শ্রীনাথ অধৈর্যের গলাতেই বলে, সেটাই বা তুমি কী করে জানলে?
তৃষা একটু ফিচেল হাসি হেসে বলে, লোকে বলে আমি নাকি তোমার মতো ভাল লোককে পায়ের তলায় দাবিয়ে রেখেছি। তুমি নাকি খুবই ন্যায়বান, যুক্তিবাদী, সৎলোক। এমনকী তুমি আমাকে ছেড়ে নাকি অন্য জায়গাতে চলে যাওয়ারও চেষ্টা করছ। এ রকম খারাপ একজন মহিলার সঙ্গে বাস করতে তোমার নাকি ভীষণ ঘেন্না হয়। এ সব শুনেই বুঝি, লোকের রাগ তোমার ওপর নয়।
তৃষা ইদানীং একসঙ্গে এত কথা বলেনি শ্রীনাথের সঙ্গে। তৃষা আজকাল তর্ক করে না, আলোচনা করে না, কথার পিঠে পিঠে খানিকক্ষণ জবাব দিয়ে এক সময়ে চুপ করে যায়। আজ তৃষার এত কথা এবং কথার মধ্যে চাপা একটা হতাশার ভাব লক্ষ করে অবাক মানে শ্রীনাথ।
সে বলল, এখানকার লোক কী বলে তা আমার কানে বেশি আসে না। তবে এটা বুঝি যে, এতদিনেও আমরা এ জায়গার লোক হয়ে উঠতে পারিনি।
তৃষা একটা শ্বাস ফেলে বলে, এক জায়গায় বিষয়-সম্পত্তি নিয়ে বসলেই সেই জায়গা আপন হয় না। পুরুষানুক্রমে থাকলে আত্মীয়তা জ্ঞাতিগুষ্টি বাড়লে তবে হয়।
তবু চেষ্টা করা উচিত ছিল।
কথাটা কি আমাকে উদ্দেশ্য করে বলছ?
তবে আর কাকে?
আমাকে দায়ী করছ কেন? এ জায়গার আপন হতে তুমিও তো চেষ্টা করছ না। কেবল একটা পালাই-পালাই ভাব।
শ্রীনাথ সাবধান হয়। বদ্রীকে দিয়ে সে যে জমি কেনার চেষ্টা করছে অন্য জায়গায় সেটাও কি তৃষা জানে? জানার কথা নয়। বদ্রীও বেশ কিছুদিন হল আসে না।
একটু চিন্তিত দেখাল শ্রীনাথকে। আস্তে করে বলল, এ জায়গাকে আমার আপন করে কী লাভ? তুমি থাকবে, সুতরাং দায়িত্ব তোমারই।
কেন? তুমি থাকবে না?
আছিই তো। যতদিন থাকা যায় থাকবও।
তৃষা বড় বড় চোখে তার দিকে চেয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর বলে, বিষয়-সম্পত্তি আমার হলেও সংসারটা কিন্তু আমার নয়। ছেলেমেয়েও আমি বাপের বাড়ি থেকে আনিনি। সুতরাং এখন থাকা না থাকার কথা তোলা খুব বীরপুরুষের কাজ হবে না।
আমি বীরপুরুষ নই বলেই কথাটা উঠল।
তুমি স্নান করে এসো। আমি যাই।— বলে তৃষা নিচু হয়ে বারান্দা থেকে তার ফ্ল্যাশ লাইট কুড়িয়ে নিল। তারপর অন্ধকারে তাকে আর দেখা গেল না।
শ্রীনাথ ডেকচির জল নিয়ে কলপাড়ে গিয়ে খুব ঘষে ঘষে স্নান করল আজ।
কলপাড় থেকেই দেখা যাচ্ছিল, পুকুরের ধারে আজও শুকনো কাঠকুটো দিয়ে মস্ত আগুন জ্বেলেছে নিতাই।
স্নান করে ফিরে এসে বারান্দায় উঠে শ্রীনাথ হাঁক পাড়ল, নিতাই নাকি রে?
হ্যাঁ।
শুনে যা।
ভেজা গায়ে উত্তুরে হাওয়ায় ভোলা বারান্দায় শীতে কাঁপছিল শ্রীনাথ। নিতাই কাছে আসতেই বলল, শুনলাম এর মধ্যে কবে যেন সরিৎবাবু তোকে মেরেছে।
নিতাই হাসে, দুর। দূর। মারবে কী? গাঁজার নেশায় তখন বাবুর গায়ে জোর ছিল নাকি?
শ্রীনাথ অবাক হয়ে বলে, সরিৎ গাঁজা খেয়েছিল?
বোজ নয়। সেদিন খেয়েছিল।
মারল কেন?
আজ্ঞে নেশা-ভাঙের মুখে কোন কথা থেকে কোন কথা বেরিয়ে যায়। তার কোনটা শুনে বাবুর রাগ হল কে বলবে?
মেরেছিল যে, সেটা আমাকে বলিসনি কেন?
নিতাই খুব হেসে-টেসে বলল, পরদিনই আবার খাতির হয়ে গিয়েছিল কিনা।
সরিৎ ছেলেটা কেমন? গুন্ডামি-টুন্ডামি করে না তো!
আজ্ঞে না। লোক খুব ভাল।
বদ্রী তপাদারের বাড়িটা চিনিস?
খুব চিনি। লাইনের ওধারে উত্তরদিকে আমরাগান পেরিয়ে মাইলটাক।
কাল ওকে গিয়ে খবর দিবি তো। বলবি জরুরি দরকার। আসে যেন একবার কাল পরশু।
দেবোখন। এই সেদিনও মা ঠাকরোন ডাকিয়ে এনেছিলেন। আমিই গিয়ে খবর দিয়েছিলাম কিনা।
শ্রীনাথ অবাক হয়ে বলে, সজলের মা বদ্রীকে ডাকিয়েছিল?
আজ্ঞে।
কেন?
তা জানি না। আশ্চর্য তো!
আচ্ছা, তুই যা।
খুবই অন্যমনস্ক হয়ে গেল শ্রীনাথ। এত অন্যমনস্ক যে ঘরে ঢুকেও সে ঘরটাকে লক্ষই করল না। ডেকচি, বালতি, মগ, গামছা সব যন্ত্রের মতো যেখানকার জিনিস সেখানে রাখল। ধোয়া লুঙ্গি পরল, উলিকটের গেঞ্জি গায়ে দিয়ে চাদর জড়াল। চুল আঁচড়াল।
তারপর ইজিচেয়ারে বসতে গিয়েই সাপ দেখার মতো চমকে উঠল ভীষণ। বুকের ভিতর ধড়াস ধড়াস করে হৃৎপিণ্ড আছাড়িপিছাড়ি খাচ্ছে।
তার বিছানায় খুব অলস ভঙ্গিতে টর্চ হাতে তৃষা বসে আছে।
বোধ হয় চমকানোতে মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গিয়েছিল শ্রীনাথের। বোধ হয় চমকটা বাইরে থেকেও বুঝতে পেরেছিল তৃষা। উঠে এসে বুকে হাত রেখে বলল, আমারই অন্যায়। একটা জানান দেওয়া উচিত ছিল। ভয় পেয়েছ?
শ্রীনাথ কথা বলতে পারল না বুকের অসহ্য ধড়ধড়ানিতে। শুধু মাথা নেড়ে জানাল, না।
আমাকে তোমার ভয় কিসের?
অনেকক্ষণ দম নিয়ে স্বাভাবিক হল শ্রীনাথ। বুকটা তার বোধ হয় ভাল নয়। ক্ষীণ একটু যন্ত্রণা হচ্ছে যেন। এক মেডিক্যাল রিপ্রেজেনটিটিভ বন্ধু কে সাবধান করে দিয়েছিল, দেখো ভায়া, যদি বাঁ দিকের বুকের নিপলের দুইঞ্চি নীচে কখনও ব্যথা-ট্যথা হয় তবে ঠিক হার্ট ট্রাবলের লক্ষণ বলে জেনো।
ব্যথাটা হচ্ছে। শ্রীনাথ চোখ বুজে অনুভব করে।
তৃষা ইজিচেয়ারের ধারে দাঁড়িয়ে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল। বলল, তোমার তো কখনও এমন শরীর খারাপ হয় না।
শ্রীনাথ চোখ মেলে বলল, ওটা কিছু নয়। বলল, কী বলবে?
এখন তোমার ভাল লাগছে তো!
হ্যাঁ। ভাল।
তৃষা আবার বিছানায় গিয়ে বসল। তোমার খাবারটা আমি এ ঘরেই পাঠিয়ে দিতে বলেছি। এই শীতে আবার অত দূরে যাবে?
শ্রীনাথ মৃদু স্বরে বলে, ভালই করেছ।
আবার ভেবে বসবে না তো যে, তোমাকে এইভাবে আলাদা আর পর করে দিচ্ছি! লোকে কত ভুল ভাবতে ভালবাসে।
