তুমি কেমন সরিৎ?
সরিৎ না, ব্রাদার।
হ্যাঁ হ্যাঁ, ব্রাদার।
আমিও ভাল না জামাইবাবু। বড়দার কাছে ছিলাম। ভাল ছিলাম না। সেজদি ডেকে আনল, এলাম। দেখি এখানে কেমন থাকি।
খারাপ লাগছে না তো এখানে?
ভাল কি লাগার কথা! বেকারকে কাজ না দিয়ে যত ভালই রাখুন সে ভাল থাকে না।
শ্রীনাথ চিন্তিত মুখে বলে, সেটা তো সকলেরই প্রবলেম ব্রাদার।
আমারও। তাই বলি, কেমন আছি না জানতে চেয়ে বরং আমারও মঙ্গল প্রার্থনা করুন।
দূর পাগলা! তোমার তো বয়স কম, জীবনটাই পড়ে আছে।
একটা চাকরি দিন, তবেই জীবন থাকবে। নইলে কবে শুনবেন, ট্রেনের তলায় গলা দিয়েছি।
যাঃ!–বলে হাসে শ্রীনাথ।
মাইরি জামাইবাবু! বিশ্বাস করুন।
১৪. চাবিটার কথা
চাবিটার কথা কিছুতেই ভুলতে পারছে না শ্রীনাথ। তৃষা তাকে গোপন করে ভাবন-ঘরের একটা চাবি করিয়ে রেখেছিল কেন তা বুঝতে অবশ্য তার কষ্ট হয় না। সোজা কথা শ্রীনাথের এই একটেরে ঘরখানার ভিতরেও তুষার দখলদারি রয়ে গেল। অবারিত হল ঘরখানা। শ্রীনাথের কিছু লুকোনোর রইল না, তার অনুপস্থিতিতে নিরাপত্তাও রইল না ঘরখানার।
মানুষ ঘর ঘর’ করে গলা শুকোয়। শ্রীনাথেরও শুকোত এতদিন। আজকাল সে ঘরের অসাড়তা বুঝতে পারে। এই সব অবসেসন অভিভূতির কোনও মানে হয় না। একখানা ঘর আর কতখানিই বা আশ্রয় দেয় মানুষ্য, যদি না ঘরের লোক আপন হয়। মিস্ত্রি এসে যে ঘর তৈরি করে দিয়ে যায় তার কোনও ব্যক্তিত্ব নেই, বিকার নেই। সেই ঘরে যে সব মানুষজন বসবাস করতে আসে তারাই ইট-কাঠ-টিনের ওপর নানা মায়া ভালবাসার পলেস্তারা দেয়, স্মৃতিব রং মাখায়, কত ঠাট্টা ইয়ারকি খুনসুটি, আদর ভালবাসা দিয়ে পূরণ করে তোলে ঘরের শূন্যতাকে। শ্রীনাথ তবে কেন ঘর ঘর করে মরবে? ঘর তো তুষার।
সরিৎ চলে যাওয়ার পর খানিক বসে এই তত্ত্বকথা চিন্তা করল সে। তারপর উঠে খুব তীক্ষ্ণ নজরে নিজের দেরাজ খুলে সব পরীক্ষা করল। বাক্স তোরঙ্গ উলটে পালটে দেখল। সবই ঠিক আছে। দেরাজের বা বাক্সের চাবিও হয়তো করিয়েছে তৃষা। কে জানে? তার চেক বই, পাশ বই, ইনসুয়েরেনসের পলিসি, শেয়ার সার্টিফিকেট, নগদ টাকা এসবই বোধ হয় খুঁটিয়ে দেখেছে।
মালদা থেকে সরিৎকে কেন আনিয়েছে তৃষা তাও খানিকটা আন্দাজ করতে পারে শ্রীনাথ। এ কথা তৃষা ভালই জানে যে জমিজিরেতের ওপর নির্ভর করে থাকার বিপদ আছে। মল্লিনাথের সব জমি আইনত তার নয়ও। ভুতুড়ে জমি মেলাই আছে। যে-কোনওদিন শত্রুরা খবর দিয়ে ধরিয়ে দেবে আর সরকার জমি কেড়ে নেবে। কানাঘুষোয় শ্রীনাথ শুনেছে, তৃষা বড় পাইকারি দোকান দেবে। চালকল খুলবারও ইচ্ছে আছে। হয়তোবা সেই সব কাজের জন্য বিশ্বস্ত লোকের দরকার বলেই আনিয়েছে সরিৎকে।
সরিতের ইতিহাসটা খুব পরিষ্কার জানে না শ্রীনাথ। শেষবার যখন দেখেছিল তখন বোধ হয় সদ্য কলেজে ঢুকেছে। তখনও ব্যক্তিত্ব তৈরি হয়নি। এক বছরে ছেলেটা মানুষ হয়েছে না অমানুষ তা এই অল্প সময়ে বোঝা গেল না। কিন্তু সে যা-ই হোক, শেষ পর্যন্ত সরিৎ তৃষারই লোক, শ্রীনাথের কেউ নয়।
শ্রীনাথের লোক পৃথিবীতে খুবই কম। নেই বললেই চলে।
গভর্নমেন্ট প্রেসে স্ট্রাইক চলছে বলে শ্রীনাথের প্রেসে এখন বিস্তর জব ওয়ার্ক এসে জমা হয়েছে। উঁই ভঁই হরেক রকমের ফর্ম, বিল, বিজ্ঞপ্তি ছাপার কাজ চলছে। মালিক বলে দিয়েছে, কামাই করা চলবে না। কাজ তুলে দিতে পারলে সবাইকে একটা থোক টাকা দেওয়া হবে। মিনি বোনাস।
বোনাসের ওপর শ্রীনাথের কোনও টান নেই। তবে সে হল জব ওয়ার্কের বিশেষজ্ঞ। বহুকাল প্রেসে কাজ করায় সে হেন কাজ নেই যে জানে না। মল্লিনাথের সম্পত্তি হাতে আসায় কিছুকাল আগে সে নতুন ফেসের কিছু টাইপ তৈরি করার জন্য ভূতের মতো খাটছিল। বাংলা টাইপরাইটার সংস্কারের কাজেও বিস্তর মাথা ঘামাচ্ছিল। কাজ এগিয়েছিল অনেকটাই। লেগে থাকলে কিছু একটা হয়ে যেত হয়তে। কিন্তু, দেদার সম্পত্তি আর নগদ টাকা হাতে আসায় কেমন যেন গা ঢিলে দিয়ে দিল। তবু এখনও বোধ হয় প্রেসের কাজকে সে এক রকম ভালই বাসে। প্রেসটার ওপরেও তার গভীর মায়া। তাই এই কাজের চাপের ব্যস্ততা তার খারাপ লাগে না।
স্নান করে খেয়ে বেরোতে একটু দেরি হল তার। তা হোক। মালিকপক্ষ জানে, দেরি করে গেলেও শ্রীনাথ দায়িত্ব নিয়ে কাজ করে। দরকার হলে সারা রাত খেটে কাজ তুলে দেবে। কাজের চাপে থাকলে শ্রীনাথ অন্য মানুষ। সেই কাজের জন্য সে বোনাস ইনক্রিমেন্ট বা প্রোমোশনও চাইবে না! ওসব কথা তার মনেই আসে না। শুধু মনটার মধ্যে একটা কথাই খচখচ করছে, সজলকে বিকেলে আসতে বলেছিল ঘরে। যদি দেরি হয় তবে সজল এসে ফিরে যাবে। কথার খেলাপ হবে তার। বাচ্চাদের কাছে কথার খেলাপ করা ঠিক নয়। এতে ওরা শ্রদ্ধা হারায়, হতাশায় ভোগে।
অফিসে পৌঁছে এক গ্লাস জল খেয়ে, একটা পান মুখে দিয়ে কাজে ড়ুবে গেল শ্রীনাথ। চাবির কথা মনে রইল না, ঘরের কথা মনে রইল না, তৃষা বা সজলের কথাও বেমালুম গায়েব হয়ে গেল মন থেকে।
কিন্তু মনে পড়ল বিকেলের দিকে। মনে করিয়ে দিল সোমনাথ।
বোসবাবু এসে খবর দিলেন, আপনার ভাই এসেছে।
সন্ধে হয়-হয়। শ্রীনাথের ঘাড় টনটন করছিল। কপি ধরে ধরে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে শোধরানো কম কথা নয়। ভুল থাকলে প্রেসের রাক্ষুসে মেসিন এক লহমায় সেই ভুল কপি কয়েক হাজার ছেপে ফেলবে। ভুল ধরা পড়লে ছাপা কাগজ সব ফেলে দিতে হবে। এখন কাগজ কালি লেবারের খরচার যে বহর তাতে ক্ষতির পরিমাণটা বড় কম দাঁড়াবে না। তাই মালিক নিজে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ কাজ দেখে গেছে। প্রিন্ট-অর্ডার দেওয়ার দায়িত্ব দিয়ে গেছে শ্রীনাথকে। তাতে শ্রীনাথের ঝামেলা বেড়েছে। মাথা তোলার সময় পায়নি।
