পারব?–মণিদীপা উজ্জ্বল চোখে তাকায়।
নিশ্চয়ই। বেচারাকে খামোখা কেন কষ্ট দেবেন? ছেড়ে দিন।
দীপনাথ এ কথা বলার সময়েও টের পাচ্ছিল, তার বুক কাপছে। নির্জন গাঁ-গঞ্জের রাস্তায় এই অ্যাডভেঞ্চারে ড্রাইভার না থাকলে মণিদীপা অনেক খোলামেলা হবে না কি? মুখ-ফাঁকা দু’-একটা কথা ঠিক বেরিয়ে আসবে।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর-একটু ভেবে মণিদীপা বলে, না, থাক। আমি যে আপনার সঙ্গে পালিয়ে যাচ্ছি না ড্রাইভারটা তার সাক্ষী থাকবে।
ভীষণ লাল হয়ে গেল দীপ। বলল, কী যে বলেন।
রতনপুর কোন দিকে এবং কত দূর তার স্পষ্ট ধারণা ছিল না দীপের। খুব দূর যে নয় তার একটা ধারণা হয়েছিল মাত্র।
কিন্তু লোকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে মাত্র পনেরো মিনিটে পৌঁছে গিয়ে সে নিজেও অবাক। মণিদীপা মেজদার বাড়িতে কে কে আছে এবং তারা কেমন লোক তা জানতে চেয়েছিল। সেই সব। প্রশ্নের জবাবও ভাল করে দেওয়া হল না।
ফটকের কাছে গাড়ি থেকে মণিদীপাকে সঙ্গে নিয়ে নামবার সময় দীপনাথ একটু লজ্জা বোধ করছিল। এই পোশাকে একজন সধবাকে দেখে মেজো বউদি আবার কী ভাববে!
ঢুকতেই ডান ধারে শ্রীনাথের বাগান।
মণিদীপা দাঁড়ায় এবং বাগান থেকে মাটিমাখা হাত-পায়ে উঠে আসে শ্রীনাথ।
কাকে চাইছেন?
দীপনাথ হাতের ইশারা করে চুপ থাকতে ইঙ্গিত করে মেজদাকে। তার পর এগিয়ে গিয়ে বলে, মজদা, ইনি মিসেস বোস। আমার বসের স্ত্রী।
শ্রীনাথ একটু অবাক। বলে, ও, তুই! আসুন! আসুন!
শ্রীনাথ আর তাদের মধ্যে বেড়ার বাধা। শ্রীনাথ বেড়া বরাবর এগিয়ে যেতে যেতে বলে, ওই সামনের ঘর। আসুন।
বোঝাই যাচ্ছিল, মেজদা একটু ঘাবড়ে গেছে। তটস্থ হয়ে পড়েছে। হবেই। কী একখানা মেয়ে। সঙ্গে নিয়ে বেরোলে বাজারে প্রেস্টিজ বেড়ে যায়।
মণিদীপা মুখ ফিরিয়ে দীপনাথকে বলে, ঘর নয়। আমি বাগানটা দেখব। দারুণ সুন্দর বাগান।
শ্রীনাথ কথাটা শুনে মুখ ফিরিয়ে বলে, বাগান দেখবেন? খুব খুশি হলাম। তা হলে ওই সামনের ফটক ঠেলে চলে আসুন।
বাস্তবিকই দেখার মতো বাগান করেছে শ্রীনাথ। সাজানো গোছানো নয়। বরং জংলা, এলোপাথাড়ি সব গাছপালা গজিয়ে উঠেছে। কিন্তু তার বিচিত্র রকমফের মানুষকে হতভম্ব করে দেয়। প্রাইজ জেতার মতো বড় বড় আকারের মরশুমি ফুল থেকে পঞ্জিকার বিজ্ঞাপনের ভাষায় রাক্ষুসে ফুলকপি পর্যন্ত সবই ফলেছে। সবচেয়ে বড় কথা, বাগানের ভেতরে গিয়ে দাঁড়ালে নিবিড় গাছপালার আবডালে বাইরের পৃথিবী একদম আড়াল পড়ে যায়।
আপনি বাগান করতে খুব ভালবাসেন, না?–মণিদীপা শ্রীনাথকে জিজ্ঞেস করে।
শ্রীনাথ একটা চার-রঙা তারাফুল তুলে মণিদীপার হাতে দিয়ে বলে, আচার্য জগদীশ বোস গাছের প্রাণ আবিষ্কার করেছিলেন, জানেন তো! আমি নতুন করে সেই প্রাণটার সন্ধান করছি।
রোদচশমার ওপর দিয়ে মণিদীপার ভ্রু-তে একটু কুঞ্চন দেখা দেয়। সে বলে, অনেক বাঙালি এ কথাটা বলে বেড়ায়। কিন্তু আচার্য জগদীশ গাছের প্রাণ আবিষ্কার করেছিলেন, এ কথাটা মোটেই ঠিক নয়।
শ্রীনাথ একটু যেন ভয় খেয়ে তাকায়। বলে, তা হলে?
মণিদীপা এবার সুন্দর করে হাসে। বলে, গাছের প্রাণের কথা লোকে তো বহু দিন ধরে জানে। জগদীশ বোস বোধ হয় গাছের সেনসিটিভিটি প্রমাণ করেছিলেন। ডিটেলস জানি না। তবে ওইরকমই কিছু।
শ্রীনাথ একটু নিভে গিয়ে বলে, তাই হবে।
মণিদীপা খুব সমবেদনার সঙ্গে বলে, কিন্তু তাতে কিছু আসে যায় না। গাছের প্রাণ আপনিই আবিষ্কার করেছেন। এত বড় আর লাইভলি ফুল আমি আগে দেখিনি। প্রত্যেকটা গাছই এত হেলদি!
আপনি গাছ ভালবাসেন?
কে না বাসে?
শ্রীনাথের মুখ উদ্ভাসিত হয়ে যায়। সে বলে, আজকালকার ছেলেমেয়েরা বিচি দেখে গাছ চিনতে পারে না। লেখাপড়া শিখে তা হলে কী লাভ?
ঠিকই তো!
বলতে বলতেই গাছপালা এবং বাগানের ওপর মণিদীপার কৌতূহল শেষ হয়ে যায় এবং দীপনাথ সেটা নির্ভুলভাবে বুঝতে পারে।
দীপ বলে, চলুন, আমার বউদির সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিই।
মণিদীপার চোখ চারদিকটা গিলে খাচ্ছে। বলল, বাঃ, বেশ তো জায়গা। এ রকম একটা জায়গায় থাকতে পারলে কলকাতার ফ্ল্যাট ছেড়ে দিতে আমি এক্ষুনি রাজি।
ভাবন-ঘর থেকে ভিতরবাড়ি যাওয়ার পথেই খবর রটে গিয়েছিল। ছেলে-মেয়েরা ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে উঠোনের ধারে। তৃষা এগিয়ে এসে মণিদীপার হাত ধরে বলল, আসুন। আপনার জন্যই বোধ হয় আমার একজন হারানো দেওরেরও খোঁজ পাওয়া গেল।
বাকি সময়টুকু দীপনাথ আর মণিদীপার নাগালও পেল না। মেয়েমহলে গিয়ে ঘুরঘুর করা তার স্বভাব নয়। মণিদীপাকে এগিয়ে দিয়ে সে ফিরে এল ভাবন-ঘরে।
শ্রীনাথ হাত-মুখ ধুয়ে এসে বলল, কোথায় এসেছিলি?
মিঠাপুকুর। তোমার আস্তানাটা যে এত কাছে কে জানত?
শ্রীনাথকে গম্ভীর দেখাচ্ছিল। বলল, আমি ভাবলাম বুঝি সোমনাথ তোকে খবর দিয়ে আনিয়েছে।
না তো! সোমনাথ আনাবে কেন?
আজ বাবাকে নিয়ে ওরও এখানে আসার কথা।
দীপনাথ ভারী লজ্জিত হয়। বাবা যে সোমনাথের কাছে সেটা সে মাঝে মাঝে ভুলেই যায়। বাবাকে দেখেওনি বহুদিন।
সে বলল, বাবা আসছে কখন?
কে জানে?
দীপনাথ ঘড়ি দেখে বলে, বেলা বারোটা পর্যন্ত থাকতে পারি। তারপর লাঞ্চে যেতে হবে। এর মধ্যে যদি বাবা এসে যায় তবে দেখাটা হতে পারে।
এখানে দুপুরে খাবি না?
উপায় নেই। একা হলে কথা ছিল। বসের বউ সঙ্গে রয়েছে।
মেয়েটা একটু খ্যাপা নাকি?
কেন?
কেমন যেন অন্যরকম।
দীপনাথ হাসে। বলে, খ্যাপা নয়। আজকালকার মেয়েরা এরকমই। সজলকে ডাকো তো। বহুকাল ওকে দেখি না।
