তৃষা একটু গম্ভীর হয়ে বলল, হ্যাঁ, আজকাল আর এসব জিনিস পাওয়া যায় না।
দীপনাথ আবার একটু অস্বস্তিতে পড়ে। জিনিসটা বড়দার। বউদি আবার ভাবল না তো, ঘুরিয়ে ফিরিয়ে এসব জিনিসের ওপর দাবিদাওয়া রাখছি?
সে তাড়াতাড়ি বলল, অত সব কী এনেছ? লাঞ্চ আছে যে!
তৃষা বড় বড় চোখে চেয়ে বলে, এসে থেকেই তো বাপু কেবল শুনছি লাঞ্চ আর লাঞ্চ। ওসব সাহেবি কেতার লাঞ্চ কী রকম হয় তা একটু-আধটু জানি বাপু। ওখানে তুমি কম খেলে না বেশি খেলে, ফেললে না রাখলে তা কেউ খেয়ালও করবে না। এসব আমাকে শিখিয়ো না।
কথাটা ঠিক। দীপনাথ যদি বুফে লাঞ্চে একটা পদ নিয়ে কিছুক্ষণ নাড়াচাড়া করে তা হলেও কেউ লক্ষ করবে না। তা ছাড়া লাঞ্চের আগেই সকলে নিরাপদ রকমের মাতাল হয়ে যাবে বলেই মনে হচ্ছে। তাই সে প্লেটের সামনে বসে বলল, তা বটে। খেয়াল ছিল না।
তৃষা মুখ টিপে হেসে বলে, ভেবো না, উনিও পেট ভরে খেয়েছেন। লাঞ্চ নিয়ে মণিদীপার একটুও মাথাব্যথা নেই। এমনকী যেতে চাইছেন না।
সর্বনাশ! না গেলে পরস্ত্রী হরণের দায়ে পড়ে যাব, বউদি।
পড়ে যাবে কেন ভাই? পড়ে অলরেডি গেছ।
তার মানে?
ভাল চাও তো এদের কনসার্নে চাকরি আর কোরো না।
দীপনাথ আবার লাল হয়ে একটা লুচি ছিড়ে দুই টুকরো করে বলে, তুমি না একদম বাজে।
তৃষা একটু গম্ভীর হয়ে বলে, তুমিই বা কেন এরকম কিম্ভূত? দেশে কুমারী মেয়ের তো অভাব নেই, তবে এই কচি বউটার মাথা খেয়ে বসে আছো কেন?
দীপনাথ এবার স্পষ্টতই একটু বিরক্ত হয়। তেতো গলায় বলে, এ যুগটা তোমাদের যুগের মতো নয় বউদি। এখনকার মেয়েরা অত সহজে প্রেমে পড়ে না। মণিদীপার তুমি কী বেহেড অবস্থা দেখলে?
তৃষা হেসে ফেলে বলে, ঠাট্টা বোঝো না, তুমি কেমন হয়ে গেছ বলো তো!
ঠাট্টা! হতেও তো পারে। দীপনাথ আবার লাল হয়। বলে, বসের বউ নিয়ে ইয়ারকি নয়। কানে গেলে সর্বনাশ।
তৃষা নীরবে একটু হাসে। বলে, প্রেমে পড়েছে এমন কথা কিন্তু একবারও বলিনি। বরং বলছিলাম, বসের বউকে ভাল জপিয়ে নিয়েছ। টক করে প্রোমোশন পেয়ে যাবে।
জপিয়েছি তাই বা বলছ কী করে?
ওসব বোঝা যায়।
তবে তুমিই বোঝো যাও।
রাগ করলে নাকি গো!–বলে তৃষা আবার গা জ্বালানো হাসি হাসে। বস্তুত একমাত্র এই দেওরটির কাছেই সে বরাবর একটু তরল। শ্বশুরবাড়ি বা বাপের বাড়ির আর কারও সঙ্গে তার কোনও ঠাট্টা বা ইয়ারকির সম্পর্ক নেই। দীপনাথকে বরাবরই তার ভাল লাগে। এই এক সংসার-উদাসী মানুষ। বড় ভাল মানুষ। কখনও কাউকে আঘাত দিয়ে কথা বলে না, কারও কাছে কোনও প্রত্যাশাও নেই তার। বিয়ের পর হয়তো বদলে যাবে। বেশির ভাগ ভাল পুরুষই বিয়ের পর সেয়ানা হয়। দীপনাথ যতদিন বিয়ে না করছে ততদিন তৃষার তাকে বোধহয় এইরকমই ভাল লাগবে।
দীপনাথ বলল, না, রাগ করব কেন? অনুরাগের কথাই তো বলছ। তবে তুমি বরাবরই ফাজিল।
তৃষা স্নিগ্ধ চোখে চেয়ে বলে, আমি যে ফাজিল সে শুধু দুনিয়ায় একমাত্র তুমিই বললে! আর কেউ কিন্তু বলে না।
আর সবাই কী বলে তোমাকে?–খেতে খেতে চোখ তুলে দীপনাথ ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করে।
সে অনেক কথা। সোমবাবু তো নাকি বলে, আমি দেবী চৌধুরানি হওয়ার চেষ্টা করছি। এখানকার লোকেও বলে, আমি মেয়ে গুন্ডা, নারী ডাকাত।
বলে নাকি?
শুনি তো।
ঠিকই বলে।–দীপনাথ গম্ভীর মুখে বলল।
তৃষা মৃদু হাসল। বলল, কেন, তোমারও কি তাই মনে হয়?
ডাকাত না হলে ভিলেজ-পলিটিকসের সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকতে পারতে না, বউদি। ডাকাত তো তুমি বটেই।
তোমার মেজদাও আমাকে খুব ভাল চোখে দেখেন না। ওঁর ধারণা আমি ইচ্ছে করে এখানকার লোকেদের সঙ্গে পায়ে পা বাধিয়ে ঝগড়া করছি।
করছ নাকি? সর্বনাশ! লোকাল লোকদের খুব সমীহ করে চলবে। এরা গ্রাম্য হোক, অশিক্ষিত হোক, খেপলে কিন্তু নাজেহাল করে ছাড়বে।
কঠিন হয়ে গেল তৃষার মুখ। ঠাট্টা-ইয়ারকির ভাবটা একদম রইল না আর। বলল, সহজে আপস করি না। করবও না।
দীপনাথ চোখ তুলে বউদির মুখটা একবার দেখে নিয়ে বলল, মামলা-মোকদ্দমা চলছে নাকি?
চলছে।
আচমকাই দীপনাথের মুখ দিয়ে কথাটা বেরিয়ে গেল, সোমনাথকে কারা মেরেছিল জানো?
তৃষা এক ঝলক তাকিয়ে বলল, না। জানলে চুপ করে থাকতাম নাকি?
তা বলিনি। এইটুকু ছোট একটা জায়গায় ক্রিমিন্যাল ধরতে পুলিশের এত দেরি হচ্ছে কেন সেইটেই বুঝতে পারছি না।
সে পুলিশ জানে।
সে তো ঠিকই। দীপনাথ আবার মাথা নিচু করে। তারপর একটু ধীর গলায় বলে, সজলকে কি এখানেই বরাবর রাখবে?
তৃষা অবাক হয়ে বলে, কেন বলো তো! এখানে রাখব নাই বা কেন?
দীপনাথ বিজ্ঞের মতো বলে, এই পরিবেশটা হয়তো তেমন ভাল নয়, বউদি।
তা তো নয়ই।
তা হলে সজলকে কোনও ভাল স্কুলে দিয়ে দাও। হোস্টেল বা বোর্ডিং-এ রাখো।
তৃষা বোকা নয়। সে স্থির দৃষ্টিতে দীপনাথের দিকে চেয়ে ছিল। বলল, সজলের সঙ্গে তোমার কথা হল বুঝি?
হুঁ।
কী বুঝলে?
বুঝলাম সজল এখানে খুব হ্যাপি নয়। ওকে বাইরে পাঠানোই ভাল।
হ্যাপি নয় কেন? কিছু বলল?
অনেক কিছু বলল। সেগুলো কিছু খারাপ কথাও নয়। তবে বুঝতে পারলাম ওর একটা অ্যাবনর্মাল সাইকোলজি গ্রো করছে।
তৃষা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, সেটা আমি মাঝে মাঝে টের পাই, আগে আমাকে যমের মতো ভয় পেত। আজকাল কেমন যেন ভয়ডর কমে যাচ্ছে।
বাইরে পাঠিয়ে দাও। ঠিক হয়ে যাবে।
দেখব।
যদি বলো তো আমিও ভাল বোর্ডিং স্কুল দেখতে পারি।
