দাদুর সঙ্গে দেখা করে যাবে না? আজ ছোটকাকু দাদুকে নিয়ে আসবে যে!
আজ যদি দেখা না হয় তবে অন্য দিন আসব।
সজল গেল না। মঞ্জু দৌড়ে চলে গেল মণিদীপার গল্প শুনতে। দীপ আনমনে চিন্তা করে, মণিদীপা ওদেরও কমিউনিজম বোঝাচ্ছে না তোর
রান্নাঘরের দরজায় গিয়ে দীপনাথ ডাকল, বউদি!
তৃষা দারুণ সুন্দর গন্ধ ছড়িয়ে কিমা রান্না করছিল। দুটো বিশাল চোখে ফিরে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল, অন্যের বউ নিয়ে টানাটানি না করে নিজে একটা বউ জুটিয়ে নিলেই তো হয়।
ভীষণ বিব্রত বোধ করে লাল হয়ে গেল দীপনাথ। বলল, যাঃ, কী যে বলো!
অন্যের বউটি অবশ্য সাংঘাতিক স্মার্ট। সুন্দরীও।
তাতেই বা আমার কী?
তৃষা রান্নার ভার বৃন্দার হাতে ছেড়ে বেরিয়ে আসে। বলে, এসো, আমার ঘরে বসবে।
দীপনাথ তুমার পিছু পিছু এসে যে ঘরটায় ঢোকে সেটাতেই এক সময় বড়দা মল্লিনাথ থাকত। চমৎকার পাকা ঘর। আবলুস কাঠের দেয়াল-আলমারি, বন্দুকের স্ট্যান্ড থেকে এইচ এম ভি-র বাক্স গ্রামোফোনটি পর্যন্ত এখনও সযত্নে সাজানো। বিশাল একখানা চিত্র-বিচিত্র খাট। একপাশে টেবিল। হল্যান্ডের ফিলিপস রেডিয়ো।
দীপনাথ বহুকাল বাদে এই ঘরে এল। তৃষা বলল, অবশ্য রংটা আমার মতোই।
কার রং?–দীপ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে।
মণিদীপার। তোমার বন্ধুর বউ নাকি?
বন্ধু নয়! বস। ওপরওয়ালা।
বস মানে জানি মশাই, বাংলা করে বলতে হবে না।
দীপ হাসে। বলে, আমি আনিনি। উনিই আসতে চাইলেন।
আজকালকার মেয়েদের কোনও জড়তা নেই। লজ্জা-উজ্জাও কম। আমরা হলে পাঁচটা কথা উঠে পড়ত।
কথা ওঠার ব্যাপার নয় বউদি। দিনের বেলায় সামান্য আউটিং। দোষের কিছু দেখলে নাকি?
তৃষা মাথা নেড়ে বলে, দোষের কী দেখব আবার, তবে একটা জিনিস দেখে একটু মজা পেয়েছি।
কী সেটা?
মেয়েটা দু’-পাঁচ মিনিট পর পরই তোমার খোঁজ করছে। উনি কোথায় গেলেন? দূরে যাননি তো? উনি যদি চা খান তা হলে আমিও খাব।
দীপনাথ আবার লাল হয়। বুকের মধ্যে এমন একটা শিবশিৱানি ওঠে যে গায়ে কাঁটা দিতে থাকে।
১৮. তৃষা দীপনাথকে বসিয়ে রেখে
তৃষা দীপনাথকে বসিয়ে রেখে খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থাই করতে গেল বোধহয়।
মল্লিনাথের এই ঘরখানায় বসে হারানো বহু স্মৃতিই মনে পড়ার কথা। আশ্চর্য, দীপনাথ একবারও মল্লিনাথের কথা ভাবল না! তার শরীর বার বার কাঁটা দিল এক শিহবনে। মণিদীপা তার খোঁজ করছে।
সত্য বটে দীপনাথের ভিতরে এক সময় ইস্পাত ছিল। তাদের সব ভাইবোনের মধ্যেই কিছুটা করে আছে। একমাত্র ব্যতিক্রম হতে পারে মেজদা শ্রীনাথ। কিন্তু দীপনাথের সেই ইস্পাতই বা কোথায় গেল?
ভিতর থেকে দীর্দাশ্বাস ফেলে অন্য এক দীপনাথ বলল, জং ধরে গেছে হে!
দীপনাথ বলল, অত সস্তা নয়। আমি সহজে হার মানি না।
হার মেনেছ কে বলল? বরং তথ্য বিশ্লেষণ করে একটু ঘুরিয়ে বলা যায়, তুমি ভয় করেছ! হার মেনেছে অন্য পক্ষ।
ইয়ারকি নয়! আমি কারও প্রেমে পড়িনি।
তাও বলা হচ্ছে না। ঘুরিয়ে বলতে গেলে অন্য পক্ষই পড়েছে। তাতে তো তোমার দোষ ধরা যায় না।
অন্য পক্ষের দায়-দায়িত্ব তো আমি নিতে পারি না। কে কবে কার প্রেমে পড়বে আর দোষটা আমার ঘাড়ে চাপাবে–
ধীরে বন্ধু, ধীরে। একটু ঠান্ডা মাথায় ভাবব। মণিদীপার বয়স কত বলো তো?
কে জানে? কুড়ি থেকে পঁচিশের মধ্যে হবে বোধহয়।
তা এ বয়সে আজকালকার মেয়েদের খুকিই বলা যায়।
যত খুকি ভাবছ তত নয়।
তবু বলছি ততটা পাকেনি এখনও। মনটা কাঁচা আছে। জাম্বুবান স্বামীটার জন্য একটা আনহ্যাপি লাইফ লিড করতে হচ্ছে বলে রাগে আক্রোশে প্রতিহিংসায় মাথাটাও ঠিক নেই কিনা।
মিস্টার বোসকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। এই মহিলাও যে সাংঘাতিক বিপ্লবী।
স্বামী সিমপ্যাথিটিক হলে বিপ্লবটা এমন চাগিয়ে উঠত না মাথার মধ্যে। যাকগে যা বলছিলাম, মিসেস বোসের কাচা মাথাটা খাওয়া এমন কিছু কঠিন কাজ ছিল না। তুমি ছাড়া অন্য কেউ হলেও খেতে পারত।
এই কথায় দীপের একটু অভিমান হল। বলল, তা হতে পারে। তবে মাথাটা আমার খাওয়ার ইচ্ছে নেই।
একেবারেই নেই কি?
মোটেই নেই।
তা হলে বা তুমি মুক্ত পূৰুয। অত লজ্জা শরম পাচ্ছ কেন?
আমি মুক্ত পুরুষই।
তবু বলছি, ভিতরকার মরচে-পড়া ইস্পাতে একটু শান দাও। শক্ত হও। নইলে আমও যাবে, ছালাও যাবে। চাকরিও নট, মণিদাপাও নট।
যায় যাক। পরোয়া করি না।
চাকরিব পরোয়া কবো না করো, মণিদীপার পরোয়া একটু-আধটু করছ, উনিও করছেন। বউদির চোখে ধরাও পড়ে গেছে। এখন বেশ সাবধানে পা ফেলো।
আমার কোন দুর্বলতা নেই। এই মুহূর্তে সব দুর্বলতা ঝেড়ে ফেলে দিলাম।
বলে দীপনাথ খুব বুক চিতিয়ে উঠে এল। আর সেই মুহূর্তেই মল্লিনাথের বার্মা সেগুনের বিশাল আলমারির গায়ে লাগানো খাঁটি বেলজিয়াম আয়নায় তার আপাদমস্তক প্রতিবিম্ব সামনে দাঁড়াল।
ব্যায়াম-ট্যায়াম করে এবং দৌড়ঝাপের মধ্যে থেকে তার চেহারাটা হয়েছে গুন্ডা শ্রেণির। খুবই শক্তপোক্ত। লম্বাটে আখাম্বা। মুখশ্রীতে কিছু রুক্ষত সত্ত্বেও বংশগত লাবণ্য কিছু রয়ে গেছে। চেহারাটা মনোযোগ দিয়ে দেখছিল সে। বেশ খানিকক্ষণ খুঁটিয়ে দেখে মন থেকে এক বিচারপতি রায় দিল, এই চেহারার পুরুষ মানুষের প্রেমে পড়তে কোনও মেয়েরই বাধা নেই।
ভালই গো ভালই। অত দেখতে হয় না নিজেকে।–বলে তৃষা পিছন দিকে একটা টুলের ওপর খাবারের রেকাবি রাখল।
খুবই চমকে গিয়েছিল দীপনাথ। হেসে ফেলে বলল, চেহারা নয়। আয়নাটা দেখছিলাম। খাঁটি বেলজিয়াম গ্লাস।
