রোমান্টিক ইডিয়ট। সেন্টিমেন্টাল ফুল।
শুনুন মিসেস বোস, আমার কথাটা একটু শুনুন। যখন আমি ক্লাস নাইনে পড়ি তখন একটা হারমাদ ছেলের সঙ্গে আমার লড়াই বাধে। খুবই সাংঘাতিক ছেলে। তার নাম ছিল সুকু। সে অসম্ভব ভাল সাইকেল চালাত, ছিল খুবই ভাল স্পোর্টসম্যান। তার গায়ে ছিল আমার দ্বিগুণ জোর। কী নিয়ে তার সঙ্গে আমার প্রথম লেগেছিল মনে নেই। বোধহয় বেঞ্চে জায়গা দখল করা নিয়ে। প্রথমে ছোটখাটো তর্কাতর্কি। একদিন মনে আছে, সে সামনের বেঞ্চে বসে পিছনের ডেস্কে আমার বইয়ের ওপর ইচ্ছে করে কনুই তুলে দিয়ে ভর রেখেছিল। আমি তার কনুই ঠেলে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম। সে নির্বিকারভাবে পিছনে ফিরে আমার বইগুলো টান মেরে নীচে ফেলে দিল। ক্লাসে তখন মাস্টারমশাইও ছিলেন। কিন্তু আমি তার বেপরোয়া নির্ভীক হাবভাব দেখে নালিশ করারও সাহস পেলাম না। কিন্তু ঝগড়াটার শেষ সেখানেও হল না। আমার মধ্যে অপমানবোধ বড় তীব্র কাজ করছিল। পরদিন আমি সকলের আগেই স্কুলে পৌঁছে সুকুর সামনের বেঞ্চে বসলাম এবং মাস্টারমশাই ক্লাসে আসার পর ইচ্ছে করেই সুকুর বইয়ের ওপর কনুই তুলে দিলাম; কী হল জানেন? সুকু তার বইগুলো এক হ্যাঁচকা টানে সরিয়ে নিল। আমি পিছনে হেলে ধড়াস করে ডেস্কে ধাক্কা খেলাম। ডেস্কের তলা দিয়ে সুকু একটা লাথিও মেরেছিল কোমরে। সেদিনও কিছু বলিনি ভয়ে। কিন্তু ক্লাসে সবাই সুকুর আর আমার ঝগড়ার কথা জেনে গেল। সবাই তাকাত, হাসত, মজা পেত। বলা বাহুল্য, নামকরা স্পোর্টসম্যান বলে সবাই ছিল সুকুরই পক্ষে। এরপর থেকে ক্লাসে প্রায়ই সুকু আর তার কয়েকজন চেলাচামুন্ডা, আমাকে হাবা বলে ডাকতে শুরু করেছিল। অঙ্ক কষছি, ট্রানস্লেশন করছি, ফাঁকে ফাঁকে শ্বাসবায়ুর শব্দের সঙ্গে কানে আসত, এই হাবা! এমন কিছু খারাপ কথা নয়, এখন বুঝি। কিন্তু তখন পিত্তি জ্বলে যেত শুনে। উলটে কিছু বলতে হয় বলে আমি গালাগাল দেওয়া শুরু করি। প্রথম বলতাম শালা, গাধা, গোরু, এইসব। পরে একদিন বেশি রাগ হওয়ায় মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, শুয়োরের বাচ্চা। হেডসারের ক্লাস ছিল। উনি চলে যেতেই রাগে টকটকে রাঙা মুখে উঠে এল সুকু। কোনও কথা না বলে আমার জামা ধরে এক ঝটকায় পঁড় করিয়ে কী জোর এক চড় মারল যে তা বলে বোঝানো যাবে না। মাথা ঘুরে গেল চড় খেয়ে। আর চড় খেয়ে যখন আমার বুদ্ধিনাশ হয়ে গেছে তখনই সুকুর সাঙাতরা এসে আমার পরনের হাফপ্যান্ট খুলে নিয়ে বাইরে ফেলে দিয়ে এল। সম্পূর্ণ গাড়লের মতো হতবুদ্ধি হয়ে আমি বসে ছিলাম। গায়ে শুধু শার্ট, পরনে আর কিছু নেই। ক্লাসসুদ্ধ ছেলে হাততালি দিয়ে চেঁচাচ্ছে। পৃথিবীতে এর চেয়ে বেশি যেন আর অপমান নেই। দু’হাতে লজ্জা ঢেকে আমি হতভম্বের মতো তখন জানালা দিয়ে বাইরে চাইলাম। সেই প্রথম যেন আবিষ্কার করলাম উত্তরের হিমালয়কে। দেখলাম পৃথিবীর সব তুচ্ছতাকে অতিক্রম করে কত উঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ওই মহান পর্বত। জানালা দিয়ে সে যেন হাত বাড়িয়ে দিল আমার দিকে। বিড়বিড় করে বড় অভিমানে আমি বললাম, এরা তো কেউ আমার নয়। এরা বড় যন্ত্রণা দেয় আমাকে। আমি একদিন তোমার কাছে চলে যাব। সেই থেকে, মিসেস বোস, সেই থেকে ওই পাহাড় আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। কেউ অপমান করলেই আমি পাহাড়ের কথা ভাবি। কেবলই মনে হয়, আমি একদিন সব ক্ষুদ্রতা ত্যাগ করে পাহাড়ে চলে যাব। যখন যাব তখন আর কোনও অপমানই আমার গায়ে লেগে থাকবে না।
ঘুমের মধ্যেও দীপের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় ঠিকই কাজ করছিল। হঠাৎ ঘুম ভেঙে কলের পুতুলের মতো সোজা হয়ে বসল সে। সূর্যের শেষ একটু আলো গাছের গাঢ় ছায়া ভেদ করে ঘোলা জলের মতো ছড়িয়ে আছে এখনও। লাঞ্চ কখন শেষ হয়ে গেছে।
যে জায়গায় দীপ শুয়ে ছিল সেটা বাগানের শেষ প্রান্তে, একটা পুকুর পেরিয়ে। এখান থেকে কিছুই দেখা যায় না।
প্রচণ্ড শীত করছিল তার। মাটির ওপর শুয়ে থাকায় জামা কাপড়ে একটা ভেজা-ভেজা ভাব। শুকনো মরা ঘাস লেগে আছে গায়ে।
উঠে সে দ্রুত পায়ে বাড়ির সামনের চাতালে চলে আসে।
দেখে কোনও লোক নেই। একটা গাড়িও নেই। সবাই চলে গেছে।
দীপনাথ একটু হতবুদ্ধি হয়ে যায়। পার্টি সন্ধে পর্যন্ত চলার কথা ছিল। তবে কি সাহেবরা মদ খেয়ে বেশি মাত্রায় বেচাল হয়ে পড়েছিল?
তাই হবে।
রাস্তায় এসে সে দেখতে পায়, একটা ভ্যানগাড়িতে কোরারের লোকেরা মালপত্র তুলছে।
সে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, পার্টি ভেঙে গেল ভাই?
একটা ছেলে খুব সুন্দর করে হেসে বলে, হ্যাঁ! সাহেবরা মাতাল হয়ে গিয়েছিলেন।
দীপনাথ মনে মনে হিসেব কষছিল। তাকে ফিরতে হবে। কেউ তাকে ফেলে গেছে বলেই তো সে আর পড়ে থাকতে পারে না।
সে বলল, আমি বোস সাহেবের সেক্রেটারি। একটা জরুরি কাজে আটকে পড়েছিলাম। তোমাদের গাড়িতে আমাকে একটু পৌঁছে দাও।
কেটারারের লোকেরা রাজি হচ্ছিল না। সন্দেহ করছে।
পাঁচটা টাকা কবুল করে এবং প্রায় হাতে-পায়ে ধরে অবশেষে জায়গা পেয়ে গেল দীপ। ড্রাইভারের পাশেই। খুব ঠাসাঠাসি চাপাচাপির মধ্যে বসে সে বন্দুকগুলোর কথা ভাবছিল। বন্দুকগুলো ঠিকঠাকমতো ওরা নিয়ে গেছে তো? ফেরার সময়ে বন্দুকগুলো ধরে বসে ছিলই বা কে?
১৯. তুমি বেলুন ফোলাবে
তুমি বেলুন ফোলাবে? না, না, কখনও নয়! কখনও নয়!–বলে বিলু তেড়ে এল।
বেলুন-ধরা রোগা হাতখানা বিলুর নাগালের বাইরে সরিয়ে নিয়ে প্রীতম একটু ছেলেমানুষের হাসি হেসে বলল, পারব। দেখো, ঠিক পারব।
