শ্রীনাথ বারান্দায় বেরিয়ে খ্যাপা নিতাইকে ডেকে সজলকে পাঠিয়ে দিতে বলে।
১৭. সজল এসে প্রণাম করে
সজল এসে প্রণাম করে হাসিমুখে দাঁড়াতেই মনটা স্নিগ্ধ হয়ে গেল দীপনাথের। সজলের মুখখানা ভারী মিষ্টি হয়েছে। দু’খানা বুদ্ধিদীপ্ত বড় বড় চোখ, জড়তাহীন ভাবভঙ্গি। চেহারাখানাও বেশ লম্বা এবং কাঠামোটাও মজবুত।
আমাকে চিনতে পারিস, সজল!
হুঁ-উ। বড়কাকা।
এখানে আসব বলে ঠিক ছিল না। তাই তোর জন্য কিছু আনতে পারিনি। বলে মানিব্যাগটা হিপ পকেট থেকে বের করে কুড়িটা টাকা সজলের হাতে দেয় দীপনাথ। বলে, জামাটামা কিছু একটা কিনে নিস।
শ্রীনাথ ধমক দিয়ে বলে, কেন? কোনও পালপার্বণ পড়েছে এখন! কিছু দিতে হবে না।
সজলও হাত গুটিয়ে নিয়ে বলে, না না, আমার এখন জামার দরকার নেই, কাকু। তুমি টাকা রাখো।
দীপনাথ শ্রীনাথকে ধমক দিয়ে বলে, তুমি থামো তো। সজল কি আমার কুটুম নাকি? বলে সজলের দিকে বড় বড় চোখে চেয়ে বলে, কাকার সঙ্গে ভদ্রতা হচ্ছে? এক চড় খাবি। নে!
সজল টাকাটা নেয়। খুব লজ্জার সঙ্গে হাসে।
দীপনাথ মানিব্যাগ পকেটে পুরতে পুরতে বলে, আজেবাজে ব্যাপারে খরচ করিস না। জামা কিনে নিস। লেখাপড়ায় কেমন হয়েছিস? ক্লাসে ফার্স্ট হোস নাকি?
শ্রীনাথ বলে ওঠে, আরে না না। কোনওরকমে পাসটাস করে যায় আর কী। লেখাপড়ায় মনই নেই। অতি বাঁদর।
দীপনাথের নিকট-আত্মীয় বলতে এরাই। বড়দা মল্লিনাথ বিয়েই করেনি। তবে দীপনাথ একবার এক গোপনসূত্রে খবর পেয়েছিল বৈধ সন্তান না থাকলেও নাকি এই রতনপুরেই মল্লিনাথের একজন বাঁধা মেয়েমানুষ ছিল এবং তার গর্ভে মল্লিনাথের এক অবৈধ সন্তানের জন্ম হয়। মল্লিনাথকে বাদ দিলে আর থাকে সে নিজে আর সোমনাথ। সোমনাথের এখনও ছেলেপুলে হয়নি। এখনও পর্যন্ত শ্রীনাথই যা বংশরক্ষা করছে।
বংশরক্ষা কথাটা এ যুগে প্রায় তামাদি হয়ে গেছে। তবু দীপনাথ এই কথাটার মধ্যে এক গভীর মায়া ও তীব্র আকাঙক্ষা বোধ করে।
সে উঠে পড়ে বলল, চল, তোদের বাড়িটা ঘুরে দেখি।
সজল খুব রাজি। বলল, চলো।
কাকাকে সজলের খুব পছন্দ হয়ে গেছে। সে শুনেছে এই কাকা নাকি খুব উদাস ধরনের। সংসারে মন নেই। আত্মীয়দের সঙ্গে তেমন সম্পর্কও নেই। ছোটকাকার মতো এই কাকা কোনওদিন জেঠুর সম্পত্তি দাবি করতে আসেনি।
সজল মুখ তুলে সকালের রোদে দীপনাথের মুখখানা ভাল করে দেখল। উদাস একরকম চোখ। একটু যেন ছটফটে ভঙ্গি। মুখখানা লম্বা ধরনের এবং খুবই সুশ্রী। সব মিলিয়ে কাকাটিকে তার ভীষণ পছন্দ হয়ে যায়।
খ্যাপা নিতাইয়ের ঝোপড়াটা দেখিয়ে দীপনাথ বলে, ওটা কী রে?
নিতাই খ্যাপার ঘর।
কোন নিতাই? সেই যে তান্ত্রিক?
সজল অবাক হয়ে বলে, তুমি চেনো?
চিনব না কেন? বহুকাল আগে বড়দার ফাইফরমাশ খাটত। তখন দেখেছি। তখন অবশ্য তান্ত্রিক হয়নি। এখন কী করে?
ওঃ, সে অনেক কিছু করে। বাণ মারে।
সর্বনাশ! কাকে বাণ মারে?
হি হি করে হাসে সজল। বলে, সবাইকেই মারে। যার ওপর যখন খেপে যায়। একদিন সরিৎমামাকেও বাণ মেরেছিল।
সরিৎ! কোন সবিৎ? বউদির এক ভাই ছিল সরিৎ, সেই নাকি?
হুঁ, সরিৎমামা এখন আমাদের এখানে থাকে।
ওকে বাণ মারল কেন?
সরিৎমামা ওকে মেরেছিল যে! মার নামে কী যেন সব বলেছিল, তাই মেরেছিল।
বউদির নামে?–ভ্রু কুঁচকে বিরক্তির ভাব প্রকাশ করে দীপনাথ বলে, তবে বউদি ওকে এখানে রেখেছে কেন? তাড়িয়ে দিলেই তো হয়।
সজল মাথা নেড়ে বালে, মা ওকে তাড়াবে না।
কেন?
নিতাইদাকে মা খুব ভয় পায়।
পুকুরধারে বিস্ময়ে প্রায় থেমে যায় দীপনাথ। বলল, বউদি ওকে ভয় পায়, বলিস কী রে? ওকে ভয় পাবে কেন?
বাণ মারে যে!
কথাটা দীননাথ হেসেই উড়িয়ে দেয়। তৃষা বউদি খ্যাপা নিতাইয়ের বাণকে ভয় খাওয়ার মেয়ে নয়।
পুকুরের গভীর ছায়াচ্ছন্ন জলের দিকে চেয়ে ছিল দীনাথ। চারদিকে গাছপালার নিবিড়তা। এত সুন্দর ছায়া আর গভীর জল যেন বহুকাল দেখেনি দীনাথ। কী নির্জনতা এখানে। বলল, এ পুকুরে বড়দা অনেক মাছ ছেড়েছিল।
এখনও অনেক মাছ।–সজল আগ্রহের সঙ্গে জবাব দেয়।
মাছগুলো তোরা কী করিস?
মাঝে মাঝে ধরা হয়। ধরলে কাকা? আমার হুইল আছে।
না রে, আজ সময় নেই।
তবে কবে আসবে বলো, সেদিন দুজনে মিলে ধরব।
আসব’খন একদিন।
তুমি রবিবারেরবিবারে আসতে পারো না?
ভারী স্নেহের হাতে সজলের মাথার এক টোকা চুল একটু নেড়ে দেয় দীপনাথ। বলে, তোর বুঝি খুব মাছ ধরার শখ?
খুব। তবে মাছ খাই না।
তা হলে ধরিস কেন?
ভাল লাগে। তুমি কখনও মুরগির গলা কেটেছ কাকু?
দীপনাথ ভ্রু কুঁচকোয় আবার। বলে, না তো! কেন রে?
মুরগি কাটতে খুব ভাল লাগে, না?
দীপনাথ একটু দুশ্চিন্তার দৃষ্টিতে ভাইপোর দিকে তাকায়। মুরগি কাটার মধ্যে ভাল লাগার কী আছে বুঝতে না পেরে মাথা নেড়ে বলে, আমার ভাল লাগে না। অবোলা জীবকে কাটতে ভাল লাগবে কেন? তুই কাটিস নাকি?
লুকিয়ে কেটেছিলাম। মা টের পেয়ে তিন দিন ঘরে বন্ধ করে রেখেছিল।
কাটতেই বা গেলি কেন?
নিতাই কাটে, সরিমা কাটে, লক্ষ্মণ কাটে, তবে আমি কাটলে কী দোষ?
ইতস্তত করে দীপনাথ বলে, দোষ নেই। তবে তোর বয়সে সবাই তো রক্ত দেখলে ভয় পায়।
আমিও পেতাম। এখন পাই না। জানো কাকু, বাবার কাছে একটা দারুণ জার্মান ক্ষুর আছে। সেইটে দিয়ে কাটতে যা ভাল না!
সর্বনাশ! ক্ষুরে হাত দিস নাকি? ভীষণ ধার যে, কখন হাত-ফাত কেটেকুটে ফেলবি।
কাটবে কেন? বাবা তো নিজেই ক্ষুরটা আমাকে দিতে চেয়েছিল। মা দিতে দিল না। তাই নিয়ে দু’জনের কী ঝগড়া! জানো, মা আর বাবার মধ্যে খুব ঝগড়া। কেউ কারও সঙ্গে কথা বলে না।
