দীপনাথ একটু মুশকিলে পড়ে যায়। কারও হাঁড়ির খবরে তার তেমন আগ্রহ নেই। তার ওপর। এই বাচ্চা ভাইপোটার মুখ থেকে পাকা পাকা কথা শুনতে তার ভাল লাগে না। কিন্তু এ বাড়ির আবহাওয়া যে খুব পরিশ্রুত নয় তা সে জানে। যদি এদের জন্য কিছু করা যেত!
দীপ বলল, ঝগড়া নয়। মা-বাবার মধ্যে ওরকম একটু-আধটু হয়েই থাকে।
সজল মাথা নেড়ে বলে, আমার বন্ধুদের মা-বাবার মধ্যে ওরকম হয় না তো।
কী নিয়ে তোর মা-বাবার এত ঝগড়া?
মুখে মুখে ঝগড়া হয় না। কিন্তু দু’জনের সম্পর্ক ভাল না। সবাই জানে। বাবা তো এ বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে।
তোকে কে বলল?
আমরা জানি। বদ্রীকাকু আছে না, ওই যে লাইনের ওধারে থাকে, সে ই বলেছে।
বদ্রীটা আবার কে? যা হোক, হবে কেউ। ভাবে দীপ।
সজল বলে, মা একদিন বদ্রীকাকুকে ডাকিয়ে এনে খুব ধমকাল। বদ্রীকাকু নাকি বাবার জন্য চারদিকে জমি খুজছিল। জমি পেলেই বাবা চলে যাবে।
ও।
মা অবশ্য বদ্রীকাকুকে এমন ভয় দেখিয়েছে যে আর এদিকে আসে না। ছোটকাকুর মতোই অবস্থা।
কেন, ছোটকাকুর আবার কী হয়েছিল?
বাঃ, ছোটকাকুকে দুটো লোক মিলে মারল না? এখনও কেস চলছে তাই নিয়ে।
সে জানি। তার সঙ্গে তোর মায়ের সম্পর্ক কী?
সেই লোক দুটোকে যে আমি চিনি!
তারা কারা? কী নাম?
বললে মা আমাকে মেরে ফেলবে।
বিরক্তি চেপে দীপ বলে, তা হলে বলিস না।
সজল একটু দ্বিধায় পড়ে। আসলে এই বড়কাকুকে তার ভীষণ ভাল লেগে গেছে। একে সে সব কথা বলতে চায়। সে তাই চুপি চুপি বলল, এর পরের বার যখন তুমি আসবে তখন চিনিয়ে দেব। ওই ইটখোলার দিকে থাকে।
দীপ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, চিনেই বা কী করব? তুই বরং ওসব কাউকে বলিস না। সেই লোক দুটো কি তোর মায়ের লোক?
না তো কী? মদনজেঠুর লোক। মদনজেঠুকে বলে মা ওদের কাজে লাগিয়েছিল।
পুকুরপাড় ছেড়ে সবজিবাগানের ধার ঘেঁষে একটা কুলগাছের ছায়ায় এসে পড়েছিল দু’জন। সবজিবাগানে মুনিশ খাটছে। ভারী সুন্দর ফুলকপি বাঁধাকপি হয়ে আছে। এক ফালি জমি ঘন সবুজ ধনেপাতায় ছাওয়া। কঁঠালের ডালে মস্ত মৌচাকে গুন গুন শব্দ।
কিন্তু এই সুন্দর দৃশ্যের ওপর যেন এক বিষণ্ণতার পরদা ঠেলে দিয়েছে কে। দীপ আধখানা চোখে দেখছে। মন অন্যত্র।
সে জিজ্ঞেস করল, তুই খেলাধুলো করিস না?
খুব করি।
কী খেলিস?
ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন, সিজনের সময় ফুটবল।
আবার যখন আসব তখন তোর জন্য কী নিয়ে আসব বল তো?
একটা এয়ারগান আনবে? যা দিয়ে পাখি মারা যায়?
পাখি মারবি কেন? টারগেট প্র্যাকটিস করবি?
সরিৎমামা বলেছে আর কিছুদিন পরেই আমাকে আসল বন্দুক চালাতে শিখিয়ে দেবে।
আসল বন্দুক পাবি কোথায়?
জেঠুর বন্দুক থানায় জমা আছে না? মা সেইটে আনাচ্ছে।
বন্দুক দিয়ে তোর মা কী করবে?
আমাদের নাকি অনেক শত্রু।
দীপনাথ হেসে ফেলে। বলে, তাই নাকি?
সজল হাসে না। গম্ভীর মুখ করে বলে, এ জায়গায় কেউ আমাদের দু চোখে দেখতে পারে না। বিশেষ করে মাকে।
কেন?
সবাই বলে, মা নাকি ভাল নয়।
দীপ গম্ভীর হয়ে বলে, ছিঃ সজল, ওসব কখনও মনে ভাববে না। বলবেও না কাউকে। তোমার মাকে আমি বহুকাল চিনি। উনি খুব ভাল।
আমি তো খারাপ বলিনি। লোকে বলে।
লোকে যা খুশি বলুক, কান দিয়ো না।
তুমি এখানে এসে থাকবে, কাকু? থাকো না, খুব মজা হবে তা হলো এখানে একটাও ভাল লোক নেই।
আমি যে ভাল তোকে কে বলল?
আমি জানি। মাও বলে।
মা কী বলে?
বলে ভাইয়েদের মধ্যে সবচেয়ে ভাল হল বড় ঠাকুরপো। সাতে-পাঁচে থাকে না, নিজের মনে আছে।
বলে বুঝি?
তুমি থাকলে এখানকার লোকেরা আমাদের পিছনে লাগবে না।
এখন লাগে বুঝি?
ভীষণ। স্কুলেও আলোচনা হয়। সবাই বলে, আমরা নাকি জেঠুকে ঠকিয়ে সব সম্পত্তি নিয়ে নিয়েছি। এমনও বলে, মা নাকি জেঠুকে বিষ খাইয়ে মেরেছে।
যাঃ।— বলতে বলতে তারা একটা ডাঙা জমিতে উঠল।
সামনেই মেহেদির বেড়া। তারপর উঠোন। অন্তঃপুর।
আগড় ঠেলে উঠোনে পা দেওয়ার আগে সজল মুখ ফিরিয়ে বলল, আজ দাদুর আসার কথা, জানো?
জানি।
দাদু এলে খুব মজা হবে। আমি দাদুকে যা খ্যাপাই না!
খ্যাপাবি কেন? দাদু বুঝি বন্ধু?
তা নয়। ভাল লাগে। দাদু যে একটুতেই রেগে যায়।
রাগলেই বুঝি রাগাতে হবে?
কথা কইতে কইতে তারা উঠোনে ঢোকে।
মঞ্জু ছুটে এসে দীপনাথের হাত ধরে বলে, উঃ কাকু, ভদ্রমহিলা যা স্মার্ট না!
দীপ একটু হাসে। বলে, তা তো বুঝতেই পারছি। ভদ্রমহিলাকে পেয়ে কাকাকে একদম ভুলে গেছিস। একবার কাছেও গেলি না।
বড় বড় চোখে চেয়ে মঞ্জু বলে, আহা, তুমি তো আসবেই। উনি তো আর আসবেন না। এত সুন্দর কথা বলেন না, কী বলব!
খুব ভাব হয়ে গেছে তোদের?
ভীষণ। আর একটু থাকবে, কাকু?
উপায় নেই রে। লাঞ্চে ফিরে যেতে হবে।
আর কতক্ষণ?
দীপ ঘড়ি দেখে বলে, বড় জোর ঘণ্টাখানেক।
উনি কিন্তু যেতে চাইছেন না।
সে কী?
হ্যাঁ গো। বার বার বলছেন, তোমাদের বাড়িটা আমার খুব ভাল লেগে গেছে। ইচ্ছে হচ্ছে সারা দিনটা এখানেই কাটিয়ে যাই। থাকবে কাকু সারাদিন?
তাই হয় না কি? চারদিকে খোঁজ পড়ে যাবে। শোন, গাড়ির ড্রাইভারটা বসে আছে, ওকে একটু চা-টা পাঠিয়ে দিস শে।
ওঃ, সে কখন দিয়ে এসেছে মংলু! চা, পরোটা, ডিমভাজা। তোমাদের জন্য মা তাড়াতাড়ি কিমারি তৈরি করছে।
ওরে বাবা, এখন ওসব খেলে লাঞ্চ খাব কোন পেটে?
পারবে। এসো না আমাদের ঘরে। মণিদি কীরকম গল্প করছে দেখে যাও।
দীপনাথ হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলে, দুর পাগলি। মেয়েমহলে পুরুষদের যেতে নেই। তুই বরং ওঁকে গিয়ে বল, হাতের ঘড়িটার দিকে যেন একটু নজর রাখে।
