মিঠাপুকুরের মস্ত ঝিলে যে বালিহাস থাকবেই এমন কোনও কথা নেই। তবে ঝোপ-জঙ্গল বাঁশঝাড়ে বিস্তর নিরীহ পাখি-টাখি এসে বসবে। তাদের দু-চারটে মারা পড়লেও পড়তে পারে। কারণ সঙ্গে যাচ্ছে তিন-তিনটে বন্দুক।
অ্যামবাসাডরে ড্রাইভারের কনুইয়ের তো আর আলবার্ট টমসনের চিফ অ্যাকাউনট্যান্ট মিস্টার গুহর ভারী উরুর পার্শ্বচাপ সহ্য করতে করতে সেই তিনটে খাপে ভরা ভারী বন্দুক খাড়া করে ধরে থাকতে হচ্ছে তাকে আগাগোড়া। লাগেজ বুট জায়গা হয়নি, সেখানে বিস্তর জিনিস।
আর দীপনাথ থাকতে অন্য কোথাও জায়গা হওয়ার দরকারই বা কী?
তবে দৃশ্যটা মণিদীপা দেখছে না। মেয়েরা দুটো গাড়ি বোঝাই হয়ে আগে আগে যাচ্ছে। পিছনে আর দুটো গাড়িতে পুরুষমানুষের দল। মণিদীপা দেখলে একটু অস্বস্তি বোধ করত দীপ। ভদ্রমহিলা মনে করেন, দীপনাথ বোস সাহেবের চামচা। কথাটা হয়তো তেমন মিথ্যেও নয়।
সকালের নরম রোদে শহর ছাড়িয়ে ফাঁকা রাস্তা আর দু’ধারে প্রাকৃতিক সবুজের মধ্যে পড়ে দীপনাথের ভাল লাগার কথা। বন্দুকগুলোর জন্য তেমন লাগছে না। মুখের সামনে তিনটে খাপে ঢাকা নল উঁচু হয়ে তার চোখ আড়াল করে আছে। এই বন্দুকে পাখি মারা পড়বে ভাবতেই তার বুকে কষ্ট হয়। খুনখারাপি—তা সে পাখিই হোক আর বাঘই হোক—দীপনাথ সহ্য করতে পারে না। বড়দা মল্লিনাথ তাতে বন্দুক চালাতে শিখিয়েছিল। মলিনাথের হাত ছিল সাফ। মাথা ঠান্ডা, আর বুকে ছিল যথেষ্ট নিষ্ঠুরতা। একজিকিউটিভ ইনজিনিয়ার হিসেবে কিছুদিন উত্তর বাংলায় ছিল মল্লিনাথ। তখন বনে-জঙ্গলে তার সঙ্গে ঘুরে দীপনাথ তালিম নিয়েছিল। কিন্তু আজও সে বন্দুক জিনিসটাকে পছন্দ করে উঠতে পারেনি।
গুহ সাহেব পিছনে একটু ঘুরে ব্যাক সিটে বসা বোস সাহেব এবং আর তিন কোম্পানির তিন বড় মেজো কর্তার সঙ্গে অফিস নিয়ে কথা বলছিলেন। ফলে ঊরুর চাপে দীপনাথ আরও চ্যাপটা হয়ে গেল। শীতকালেও তার অল্প ঘাম হচ্ছে। দমফোট লাগছে।
হাওড়া ছেড়ে উনিশ কুড়ি মাইল দূরে মিঠাপুকুর। ইতিমধ্যেই গাছ-গাছালি ঘন হয়ে উঠেছে। বসতির ঘনত্ব কমে এসেছে। চাষের মাঠ দেখা যাচ্ছে। বন্দুকের নল সরিয়ে দেখতে থাকে দীপনাথ। সামনের একটা গাড়িও খুব তৃষিত চোখে দেখে নেয় সে। সবুজ একটা ফিয়েট গাড়ি। ওতে মণিদীপা রয়েছে। মণিদীপা আজও শাড়ি পরেনি। জিনস আর টি শার্ট। তার ওপর একটা কাশ্মীরি কোট। বড্ড বেশি চমকি দেখাচ্ছিল।
গাড়িটা ডাইনে বাঁক নিল। আর দেখা গেল না।
বিশুদ্ধ মার্কিন ইংরেজিতে এ গাড়ির সাহেবরা অফিস বিজনেস আর বিভিন্ন একজিকিউটিভের দোষ-ত্রুটি নিয়ে অনর্গল কথা বলে যাচ্ছে। দীপনাথ বিন্দুমাত্র কৌতূহল বোধ করে না। চোখ বুজে সে মনের চোখটি খোলে। অমনি নীল আকাশের গায়ে স্বর্গের সমান উঁচু মহান পর্বতের দৃশ্য ভেসে ওঠে।
সব তুচ্ছতা ছেড়ে একদিন কি সে পাহাড়ে যাবে না?
গাড়ি ডাইনে বাঁক নিয়ে একটা গাছপালায় নিবিড় শুড়িপথে ঢোকে। কাঁচা রাস্তা। গাড়ি হোঁচট খাচ্ছে। খুব আস্তে চলছে। প্রচণ্ড ধুলো উড়ছে চাকার ঘষড়ানিতে। চারদিকের গাছপালার ডাল আর পাতা ছটাছট আছড়ে পড়ছে গাড়ির গায়ে। বাঁশের একটা ডগা গুহ সাহেবের গালে চুমু খেয়ে গেল। উনি একটু সরে এলেন। ঊরুর চাপে দীপনাথ আরও সরু হল এবং ড্রাইভারের কনুই তার পেটে ঘোত করে বসে গেল।
প্রায় আধ ঘণ্টা এই যন্ত্রণা সহ্য করে বাগানবাড়িতে পৌঁছল দীপনাথ।
ধূলিধূসর দুটো গাড়ি থেকে মহিলারা নেমেছেন। বাগানময় অজস্র সুন্দর নিবিড় গাছপালা, কুঞ্জবন, পুকুর, বাড়িটাও বিশাল। চারদিকে উঁচু দেয়ালের প্রতিবোধ। চারদিক ম ম করছে কফির গন্ধে। বাগানে পুকুরের ধারে মস্ত গার্ডেন আমব্রেলার নীচে টেবিল সাজানো। এখুনি হালকা জলখাবার দেওয়া হবে। ড্রিংকস চাইলে ড্রিংকসও। কেটারের বেয়ারারা ট্রে নিয়ে তৈরি হচ্ছে।
বন্দুকগুলো ঘাসে শুইয়ে রেখে দীপনাথ হাত-পা টান টান করল। পুলওভার গায়ে রাখা যাচ্ছে এই রোদে। সেটা খুলে পিঠে ঝুলিয়ে হাত দুটো গলায় ফাঁস দিয়ে রাখল। একটা ফাঁকা টেবিলে বসে কফিতে চুমুক দিয়ে হাঁফ ছাড়ল সে।
কিছুক্ষণ সে হাঁফ ছাড়তে পারবেও। শিকারের প্রোগ্রামে সে সাহেবদের সঙ্গে যাবে না, এ কথা বোসকে সে আগেই জানিয়ে দিয়েছে।
বোস শুনে একটু হেসে বলেছেন, রক্ত দেখলে ভয় পান নাকি?
ওসব আমার ঠিক সহ্য হয় না।
ঠিক আছে। মিসেসরাও কেউই নাকি যাবেন না। আপনি না হয় ওঁদের সঙ্গে সময়টা কাটাবেন।
কথাটায় খোঁচা আছে। কিন্তু সারা দিন কত খোঁচাই তাকে হজম করতে হয়।
শিকারের পর লাঞ্চ এবং লাঞ্চের পর কলকাতা থেকে আসা এক ম্যাজিসিয়ান ম্যাজিক দেখাবেন। এক গায়িকা গান শোনাবেন। তারপর মিস্টার এবং মিসেসরাও হয় গাইবেন, না হলে মজার গল্প বলবেন, কবিতা আবৃত্তি করতে পারেন, যার যা খুশি।
সুতরাং দীপনাথের খুব একটা কাজ নেই। অনেকটা সময় সে একা কাটাতে পারবে।
কফির কাঁপের কানার ওপর দিয়ে তার চোখ খুব আলতোভাবে লক্ষ করছিল, কিন্তু মণিদীপাকে কোথাও দেখা যাচ্ছিল না। রাই মাখিয়ে গোটা দুই ভেজিটেবল স্যান্ডউইচ খেয়ে ফেলল সে। তারপর আবার বসে বসেই খুঁজতে লাগল চোখ দিয়ে। অবাধ্য চোখ বশ মানছে না। বড় জ্বালা।
অনেকটা দূরে একটা লিচু গাছের আড়ালে ক্যাম্বিসের চেয়ারে ঘোড়ায় চড়ার ভঙ্গিতে মণিদীপা বসে আছে, এটা আবিষ্কার করতে বেশ কিছুটা সময় লাগল। মণিদীপার সঙ্গে জনা দুই মহিলা ও জনা তিনেক পুরুষ রয়েছে। হাত পা নেড়ে প্রচণ্ড কথা বলছে তারা।
