কী জেনে যাব? জানাজানির মধ্যে আমি নেই। বাবা তো তোমারও। তোমরা এক সময়ে বাবাকে রাখতেও চেয়েছিলে। তা হলে এখন আবার পিছোচ্ছ কেন?
শ্রীনাথ একটা গভীর শ্বাস ছেড়ে চুপ করে রইল। এটা যে পিছানো নয় তা সোমনাথও কি জানে? ও এখন একটা চাল খেলছে, সেটা যে কী তা অবশ্য শ্রীনাথ বুঝতে পারছে না।
সোমনাথ বলল, তা ছাড়া অত মতামতেরই বা দরকার কী বুঝি না, বাবা! বড়দা তো বাবারই ছেলে। তার বাড়িতে বাবা তো নিজের রাইট নিয়েই থাকতে পারে।
ছেলের সম্পত্তির ওপর বাবার অধিকার আছে, এমন কথা কোন আইনের বইতে আছে তা একবার জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করল শ্রীনাথের। কিন্তু তাতে কথা বাড়বে বলে বলল না।
শ্রীনাথ মৃদু স্বরে বলল, আমি তো অমত করছি না। তবে আমার মতামতের দামও নেই।
একশো বার দাম আছে।–সোমনাথ গলার জোরে কথাটাকে যত দূর সম্ভব গেঁথে দিতে চেষ্টা করল শ্রীনাথের মাথায়। তারপর মোলায়েম আদুরে গলায় বলল, তুমি মেজদা, দিনকে দিন কেমন হয়ে যাচ্ছ বলো তো! তোমার টাকাপয়সা বা বিষয়-সম্পত্তির লোভ নেই সেটা আমরা সবাই জানি, কিন্তু তা বলে সংসারের সব কর্তৃত্ব বউদির হাতে ছেড়ে দেবে?
শ্রীনাথ যে নির্লোভ সেটা যে সোমনাথ জানে তা শুনে খুশিই হয় শ্রীনাথ। বলে, আমি যেমন আছি তেমনিই থাকতে দে। গণ্ডগোলে জড়াস না।
সন্নিসি তো নও। সংসারে থাকলে গা বাঁচিয়ে চলবে কী করে? তা ছাড়া চোখের সামনে এত বড় সব অন্যায় ঘটে যাচ্ছে দেখেও যদি চুপ করে থাকো তবে তোমার ভালমানুষির কোনও দাম থাকে
ভালমানুষির দামই বা চাইছে কে! কথাটা বলতে পারত শ্রীনাথ, বলল না। শুধু আনমনে একবার হুঁ দিল।
সোমনাথ বলল, বউদি যে তোমাকে বাড়ির চাকর-বাকর মনে করে সেটা আমাদেরও খারাপ লাগে। তুমি যদি একটু রোখাচোখা হতে তবে এমনটা হতে পারত না।
শ্রীনাথের একটু রাগ হচ্ছিল। কিন্তু সোমনাথকে রাগ দেখিয়ে লাভ নেই। কোনওকালেই ও কারও পরোয়া করে না। শ্রীনাথ তাই চুপ করে থাকে।
সোমনাথ নিজেই বলে, তুমি চুপ করে থাকলেও আমি ছেড়ে দেব বলে ভেবো না। তোমাদের ওখানকার লোকেরা আমার সঙ্গে যোগাযোগ রাখে। তারা কেউ বউদির পক্ষে নয়। তারা নিজেরাই বলছে বড়দার সম্পত্তিতে বউদি কোনও রাইট নেই। দরকার হলে তারা ওখানকার মাতব্বরদের সালিশি মানবে। বউদির রাজত্ব অত নিষ্কণ্টক হবে ভেবো না।
এটা যে অপমান তা শ্রীনাথ বুঝতে পারছে। তৃষার সঙ্গে তার বনিবনা থাক বা না থাক এই কথাগুলো তৃষাকে জড়িয়ে তাকেও বলা। তবু জবাব দেওয়ার মতো জোর পায় না শ্রীনাথ। সে নিজেও বোঝে, দাদার সম্পত্তি নিয়ে একটা অন্যায় দখলদারি চলছে।
শ্রীনাথ বলল, এসব আমাকে বলছিস কেন? আমি তোদের কী করেছি? যা করবি করিস, আমার কিছু বলার নেই।
সোমনাথ একটু নরম হয়ে বলে, তোমাকে কষ্ট দিতে চাইও না। দুঃখ হয় বলে বলি।
ওখানকার কে কে তোর কাছে এসেছিল?
অনেকেই আসে। বহু গুপ্ত খবর দিয়ে যায়। বউদি নাকি তার গুন্ডা ক্লাসের সেই ভাইটিকে মালদা থেকে আনিয়েছে।
শ্রীনাথ অবাক হয়ে বলে, সরিৎ! সরিৎ গুন্ডা নাকি?
সোমনাথ একটু হেসে বলে, তুমি তো মানুষ চেনো না। নিতাই খ্যাপাকে মেরে তোমার শালা পাট পাট করে দিয়েছিল। বউদি ঘটনাটা চেপে দিয়েছে। এতকাল ভাড়াটে গুন্ডা ছিল, এখন নিজের ভাইকে দিয়েই গুন্ডামি চালাবে।
নিতাইকে সরিৎ মেরেছে, এ কথা কেউ তো আমাকে বলেনি।
তুমি কোন খবরটাই বা রাখো! বউদি যে বন্দুকের লাইসেন্স চেয়ে অ্যাপলিকেশন করেছে তা জানো?
না তো। বড়দার একটা জার্মান বন্দুক ছিল তা মনে আছে?
আছে। আমি নিজেও কয়েকবার শিকার করতে গিয়ে চালিয়েছি। তারপর সেটা থানায় জমা করে দিই।
বউদি সেইটেই ফেরত চেয়েছে। তবে লাইসেন্স হবে সরিহেব নামে।
শ্রীনাথের কাছে এগুলো খুব একটা দুশ্চিন্তার ব্যাপার নয়। সে বলল, ও, তা হবে।
ছেলেপুলের ঘর বলে মারাত্মক অস্ত্রটা শ্রীনাথ ঘরে রাখতে চায়নি। নইলে সে দরখাস্ত করলে বন্দুকটার দখল পেয়ে যেত। কিন্তু দখল করার ইচ্ছেই তার ছিল না। তাই থানায় জমা করে দিয়েছিল। তৃষা বন্দুকটা ফেরত চেয়েছে, ভাল কথা, কিন্তু সেটা একবার তাকে জানালেও পারত।
সোমনাথ বলল, সরিৎ হল বউদির রঙ্গরাজ।
শ্রীনাথ বুঝল না। বলল, কে রঙ্গরাজ?
দেবী চৌধুরানির বড় সাকরেদ, মনে নেই? আর বউদি নিজে হতে চাইছে দেবী চৌধুরানি।
শ্রীনাথের গম্ভীর থাকা উচিত ছিল। কিন্তু উপমাটা এমন অদ্ভুত যে, অনিচ্ছেসত্ত্বেও ক্ষীণ একটু হেসে ফেলল।
সোমনাথ আঁশটে মুখে বলে, হেসো না মেজদা। ব্যাপারটা খুবই সিরিয়াস।
শ্রীনাথ এবার গম্ভীর হয়ে বলল, তা আমি কী করব বল?
কিছুই যদি না করো তবে অন্তত দেখে যাও। চতুর্দিকে লক্ষ রেখে চলো।
চাবির কথাটা আবার মনে পড়ে গেল শ্রীনাথের। একটু অন্যমনস্ক হয়ে গেল সে। বলল, লক্ষ রেখেই বা লাভ কী? আমার কোনও ইন্টারেস্ট নেই।
সোমনাথ অধৈর্যের গলায় বলল, বাবার ব্যাপারটা কী হবে?
বললাম তো।
শোনা, মেজদা!–সোমনাথ খুব জোরালো গলায় বলে, বউদির মত থাক বা না থাক আমি সামনের রবিবার বাবাকে নিয়ে গিয়ে তোমাদের ওখানে পৌঁছে দিয়ে আসছি। তারপর আর আমার দায়িত্ব থাকবে না।
দারোয়ান চা দিয়ে গেল। শ্রীনাথ চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, তাতে হয়তো আপত্তি উঠবে না। কিন্তু আমি বাবার কথাটাই ভাবছি।
কী ভাবছ?
বাবার খুব কষ্ট হবে হয়তো।
বাবার কষ্টের কথা যদি সত্যিই ভাবো তবে কষ্ট দিয়ো না।
