আজ এত আদুরেপনা কেন তা বুঝল না শ্রীনাথ। কিন্তু একটু হাসল। বলল, না, তা কেন?
তৃষা বসে রইল। গেল না। ভারী অস্বস্তি হতে লাগল শ্রীনাথের। আজ কেন সব অন্য রকম হচ্ছে?
একটু বাদেই খাবার নিয়ে এল বৃন্দা। সামান্য খেল শ্রীনাথ। বৃন্দা দাঁড়িয়ে থেকে এঁটো পরিষ্কার করে নিয়ে গেল। তবু তৃষা বসে আছে।
শ্রীনাথ ইজিচেয়ারে বসে বলল, কিছু বলবে?
তৃষা মৃদু হেসে বলে, বলার জন্যই বসে আছি।
বলো।
তোমার শরীর এখন কেমন লাগছে?
খুব ভাল। কিছু হয়নি।
তৃষা উঠে দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে এল। আবার বিছানায় বসে অদ্ভুত এক হাসি হেসে বলল, আমি তোমার বউ না?
তাই তো জানি!–অবাক, ভীষণ অবাক হয়ে বলে শ্রীনাথ।
তৃষা বলে, বউ হলেও আমি ভাল বউ নই। তোমাকে একটা জিনিস থেকে বহুকাল বঞ্চিত করে রেখেছি। তাই না?
শ্রীনাথ খুব গম্ভীর হয়ে গেল। বুকের মধ্যে আবার সেই ধড়াস ধড়াস। সারা গায়ে শীতকাঁটা।
বলল, ঠিক নয়?–তৃষা আদুরে গলায় বলে।
শ্রীনাথ তৃষার মুখের দিকে তাকায়। না, তৃষার কোনও পরিবর্তন ঘটেনি। যেমন দৈনন্দিন মানুষটি ছিল, তেমনি আছে। শুধু চোখ-দুটো একটু দিপ-দিপ করে জ্বলছে। মুখে অদ্ভুত এক মোহিনী হাসি।
তৃষা বসা স্বরে ফিস ফিস করে বলল, আজ নাও। দিতে এসেছি। অভিমান কোরো না, মুখ ফিরিয়ে থেকো না। লক্ষ্মীটি!
শ্রীনাথের গলা শুকিয়ে আসছিল। তার শরীরের কামনা মরে যায়নি বটে, বরং সে রোজই তীব্র কাম বোধ করে। তবু এখনও এক রাত্রে দু’জন মেয়েমানুষের পাল্লা টানবার ক্ষমতা তার নেই। হাওড়া ময়দানের নমিতা তাকে আজ নিঃশেষ করেছে।
মৃদু স্বরে শ্রীনাথ বলে, আজ নয়।
আজই!–বলে উঠে আসে তৃষা। পাশে দাঁড়ায়। কানের কাছে মুখ এনে বলে। আজই। আজ আমি ভীষণ পাগল হয়েছি।
শ্রীনাথ সিঁটিয়ে যায়। কাঠ হয়ে বসে থাকে। তারপর বলে, তোমার এত ইচ্ছে ছিল না তো কখনও!
তুমি তার কী জানবে!
আমি জানব না তো জানবেটা কে?
আজ জেনে দেখো।
আজ নয়, তৃষা।
আজই। আজই চাই। এসো।
তৃষা শ্রীনাথের কোমর ধরে দাঁড় করিয়ে দেয়। তৃষার গায়ে অনেক জোর। এত জোর যে শ্রীনাথ ওকে ঠেকাতে পারল না।
বুকের বাঁ দিকে নিপলের ঠিক দু ইঞ্চি নীচে ক্ষীণ ব্যথাটা আবার টের পেল শ্রীনাথ।
তৃষা কানে কানে বলে, আমার যদি ইচ্ছেই না থাকবে তাহলে তোমার এতগুলো ছেলেপুলে হল কী করে?
শ্রীনাথ হঠাৎ বলে ফেলল, ইচ্ছে হয়তো আছে, তবে তা আমাকে নিয়ে নয়। আমার প্রতি তুমি বরাবর ক্যালাস ছিলে।
অবাক গলায় তৃষা বলে, তোমাকে নিয়ে নয়? তবে কাকে নিয়ে?
অনেক কথাই বলতে পারত শ্রীনাথ। কিন্তু ভদ্রতাবোধ এসে গলা টিপে ধরল। বাধা হয়ে দাঁড়াল লজ্জা। মৃত দাদা মল্লিনাথের প্রতি একরকম মায়া হল এ সময়ে। এত অকপটে তৃষার সঙ্গে সম্পূর্ণ ভাঙচুর করতে বুঝি-বা হল ভয়। তাই বলতে পারল না।
তৃষা বাতি নিভিয়ে দিয়ে চলে এল বিছানায়। এক ঝটকায় নিজেকে খুলে ফেলল। শ্রীনাথকেও শরীরে কোনও আবরণ রাখতে দিল না। নগ্ন শরীরে লেপটা টেনে নিল। বলল, লেপটা ভীষণ গণ্ডা কাল বের করে রেখে যেয়ো, রোদে দেব। চাবিটা রেখে যেয়ো, তাহলেই হবে।
শ্রীনাথ জবাব দেওয়ার আগেই তৃষা তার মুখ বন্ধ করে দিল জোরালো এক চুমুতে। বড় ঘিনঘিন করছিল শ্রীনাথের। মুখে লালা, ঠোঁট, শ্বাস কিছুই তার শরীরে সাড়া তুলছে না। নেতিয়ে অবশ হয়ে আছে শরীর।
এসো।–বলে হাত বাড়ায় তৃষা।
না তৃষা, আজ আমার ইচ্ছে নেই।
কানের কাছে হঠাৎ তীক্ষ্ণ শোনায় তৃষার গলা, ইচ্ছে নেই কেন? বহুদিন তো এসব হয়নি। ইচ্ছে না হওয়ার কথা নয়।
তৃষার হাত দারোগার মতো খানাতল্লাস করতে থাকে তার শরীরে।
শ্রীনাথ লড়াই করে, না তুষা, আজ আমার মন ভাল নেই।
তবু তৃষার সমস্ত শরীর হামলে পড়ে তার ওপরে। তার হাত তৎপর হয়। এমনকী টর্চ জ্বেলেও কী যেন দেখার চেষ্টা করে সে।
হঠাৎ শ্রীনাথ বুঝতে পারে, তৃষার এক ফোটাও কাম নেই। এতটুকুও ভালবাসা জাগেনি আজ ওর এই রাতে। তৃষার চোখ আর হাত একটা কিছু বুঝতে চাইছে। দেখতে চাইছে।
শ্রীনাথ ভয়ে প্রাণপণ প্রতিরোধের চেষ্টা করে। নিজেকে ঢাকতে চায়। তৃষাকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টাও করে সে।
কিন্তু জোরালো হাতে পায়ে বিছানার সঙ্গে তৃষা তাকে বেঁধে রাখে। পুরুষকে জাগিয়ে তোলার যতরকম মুদ্রা আছে তা প্রয়োগ করে যায় সে। টর্চ জ্বেলে পরীক্ষা করে তাকে।
তারপর গভীর এক খাস ফেলে তাকে ছেড়ে দেয়।
শ্রীনাথ উপুড় হয়ে বালিশে মুখ গুঁজে থাকে ঘেন্নায়। তৃষা জানল, সে আজ অন্য মেয়েমানুষের কাছে গিয়েছিল।
১৬. রবিবার দিনটা দীপনাথের নিরঙ্কুশ ছুটি
রবিবার দিনটা দীপনাথের নিরঙ্কুশ ছুটি থাকে। বেলা পর্যন্ত ঘুমোনো, আড্ডা, বিকেলের দিকে প্রীতম বা সোমনাথের বাড়িতে যাওয়া কিংবা আর্ট একজিবিশন, ভাল নাটক, বিচিত্র কোনও অনুষ্ঠান দেখে বেড়ানোর প্রোগ্রাম থাকে তার।
কিন্তু এই রবিবার ছুটি পেল না সে। বোস সাহেব বিরাট দল নিয়ে শিকারে যাচ্ছেন। মিঠাপুকুরের বাগানবাড়ি ছেড়ে দিয়েছে একজন বড় মহাজন। সেখানে কেটারারের এলাহি খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে।
দীপনাথের এইসব আমোদ-ফুর্তিতে কোনও সম্মানজনক ভূমিকা নেই। তাই সে আনন্দ পায় না, বরং যথেষ্ট উৎকণ্ঠিত থাকে। তবু এবার তার কোথায় একটু উত্তেজনাময় আনন্দের অনুভূতি হচ্ছিল। তার কারণ, অন্যান্য মহিলাকুলের সঙ্গে মণিদীপাও যাচ্ছেন।
নিজের মনের এই সাম্প্রতিক পাপবোধ দীপনাথকে যথেষ্ট খোঁচা দেয়। কিন্তু সে যেন তপ্ত ইক্ষু চর্বণ, জ্বলে গাল না যায় তাজন।
