুখচোখের অবস্থা ভাল নয়। বোধহয় মন খারাপ। ওর একটা বছর দশ-বারোর মেয়ে আছে। তার কিছু হয়নি তো? হলে আজ জমবে না।
দীনা তাকে চিনতে পারল। ডাকতেই মুখ ফিবিয়ে ভ্রু কুঁচকে দেখল তাকে। তারপর ক্রু সহজ হয়ে গেল। বলল, অনেক দিন পর না?
তুমি ভাল আছ?–জিজ্ঞেস করে শ্রীনাথ।
ভাল আর কী? আসুন।
ভিতরে ঢুকে দীনা কপাট ভেজিয়ে দিয়ে বলে, কী কাণ্ড শুনবেন?
কী?
সে এক কাণ্ডই।
বলে দীনা হেসে ফেলে। দেখতে ভাল কিছু নয় মেয়েটা। সাদামাটা পেঁয়ো চেহারা। রং কালো। মাঝারি লম্বা, মাঝারি গড়ন। কিছু বৈশিষ্ট্য নেই। তাই খদ্দেরেরও বাঁধাবাঁধি নেই। হেসে ফের গম্ভীর হয়ে গিয়ে বলল, খুব রাগ হচ্ছে আমার, হাসিও পাচ্ছে। দুটো স্কুলে-পড়া ছেলে এসেছিল আজ জানেন?
বটে?–শ্রীনাথ তেমন আগ্রহ দেখায় না। স্কুল কলেজের ছেলেরা আজকাল হরবখত বেশ্যাপাড়ায় যায়। কিছু অস্বাভাবিক নয়।
দীনা চৌকির বিছানায় বসে খুব চিন্তিত মুখে বলে, চৌদ্দ-পনেরোর বেশি বয়স নয়, গায়ে স্কুলের পোশাক পর্যন্ত রয়েছে। ঠিক দুপুরে কড়া নাড়তেই দরজা খুলে দেখি দুই মূর্তি। প্রথমে ভেবেছিলাম পথ ভুল করে এসেছে বা জলতেষ্টা পেয়েছে বলে ঢুকে পড়েছে। তারপর দেখি তোতলাচ্ছে, আগড়ুম বাগড়ুম বলছে। বলতে গেলে ছেলের বয়সি। যখন বুঝতে পারলুম মতলব অন্যরকম, তখন এমন রাগ হল! বেঁটে ছাতাটা হাতের কাছে পেয়ে সেইটে দিয়ে পয়লা ছেলেটাকে দিলুম কষে ঘা কতক। দুটোয় মিলে এমন পড়িমরি করে পালাল না!
দীনা হেসে খুন হতে লাগল বলতে বলতে। তারপর ফের গম্ভীর হয়ে বলল, কিন্তু অন্য একটা কথা ভেবে ভারী ভয় হয়, জানেন! ভাবি, আজ না হয় তাড়ালুম। কিন্তু রোজ যদি ওরকম সব ছেলেরা আসে? একদিন হয়তো আর তাড়াব না।
শ্রীনাথ কিছু বিরক্ত হয়ে বলে, আজই বা তাড়ালে কেন? ওরা তো কারও না কারও কাছে যাবেই। মাঝখানে তোমার রোজগারটা গেল।
দীনা ঠোঁট উলটে বলে, ঝাঁটা মারি রোজগারের মুখে! বেশ্যা বলে কি ঘেন্নাপিত্তি নেই?
শ্রীনাথ দার্শনিকের মতো একটু হাসে। বেশ্যা বলে নয়, আজকাল এই দুনিয়ায় কোনও মানুষেরই ঘেন্নাপিত্তি খুব বেশিদিন থাকে না।
প্রীতমকে দেখতে যাওয়া হল না। বাড়ি ফিরতে বেশ একটু রাত হয়ে গেল শ্রীনাথের। স্টেশনে নেমে শীতে অন্ধকারে বাড়ির দিকে হাঁটতে হাঁটতে ভাবছিল, এই রাতে গিয়ে কোন অজুহাতে স্নানের জন্য গরম জল চাইবে। স্নান না করলেই নয়। যতবার বেশ্যাপাড়ায় গেছে ততবার ফিরে এসে স্নান করতেই হয়েছে তাকে। নইলে ভারী খিতখিত করে।
