তোমার ক্ষুরটা ধরেছিলাম বলে রাগ করেছ, বাবা?
একটু করেছিলাম। এখন আর রাগ নেই। টেবিলের ডান ধারের দেরাজে আছে। বের করে নাও। ওটা তোমাকে দিলাম।
দিলে?–উজ্জ্বল হয়ে সজল জিজ্ঞেস করে।
হুঁ। কিন্তু খুব সাবধান। অসম্ভব ধার। হাত-টাত কেটে ফেলো না।
না, আমি দাড়িই কাটব।
দাড়ি!— অবাক হয়ে শ্রীনাথ তাকায়।
হি হি। নিতাইদা যখন ঘুমোবে তখন চুপি চুপি গিয়ে ওর দাড়ি কামিয়ে দিয়ে আসব।
সর্বনাশ।–শ্রীনাথ প্রায় দাঁড়িয়ে পড়ে, খবরদার ওসব করতে যেয়ো না। কখন গলায় বসিয়ে দেবে অসাবধানে। তা হলে কিন্তু ফাঁসি।
আচ্ছা। তাহলে রেখে দেব। বড় হলে নিজের দাড়ি কামাব।
ক্ষুরটা ওকে দেওয়া ভুল হল কি? হয়তো। কিন্তু এখন দেওয়া জিনিস ফেরত নেওয়া ঠিক হবে না।
শ্রীনাথ বলে, তুমি মাকে জিজ্ঞেস করে এখানে এসেছ তো!
হ্যাঁ।–ঘাড় নাড়ে সজল। বলে, মা বারান্দা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে গেল।
তোমার মা!— বলে আবার সচকিত হয়ে খাড়া হয় শ্রীনাথ।
ঠিক সেই মুহূর্তে দরজার আড়াল থেকে কালো শাড়ি পরা তৃষা দরজার আলোয় দেখা দেয়।
অস্বাভাবিক কিছুই নয়। তার স্ত্রী এই ঘরে আসতেই পারে। তবু ভীষণ যেন চমকে যায় শ্রীনাথ। যেন তার লুকোনো কোনও ষড়যন্ত্র ধরা পড়ে গেছে। প্রকাশ পেয়েছে তার ভীষণ কোনও গোপনীয়তা।
শ্রীনাথ বলল, তুমি!
তৃষা গম্ভীর মুখে বলে, অবাক হওয়ার কী হল? আমি তো ভূত নই। মানুষ।
১৫. শ্রীনাথ নিজেকে সামলে নিয়ে বলল
শ্রীনাথ নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, এসো। কিছু বলবে?
তৃষা খুব তীক্ষ্ণ চোখে সজলের দিকে চেয়ে ছিল। চৌকাঠের ওপাশ থেকেই বলল, ক্ষুরটা কি তুমি সজলকে দিয়ে দিলে?
হুঁ।
কেন দিলে?
ওর ওটার ওপর খুব লোভ। প্রায়ই চুরি কবে আমার ঘরে ঢুকে ক্ষুরটা নিয়ে দুষ্টুমি করে বেড়ায়।
তাই দেবে? বাচ্চা ছেলের হাতে ধারালো জিনিস থাকলে কত কী বিপদ হতে পারে।
শ্রীনাথের যে কথাটা মনে হয়নি তা নয়। কোথায় যেন একটু অপরাধবোধ জেগে ওঠে তার। বলে, ওকে বলেছি রেখে দিতে।
তৃষা কঠিন গলায় বলল, সজল কি খুব বাধ্য ছেলে? ওকে তুমি চেনো না?
শ্রীনাথ বিরক্ত হয়ে বলে, অ৩ ভেবে দেখিনি। না দিলেও তো নিজে থেকেই নেবে।
তাই ওই সর্বনেশে জিনিস হাতে তুলে দিতে হবে? ওইটে দিয়েই মুরগি কেটেছিল!
সজল টেবিলের ধারটায় কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মা বাবা দু’জনকেই সে সাংঘাতিক ভয় পায়। ক্ষুরটা নিয়ে কী করবে বুঝতে না পেরে মুঠোয় ধরে রেখেছে। চোখ দরজার দিকে।
শ্রীনাথ কঠিন স্বরে বলে, তার আগে আমার জানা দরকার মুরগি কাটার জন্য ক্ষুরটা ও পেয়েছিল কী করে! আমার ঘরে ঢুকল কী করে?
তৃষা শ্রীনাথের দিকে স্থির তীব্র চোখে চেয়ে বলে, সেটা ওকেই জিজ্ঞেস কোরো। আমার সেটা জানার কথা নয়।
শ্রীনাথ এ নিয়ে কথা বাড়াতে চায় না। চাবিব কথা উঠলে সজলের নাম ফাঁস হয়ে যাবে। তাই সে তৃষার চোখের দিকে না তাকিয়ে বলল, আমার দেওয়ার ভাগ দিয়েছি। তোমার ভয় করলে ওর কাছ থেকে নিয়ে নাও।
তৃষার গলায় বেশির ভাগ সময়ে উম্মা থাকে না, কাঠিন্য থাকে। ঠান্ডা নিরুত্তাপ একরকম রক্ত জল করা গলায় বলল, ও খুব স্বাভাবিক নয়। ক্ষুর, ছুরি বা ওরকম কিছু পেলে ও যা-খুশি করতে পারে। নিজের গলাতেও বসিয়ে দেওয়া অসম্ভব নয়। এটা তোমার না জানার কথা নয়। নিজেও দেখছ।
শ্রীনাথ অবাক হয়ে বলে, আমি জানব কী করে? আমাকে কেউ এ রকম কিছু বলেনি তো!
নিজের ছেলে সম্পর্কে আর-একটু খোঁজ-খবর রাখাটা বোধ হয় ছেলের ভালর জন্যই দরকার।
বলে তৃষা সজলের দিকে তাকাল। খুবই শান্ত গলায় বলল, ক্ষুরটা তোমার বাবাকে ফেরত দাও।
সজল টেবিলের ওপর ক্ষুবটা রেখে দেয়। আস্তে করে বলে, বাবা বলছিল আমি যেন বড় হয়ে ওটা দিয়ে দাড়ি কামাই।
তৃ তেমনি শান্ত স্বরে বলে, দাড়ি যখন হবে তখন ক্ষুরেরও অভাব হবে না!
এর মধ্যে শ্রীনাথের কিছু বলা সাজে না। সে তাই অপমানিত বোধ করেও চুপ করে থাকে।
তৃষা চৌকাঠ ডিঙোল না। দরজার কোণে বাঁকা হয়ে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে বলল, কিছু বলতে আসিনি। সজলকে বিকেলে আসতে বলেছিলে, ও অনেকবার তোমার খোঁজ করে ফিরে গেছে। রাতে আবার এল। অন্ধকার উঠোন পেরোতে ভয় পায় বলে সঙ্গে এসেছি। দেরি দেখে সজল ভাবছিল।
শ্রীনাথ বলল, অফিসে কাজ ছিল। বিকেলে ফিরতে পারিনি।
সে তো থাকতেই পারে।–তৃষা স্টোভে বসানো জলটার দিকে চেয়ে বলল, তোমার জল ফুটে গেছে।
ডেকচির ঢাকনা ঠেলে ফুটন্ত জল পড়ে স্টোভের আগুন লাফাচ্ছে। শ্রীনাথ উঠবার আগেই অবশ্য তৃষা গিয়ে আঁচল দিয়ে ডেকচিটা নামিয়ে স্টোভটা এক ফুয়ে নিভিয়ে দিয়ে বলল, আজকাল বোজ রাতে স্নান করছ! কী ব্যাপার?
শ্রীনাথ বাধোবাধো গলায় বলে, কলকাতায় যা ধুলো ময়লা… তার ওপর প্রেসের কালিঝুলি… শরীরটা কেমন খিত খিত করে।
আগে তো এই অভ্যাস ছিল না!
এখন হচ্ছে।
তৃষা আর এ নিয়ে ঘাঁটাল না। বলল, প্রীতমবাবুর অসুখের খবর পেয়েছিলাম। তাকে একবার দেখতে গিয়েছিলে?
শ্রীনাথ একটু লজ্জা পায়। বলে, না। সময় হয়নি।
কী হয়েছে তাও তো জানা দরকার ছিল। তুমি যাবে বলে আমি বিলুর চিঠির জবাব পর্যন্ত দিইনি। এটা ভীষণ অভদ্রতা হল। ওরা কী মনে করছে!
শ্রীনাথ শ্বাস ফেলে বলল, জেনে আর হবেটা কী? ওসব না জানাই ভাল।
তৃষার গলা একটু তীক্ষ্ণ হল, কেন?
আমরা ওদের জন্য আর কী করতে পারি?
করতে না পারলেই বা, বিপদের দিনে গিয়ে একটু সামনে দাঁড়ালেও মানুষ জোর পায়। তোমারই বোন-ভগ্নিপতি, তাই বলেছিলাম।
