ভাই কথাটা কানে শুনেই বুঝেছিল সোমনাথ। দীপনাথ কিছুতেই নয়। কারণ দীপ ভাই হলেও একটু দূরের ভাই।
প্রেসটা বিরাট বড় দরের হলেও রিসেপশন বা ওয়েটিং রুম বলে কিছু নেই। বাইরের দিকে সুপারিনটেনডেন্টের ফাঁকা অফিসে বসে আছে সোমনাথ। মুখটায় চোর-চোর ভাব, চোখের দৃষ্টিতে শেয়ালের মতো একটা এড়ানো-এড়ানো ভাব।
প্রকৃতির নিয়মে বাপের মেজো ছেলেরাই নাকি সবচেয়ে পাজি হয়। তাদের ক্ষেত্রে সেটা হয়নি। শ্রীনাথ নিজেই মেজো। সে কতটা পাজি তা হিসেব করে দেখেনি এখনও। কিন্তু পাজি বলতে সত্যিকারের যা বোঝায় তা হল সোমনাথ। মল্লিনাথের সম্পত্তির ভাগ চাইছে বলেই নয়, সোমনাথ বুড়ো বাবাকে নিজের কাছে রেখে অন্য দুই ভাইয়ের কাছ থেকে সেই বাবদ টাকা নেয়। ভয়ংকর কৃপণও বটে। সরকারের একটা বিল সেকশনে কাজ করে। ঠিকাদারদের কাছ থেকে প্রচুর টাকা ঘুষ নেয়।
শ্রীনাথ বলল, কী রে?
তোমার সঙ্গে দেখা করতে এলাম।
সোমনাথের কপালে এখনও সেই মারের দাগ রয়েছে। মরতে মরতে বেঁচে গিয়েছিল।
শ্রীনাথ দারোয়ানকে দু’ভড় চা আনতে পাঠিয়ে বসে বলল, সব ভাল তো?
সোমনাথের চেহারাটা মন্দ নয়। মোটাসোটা, গোলগাল, গোপাল-গোপাল চেহারা। যতদিন বেঁচে ছিল ততদিন ছোট ছেলেকে চূড়ান্ত আদর দিয়ে গেছে। সেই সুবাদেই এই চেহারা।
সোমনাথ বলল, বাবার অবস্থা তো জানোই! যে-কোনওদিন হয়ে যাবে।
জানা কথা। বাবার খবরের জন্য ব্যস্ত নয়ও শ্রীনাথ। এই সব নিষ্ঠুরতা বয়সের সঙ্গে সঙ্গে আসে। বাবা যে কবে ফালতু হয়ে গেল তা টেরও পায়নি। কিন্তু হয়েছে।
শ্রীনাথ একটু দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, সে তো জানি।
সোমনাথ মার খাওয়ার পর দু-তিন বার ওকে দেখতে এসেছিল শ্রীনাথ। তখন বাবার সঙ্গেও দেখা হয়। কিন্তু দেখা হওয়া আর না হওয়া সমান। বাবা এখনও তোক চিনতে পারছেন বটে কিন্তু কারও জনাই কোনও অনুভূতি নেই। সোমনাথ যে হাসপাতালে তা শুনেও নির্বিকার। বিকেলের জলখাবার নিয়ে শমিতার কাছে বায়না করছিল বলে শমিতা কটকট করে উঠল। বলল, আপনার ছেলে হাসপাতালে সিরিয়াস অবস্থায় পড়ে আছে, আর আপনি চিড়েসেদ্ধ চিড়েসেদ্ধ করে পাগল হচ্ছেন! এ রকমই ধারা নাকি আপনাদের?
কথাটা তা নয়। বাবা এখন সুখ-দুঃখ ভাল-মন্দ এই সব অনুভূতির বাইরে চলে গেছে। বোধ-বুদ্ধি ছোট হয়ে হয়ে এখন কেবল নিজের জৈবিক চাহিদাটুকু নিয়ে সীমাবদ্ধ হয়ে আছে। এও হয়তো এক ধরনের পাগলামি। তবে যাই হোক, বাবাকে নিয়ে তাদের আর খুব বেশি ভাবনা-চিন্তা নেই। তৃষা কিছুকাল আগেই শ্রীনাথকে একবার বলেছিল, শ্বশুরমশাইকে এখানে এনে রাখলেই তো হয়। এখানে অনেক ফাঁকা ঘর, খোলামেলা জায়গা, দেখাশুনো করার লোকও আছে, তবে কেন উনি সোমনাথদের খুপরি বাসায় পড়ে থাকবেন?
যখনকার কথা তখনও সোমনাথ মার খায়নি। ফি-রবিবারে সস্ত্রীক ঝগড়া করতে আসত। প্রস্তাব শুনে কিন্তু সোমনাথ বা শমিতা কেউ রাজি হল না। বলল, না, উনি আমাদের কাছেই থাকতে চান। অন্য কোথাও যাওয়ার নাম করলেই রেগে ওঠেন।
কথাটা মিথ্যেও নয়। বুড়ো বয়সে অনেক সময়েই অভ্যস্ত জায়গা ছেড়ে লোকে অন্য কোথাও যেতে চায় না। যুক্তি হিসেবে ছেলেমানুষের মতো বলে, এ বাড়িতে পায়খানাটা কাছে হয়, এখানে জলের সুবিধে, সোমনাথ রোজ মাছ আনে ইত্যাদি। তবু বাবাকে জোর করে আনাও যেত এবং তাতে ফল খারাপ হত না। কিন্তু সোমনাথ রাজি হল না অন্য কারণে। বাবার খরচ বাবদ তৃষা মাসে মাসে ওকে তিনশো টাকা করে পাঠাত এবং শ্রীনাথ যত দূর জানে, এখনও পাঠায়। কর্তব্যের ব্যাপারে তৃষার কোনও ত্রুটি নেই। আর কিছু সোমনাথ আদায় করে বিলু আর দীপনাথের কাছ থেকে। দীপ মাসে মাসে দেয় না, কিন্তু কখনও-সখনও থোক পাঁচ-সাতশো টাকাও দিয়ে ফেলে। সুতরাং বাবাকে নিজের কাছে রাখলে সোমনাথের লাভ ছাড়া ক্ষতি নেই।
সোমনাথ একটু চুপ করে থেকে বাবা সম্পকে ট্র্যাজেডি শ্রীনাথের মাথায় বসতে সময় দিল। তারপর বলল, আমি ছেলে হিসেবে কোনও ত্রুটি রাখি না, সব কর্তব্যই করি।
হুঁ।— শ্রীনাথ ওর মতলব বুঝতে না পেরে সাবধান হয়ে সংক্ষেপে উত্তর দিল।
সোমনাথ দুঃখী-দুঃখী মুখ করে গম্ভীর গলায় বলল, শমিতার শরীরটা ভাল যাচ্ছে না।
কী হয়েছে?
সোমনাথ অপরাধীর মতো মুখ নিচু করে বলে, ছেলেপুলে হবে।
ও।
তাই বলছিলাম এ অবস্থায় বাবার যত্ন-আত্তি ঠিক মতো হবে না। বাবার অবশ্য অত বোধটোধ নেই, কিন্তু আমার তো বিবেক আছে। ডাক্তার শমিতাকে কাজকর্ম করতে একদম বারণ করেছে, বেশি নড়াচড়া করলে মিসক্যারেজ হয়ে যেতে পারে।
কোনও ডিফেক্ট আছে নাকি?
আছে।
তা হলে এখন কী করতে চাস?
যদি কিছু মনে না করো তো বলি, এখন বাবাকে কিছুদিন তোমাদের কাছে নিয়ে রাখো।
শ্রীনাথ টক কবে প্রস্তাবটায় রাজি হতে পারে না। তৃষা এক সময় শ্বশুরকে তার কাছে রাখতে চেয়েছিল বটে, কিন্তু এতদিনে যদি মত পালটে থাকে? বাড়ি তো শ্রীনাথের নয় যে নিজে সিদ্ধান্ত নেবে।
শ্রীনাথ বলল, তোর বউদিকে একটু বলে দেখ।
সোমনাথ একটু উম্মার সঙ্গে বলল, বউদিকে বলব কেন? বউদি কে? তুমি কর্তা, তুমিই ডিসিশন নেবে।
শ্রীনাথ অবাক হয়ে বলে, আমি কিসের কর্তা? কোনও ব্যাপারেই আজকাল আমি থাকি না।
সোমনাথ ওপরওয়ালার মতো চড়া গলায় বলল, থাকো না কেন? থাকো না বলেই তো মেয়েমানুষের বাড় বাড়ে।
বিরক্ত হয়ে শ্রীনাথ বলে, ওসব কথা থাক। আমি না হয় তোর বউদিকে আজ জিজ্ঞেস করব’খন, কাল এসে জেনে যাস।
