দীপনাথ উঠল এবং একটু লক্ষ্যহীন পায়ে এদিক ওদিক হাঁটতে হাঁটতে লিচুতলার কাছাকাছি পৌঁছে গেল। মণিদীপার চোখে পড়ার জন্য সে ইচ্ছে করেই ওর মুখোমুখি উলটো দিক থেকে খানিকটা হেঁটে কাছাকাছি চলে গেল প্রায়।
কিন্তু মণিদীপা একদমই পাত্তা দিল না তাকে। ডাকল না, তাকালও না।
দীপনাদের কাছে এটুকুই যথেষ্ট অপমান। মণিদীপা সম্পর্কে যত বেশি সচেতন হয়ে উঠছে সে, তত বেশি অভিমান আর অপমানবোধ বেড়ে যাচ্ছে তার।
দীপনাথও স্পষ্ট করে তাকাল না। উদাস মুখে হটা অব্যাহত রেখে সে ঘুরতে ঘুরতে বাড়ির পশ্চিম দিকে একটা পরিচ্ছন্ন ঘাসজমিতে চলে এল। খুঁজে-পেতে একটা পছন্দসই গাছের ছায়ায় চিত হয়ে শুয়ে পড়ল সে, হাতে মাথা রেখে। চোখ জ্বালা করছে রোদের তেজে। তাই চোখ বুজল। তারপর পাহাড়ের স্বপ্ন দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়ল হঠাৎ।
কিন্তু ঘুমোলেও দীপনাথের ইন্দ্রিয় এবং স্নায়ু সব সময়ে সজাগ থাকে। সামান্য শব্দ বা সামান্য চলাফেরাও সে টের পায়। ঘুমের চটকার মধ্যেই সে একটা ভারী সুন্দর গন্ধ পেল। ঘুম ভাঙলে চোখ চাইল না সে, কে এসেছে তা সে জানে।
বড় অভিমান হল তার। পাশ ফিরে শুল।
মণিদীপা আস্তে করে ডাকল, দীপনাথবাবু!
প্রথমে উত্তর দিল না দীপনাথ।
আরও দু’বার ডাক শুনে হঠাৎ উঠে বসল।
মণিদীপা হাসছিল। বলল, কুম্ভকণ।
দীপনাথ হাইটা চেপে দিয়ে বলল, কিছু কাজ নেই, তাই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। কিছু বলছেন? তেমন কিছু নয়। আমার ভাল লাগছে না।
কেন?
এরা কেউ তো আমাদের ক্লাসের লোক নয়। আপনি যেরকম মধ্যবিত্ত পরিবারের, আমিও তাই। আই হেট দেম।–বলতে বলতে মণিদীপা একটু জ্বলে ওঠে।
দীপনাথ গম্ভীর হয়ে বলে, তা বললে হবে কেন? একজন একজিকিউটিভের বউকে এই সমাজে মিশতেই হবে। অন্য উপায় তো নেই।
খুব জেদের গলায় মণিদীপা বলে, আমার যা ভাল লাগে না তা মানিয়ে নিতে আমি রাজি নই।
তা হলে কী করবেন?
আমি এখানে সারা দিন থাকতে পারব না।
একটু আগে তো লিচুতলায় হাই সোসাইটির লোকদের সঙ্গে দিব্যি আড্ডা দিচ্ছিলেন।
ওঃ আই ওয়াজ প্রিচিং কমিউনিজম।
কী সর্বনাশ!
মণিদীপা মৃদু হেসে বলে, খুবই সর্বনাশ। মিস্টার বোস শুনলে মূৰ্ছা যাবেন। উনি কমিউনিজমকে সাংঘাতিক ভয় পান। আমাদের বাড়িতে লাল মলাটের কোনও বই ঢুকতে পারে না। তা বলে ভাববেন না হাই-সোসাইটিতে কমিউনিস্ট নেই। বরং অনেক আছে। আমি যাদের সঙ্গে কথা বলছিলাম তাদের একজনই তো কট্টর মার্কসিস্ট।
হতেই পারে।
হচ্ছেও। কমিউনিজম ক্রমেই ছড়িয়ে পড়ছে সব ক্লাসের মধ্যে।
খুব ভাল। দীননাথ আবার হাই তোলে। মণিদীপার এই একটা ব্যাপারই তার যা একটু–পছন্দ। সে জিজ্ঞেস করল, বসরা সব কোথায়?
মণিদীপা ঘাসে বসে বলল, শিকার শিকার খেলা করতে গেল সব। প্রত্যেকটাই মাতাল। কারও হাতে টিপ নেই।
থাকলেই ভাল। পাখি মারা আমার একদম ভাল লাগে না। মণিদীপা হাসে। বলে, আপনাকে দেখেই মনে হয়, আপনি ভীষণ সফট-হার্টেড।
মণিদীপার হাসিটা এতই ঝকমকে এবং হাসলে বয়সটা এতই কম দেখায় যে, দীপনাথের চোখ আঠাজালে পড়া পাখির মতো মণিদীপার মুখে আটকে থেকে ছটফট করছিল।
মণিদীপা হঠাৎ গা ঝাড়া দিয়ে উঠে বলে, দি হামবার্গস আর অ্যাওয়ে। চলুন আমরা একটু ঘুরে আসি।
কোথায় যাবেন?
যে-কোনও জায়গায়। জাস্ট টু কিপ ডিসট্যানস ফ্রম দি হবুচন্দ্র কিংস অ্যান্ড গবুচন্দ্র মিনিস্টারস। কোনও চাষার বাড়িতে গেলে কেমন হয়?
দীপ শঙ্কিত হয়ে বলে, ও বাবা!
ভয় পাচ্ছেন কেন? চলুন। রিয়্যাল হিউম্যান বিয়িং-এর কাছে গেলে অনেক ভাল লাগবে।
চাষা বলতেই যে রিয়্যাল হিউম্যান বিয়িং নয় এ কথাটা বোঝনোর বৃথা চেষ্টা করল না দীপ। তবে উঠল।
মণিদীপা হাঁটতে হাঁটতে বলে, ধারে-কাছে দেখার মতো কোনও জায়গা নেই?
দীপ মাথা নেড়ে বলে, জানি না, তবে কয়েক মাইলের মধ্যে রতনপুর নামে একটা জায়গা আছে। সেখানে আমার মেজদা থাকে।
মণিদীপা তুলে বলে, উনি কি বড়লোক?
না। তবে একটা খামার মতো আছে ওদের। গেরস্থ।
আমি যদি যেতে চাই আপনার কোনও অসুবিধে নেই তো?
থাকলে তো কথাটা বলতামই না। চেপে যেতাম।
মণিদীপা ঘড়ি দেখে বলে, এখন মোটে সাড়ে নটা বাজে। গিয়ে লাঞ্চের আগে ফেরা যাবে তো?
তা যাবে।
তবে গাড়ি জোগাড় করি? বলে প্রায় দৌড়ে চলে যায় মণিদীপা।
বেশ খুশি ও উজ্জ্বল দেখাচ্ছিল মণিদীপাকে। দীপনাথ স্পষ্ট টের পায়, একা সে নয়। মণিদীপাও তার প্রতি টানে টানে একটু একটু এগিয়ে আসছে। বেশ আগ্রহী। হয়তো সেটা প্রেম নয়। কারণ মণিদীপার সত্যিকারের ভালবাসার লোক একজন বয়স্ক স্কুলমাস্টার, যার নাম স্নিগ্ধদেব এবং যে সাংঘাতিক বিপ্লবী। কিন্তু মণিদীপার মন উপচে যে বাড়তি লাবণ্যটুকু ঝরে পড়ছে তার কিছু ভাগ অবশ্যই দীপেরও। আপাতত এই রবিবারটার যাবতীয় কষ্ট, কাজ ও অপমানকে ভুলিয়ে দেওয়ার পক্ষে সেটুকুই ঢের।
মণিদীপা ফিয়েট গাড়িটা জোগাড় করেছে। দীপ সামনের সিটে ড্রাইভারের পাশে বসতে যাচ্ছিল, মণিদীপা বলল, ও কী? পাশাপাশি না বসলে কথা বলব কার সঙ্গে?
দীপ লজ্জা পেয়ে মণিদীপার পাশে উঠে বসে।
মণিদীপা বলে, আপনি ড্রাইভিং জানেন?
না, একটু শিখেছিলাম, ভুলে গেছি।
জানলে ড্রাইভারটাকে কষ্ট দিতাম না।
আপনি তো জানেন।
মণিদীপা মাথা নেড়ে বলে, জানলে কী হবে? এসব অচেনা জায়গায় কি পারব? ঠিক সাহস পাচ্ছি না।
পারবেন।–দৃঢ় স্বরে বলে দীপনাথ।
