শ্রীনাথ উদাস গলায় বলল, কেউ কারও না। আমার আর ওসব সেন্টিমেন্ট নেই।
না থাকলে তো মুক্ত পুরুষ। তবে তুমি যাবে না জানলে আমি বিলুর চিঠির জবাব দিতাম। চাই কি একবার নিজেই যাওয়ার চেষ্টা করতাম।
শ্রীনাথ আজকাল সংসারের কোনও দায়দায়িত্বের কথা শুনলেই রেগে যায়। যখন চাকরির টাকায় সংসার টানত তখন অভ্যাস ছিল। এখন দায়দায়িত্ব না নিয়ে নিয়ে তার ভেতরটা অলস হয়ে গেছে। কোথাও যেতে ইচ্ছে করে না। কারও সঙ্গে দেখা করার কথা ভাবতে তার গায়ে জ্বর আসে।
শ্রীনাথ বলল, তুমি গেলেই তো ভাল হয়।
তাই যেতে হবে দেখছি।
সজল মা-বাবার কথা শুনছিল না। খুব সাবধানে হাত বাড়িয়ে ক্ষুরটা ছুঁয়ে দেখছিল। কী দারুণ ধার!
শ্রীনাথ কথাটা কী ভাবে তুলবে বুঝতে পারছিল না। একটু দোনোমোনো করে বলল, আজ বুলু অফিসে এসেছিল।
তৃষা অবাক হল না। শান্ত স্বরে বলল, তাই নাকি?
শমিতার বুঝি বাচ্চা হবে।
ও। ছোটবাবু কি সেই খবর দিতেই এসেছিল? না কি অন্য মতলব আছে?
মতলবের কথা বলতে পারব না। তবে বলছিল সামনের রবিবার বাবাকে এখানে দিয়ে যাবে। বাবার ওখানে খুব অসুবিধে হচ্ছে।
তৃষা মৃদু একটু হেসে বলে, তা তুমিও কী বললে?
আমি মতামত দিইনি।
ওমা! কেন?
আমি তো মতামত দেওয়ার মালিক নই। তোমার সঙ্গে কথা বলে জানাব বলেছি।
এতে আমার সঙ্গে পরামর্শ করার কী আছে? ছোটবাবু যদি শ্বশুরমশাইকে না রাখতে চায় রাখবে। আমাদের এখানে অনেক ঘর আছে। উনি স্বচ্ছন্দে এসে থাকতে পারেন। এর আগেও তো আমি বলেছি, শ্বশুরমশাইকে দিয়ে যেতে। ছোটবাবু রাজি হয়নি।
শ্রীনাথ এ কথা শুনে খুশি হল না, অখুশিও হল না। তবে একটু অবাক হল। তৃষা এখনও সম্পর্ক অস্বীকার করছে না, এখনও উদারভাবে দায়দায়িত্ব নিতে চাইছে। অথচ এক সময়ে শ্বশুর-শাশুড়ির দায়দায়িত্ব নিয়ে গরিব অবস্থায় অনেক মন কষাকষি হয়েছে তাদের। তৃষা কেন এত উদার হয়ে যাচ্ছে সেটা বোঝা মুশকিল।
শ্রীনাথ বলল, ঠিক আছে। বুলুকে তাই বলে দেব।
বোলো। না বললেও ছোটবাবু দিয়ে যাবে ঠিকই। বাবা এখানে থাকলে ওরও যাতায়াতের একটু উপলক্ষ হয়।
তৃষার বুদ্ধি দেখে একটু তাক লাগে শ্রীনাথের। তৃষার বুদ্ধি বরাবরই প্রখর ছিল৷ এখন মানুষ চরিয়ে সেটা আরও সাংঘাতিক ধারালো হয়েছে।
শ্রীনাথ মাথা নিচু করে বসে নিজের হাতের দিকে চেয়ে রইল। কিছু বলার নেই।
তৃষা বলে, তোমার জল ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। স্নান করলে করে নাও।
হুঁ।–বলে শ্রীনাথ ওঠে।
সজলকে আর কিছু বলবে?
না। ক্ষুরটা দেওয়ার জন্যই ডেকেছিলাম।
ক্ষুরটা ও নেবে না। ওটা সাবধানে রেখে দাও যাতে কেউ নাগাল না পায়। আর কখনও আমাকে জিজ্ঞেস না করে ওকে কিছু দিয়ো না।
শ্রীনাথ একটু বিষ-হাসি হেসে বলেই ফেলল, ক্ষুরের চেয়ে বন্দুক অনেক বিপজ্জনক। তুমি বন্দুকটাও সাবধানে রেখো।
বন্দুকের কথা যে তৃষা শ্রীনাথকে বলেনি সেইটে মনে করেই শ্রীনাথ চিমটিটুকু কাটল।
তৃষা অবশ্য চোখের পাতাও ফেলল না। মুখের ভাবেরও কোনও বদল হল না তার।
শান্ত স্বরে তৃষা বলল, তুমি কোনও ব্যাপারেই মাথা ঘামাও না বলে বন্দুকের কথাটা তোমাকে বলিনি। আজকাল অনেক সময়ে নগদ টাকা বা সোনাদানা ঘরেই রাখতে হয়। চারদিকে যে ভীষণ ডাকাতি হচ্ছে সেই কথাটা ভেবেই বন্দুকটা ফেরত চেয়েছি। বন্দুক থাকবে আমার স্টিলের আলমারিতে। কোনও ভয় নেই।
আমাকে বলোনি বলে কিছু মনে করিনি। তবে কথাটা বুলুর মুখ থেকে শুনে জানতে হল বলে খারাপ লাগে। বাইরের লোকেও যা জানে তা ঘরের নোক হয়েও আমি জানি না।
তৃষা সজলের দিকে চেয়ে বলল, তুমি গিয়ে শুয়ে পড়ো। রাত হয়েছে।
মা-বাবার কথা চালাচালি হাঁ করে শুনছিল সজল। তৃষা বলার পর বাধ্য ছেলের মতো ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। বারান্দায় মেঝের ওপর তৃষা তার মস্ত ফ্লাশলাইট উপুড় করে রেখে এসেছিল। বাতি জ্বালিয়ে সজলকে পথটা দেখিয়ে দিয়ে আবার ফিরে আসে তৃষা। আগের ভঙ্গিমাতেই দরজায় ঠেস দিয়ে একটু বাঁকা হয়ে দাঁড়িয়ে বলে, ছেলের সামনে ওসব কথা না তুললেই ভাল।
আমি তুলতে চাই না। কথা আপনি ওঠে।
বন্দুকের কথা তোমাকে হোটবাবু বলেছে?
হ্যাঁ।
অনেক খবর রাখে তা হলে?
নিজের স্বার্থেই রাখে। বোধ হয় এখানকার লোকজনকে নিয়ে একটা ঘোঁটও পাকাচ্ছে।
সেটা জানি। এখানকার অনেক লোকও মুখিয়ে আছে আমাকে জব্দ করার জন্য।
শ্রীনাথ অধৈর্যের গলায় বলে, সেটা নতুন কথা নয়। কিন্তু আমার জানতে ইচ্ছে কবে এখনও লোকে আমাদের শত্রু ভাববে কেন?
সবাই ভাবে না।
কিছু লোকেই বা ভাববে কেন?
শ্রীনাথ সামান্য উঁচুতে তোলে গলা। বরাবর সে অসম্ভব শান্তিপ্রিয় ফুর্তিবাজ মানুষ। কোনও ঝুট ঝামেলা পছন্দ করে না। কোনও বিরুদ্ধতা দেখলেই সে গুটিয়ে যায়।
তৃষা বলল, তাতে তোমার দুশ্চিন্তার কিছু নেই। তারা আমাকেই শত্রু ভাবে। তোমাকে নয়।
শ্রীনাথ শ্লেষের হাসি হেসে বলল, যাক এতদিনে তবু স্বীকার করলে যে তুমি আর আমি দুটো সম্পর্কহীন আলাদা লোক।
তৃষা ভ্রু কুঁচকে বলে, কথাটার মানে কি তাই দাঁড়াল?
তাই দাঁড়ায়।
আমি তো ওরকম ভেবে বলিনি।
শ্রীনাথ ইজিচেয়ারে বসে পড়ে আবার। মাথার পাতলা চুলে উত্তেজিত আঙুল চালাতে চালাতে বলে, কী ভেবে বলেছ তা তুমি জানো আমিও জানি।
তৃষা শান্ত গলায় এতটুকুও উত্তেজিত না হয়ে বলে, তুমি বিষয়-সম্পত্তির মধ্যে থাকে না। সে হয়তো তোমার অভিমান। সম্পত্তি যেহেতু আমার নামে। তুমি দেখো না বলেই আমাকে দেখতে হয়। লোকেও লক্ষ করছে বিষয়-সম্পত্তি আমিই দেখি। আমিই সংসার চালাই। লোকে সেটা সহ্য করতে পাবে না। একজন মেয়েমানুষকে ক্ষমতায় দেখতে পুরুষরা পছন্দ করে না। তার ওপর এখানকার বেশির ভাগ পুরুষই অপদার্থ, কুচুটে, পরশ্রীকাতর। তাদের তেমন কোনও কাজ না থাকায় ওইসব করে বেড়ায়। তবে তোমার সম্পর্কে তাদের কোনও রাগ নেই।
