শ্রীনাথ বলে, তা হলে কাটলে কেন?
এমনিই।
শ্রীনাথ হাসে, দূর পাগল! এমনি এমনি কিছু করে নাকি মানুষ? কারণ একটা থাকেই। একটু ভেবে দেখ তো!
আমার খুব রাগ হয়েছিল।
কার ওপর?
সকলের ওপর।
আমার ওপরেও?
সজল লজ্জা পায়। মাথা নেড়ে বলে, না, তোমার ওপর নয়।
তবে কি মায়ের ওপর?
হুঁ।
কেন?
সজল এবার আবার একটু ভাবে। ভেবে বলে, ঠিক মায়ের ওপরেও নয়।
তবে কার ওপর?
এই বাড়িটার ওপর। গাছপালার ওপর। হাঁস-মুরগির ওপর।
তোমার অত রাগ কেন?
এক-একদিন খুব রাগ হয়।
শ্রীনাথ আবার ক্ষীণ হাসে। বলে, রেগে যদি মোরগ মারতে পারো, তা হলে একদিন মানুষকেও খুন করে বসবে যে!
না, তা নয়। –সজল মাথা নিচু করে।
শ্রীনাথ এই বাক্যালাপে আগাগোড়া কৌতুক বোধ করছে। সে হেসেই বলল, স্কুলে যাচ্ছ না?
না। দু’দিন মা স্কুলে যাওয়া বন্ধ রেখেছে।
কবে তোমার ছুটি হবে?
বোধ হয় আজ। বৃন্দাদি সকালে এসে বলে গেছে পড়া করে রাখতে। আজ স্কুলে যেতে হবে।
রাত্রে তুমি এই ঘরে একা থাকো?
না, ছোটমামা শোয়।
ও।–শ্রীনাথ মৃদু স্বরে বলে, শোনো। তোমার সঙ্গে আমার আরও কয়েকটা কথা আছে। সন্ধের পর একবার আমার ঘরে এসো।
আচ্ছা।
তারপর শ্রীনাথ একটু ইতস্তত করে বলে, আমার সঙ্গে এই যে কথা হল এটা কাউকে বোলো না। আমি লুকিয়ে তোমার কাছে এসেছিলাম।
সজল এক গাল হেসে বলল, জানি।
শ্রীনাথও হাসল।
বলতে কী, মল্লিদাদার ওপর শ্রীনাথের কোনও রাগ নেই।
আগাছায় ভরা পড়ো জমি পেরিয়ে সামনের দিকে ফিরে আসতে আসতে শ্রীনাথ ভাবে, স্ত্রী বা মেয়েমানুষের ওপর অধিকারবোধটা ভুলে যেতে পারলে পৃথিবীটা কি আরও একটু সুন্দর হয়? কুকুব, বেড়াল, পাখি, পতঙ্গের তো বউ থাকে না। ওরকম হলেই কি ভাল? তা হলে সজল কার ছেলে, তার বউ কার সঙ্গে শুয়েছে, না শুয়েছে এসব বাজে চিন্তায় আর কষ্ট পেতে হয় না। ভেবে দেখলে, সজলের ওপরেও তার বিরাগ থাকা উচিত নয়। নিজের জন্মের জন্য সে তো দায়ী ছিল না!
গাছপালা, কীটপতঙ্গের কাছ থেকে শ্রীনাথ আজকাল অনেক শিখছে।
পালং ক্ষেতে সরিৎ দাঁড়িয়ে। তাকে দেখে বলল, জামাইবাবু, কোথায় ছিলেন? কখন থেকে খুঁজছি।
শ্বশুরবাড়ির কারও ওপর খুব খুশি নয় শ্রীনাথ। অবশ্য ওদের কোনও দোষও নেই। ভালমন্দে মিশিয়ে যেমন মানুষ হয়, ওরাও তেমনি সাধারণ। তবু তৃষার ওপর থেকে যেদিন তার মন সরে গেছে সেদিন ওদের ওপর থেকে গেছে।
শ্রীনাথ জোর করে মুখে হাসি এনে বলল, খুঁজছিলে?
হ্যাঁ। ভাবলাম, কোনও কাজ নেই যখন, জামাইবাবুর বাগানটা দেখে আসি। আমি খানিকটা বাগানের কাজ জানি।
খুব ভাল। এর পর থেকে এই বাগান তোমরাই দেখবে।
কেন, ওকথা বলছেন কেন? বাগান তো আপনারই।
কিছুই আমার নয়। জানো না?–মুখ ফসকে কথাটা বেরোল।
সরিৎ বোধ হয় মুখোমুখি কথাটা শুনে লজ্জা পেল। বলল, আমার বেশি জানার দরকার কী?
শ্রীনাথ অবশ্য সামলে গেল। বলল, আসলে কী জানো? এসব এখন ভাল লাগে না। এখন ভাল লাগে চুপচাপ সময় কাটিয়ে দিতে। কেউ একজন যদি বাগানটা দেখে তো ভালই।
সরিৎ মাথা নেড়ে বলে, আমি দেখব। আপনি কী করে কী করতে হয় বলে দেবেন।
বেশ তো!
সরিৎ বেশ লম্বা-চওড়া ছেলে। ওদের ধাতটাই ওরকম। সা জোয়ান সব। তবে খুব একটা বুদ্ধি বা রুচি নেই। একটু ভেতা, ব্যক্তিত্বহীন। এক সময়ে এই সরিৎ খুব প্রিয় ছিল শ্রীনাথের।
সরিৎ বলল, আগে আপনি আমাকে সব সময়ে ব্রাদার বলে ডাকতেন। এবার এসে একবারও ডাকটা শুনিনি।
শ্রীনাথ হাসল। বলল, কতকাল দেখা হয়নি। কী ডাকতাম তা মনেই ছিল না। এবার থেকে ডাকব।
আমাদের ভুলে গিয়েছিলেন তবে?–সরিৎ সকৌতুকে প্রশ্ন করে।
শ্রীনাথ বিপাকে পড়ে বলে, আরে না। ডাক ভুলতে পারি, মানুষকে কি ভোলা যায় সহজে!
শুধু মানুষ কেন, আমরা তো আত্মীয়। নয় কি?
সে তো বটেই।
তবে?
শ্রীনাথ কথার পিঠে কথা বলতে জানে না। তাই লজ্জা পেয়ে বলল, এসো, ঘরে এসো।
ঘরে ঢুকেই সরিৎ বলে, দারুণ তো! ঘর না বার তা বোঝা যায় না এত আলো বাতাস!
শ্রীনাথ তার ইজিচেয়ারে বসে বলল, তোমাদের বাড়ির সকলের খবর-টবর কী?
সরিৎ জবাবের জন্য তৈরিই ছিল। বলল, দিন পনেরো হল এসেছি, এই প্রথম এ কথাটা জিজ্ঞেস করলেন।
শ্রীনাথের বাস্তবিকই কারও কোনও খবর জানার কৌতূহল হয়নি। এইসব নীতি-নিয়ম ভদ্রতাবোধ তার মাথা থেকে উবে যাচ্ছে কেন?
সরিৎ ফের বলল, এ কয়দিন ভাল করে কথাই বলছিলেন না। আমি ভাবলাম, আমাদের ওপর বুঝি রাগ করে আছেন।
কথাটার জবাব হয় না। শুধু হাসি দিয়ে সেরে দিতে হয়। শ্রীনাথ যতদূর সম্ভব অপরাধী হাসি হেসে বলল, সংসারের নানা রকম ব্যাপার। আমি ঠিক এত বড় একটা এস্টাবলিশমেন্টের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে অভ্যস্ত নই কিনা। তাই বড় ভুলও হয় সব কাজে।
সরিৎ বিছানায় বসে বলল, কার খবর জানতে চান?
শ্রীনাথের মনে পড়ল প্রথমেই শাশুড়ির কথা। বিয়ের সময় শ্রীনাথ খুব খেতে পারত। শাশুড়িও তাকে তখন প্রাণভরে খাইয়েছেন। থালার চারদিকে বাটি সাজিয়ে গোটা দুই বৃত্ত রচনা করে ফেলতেন প্রায়। প্রথমেই সেই ভদ্রমহিলার কথা মনে পড়ে। শুনেছে, খুব সুখে নেই। শ্বশুর রিটায়ার করার পর ছেলের হাততোলা হয়ে আছেন।
শ্রীনাথ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, জিজ্ঞেস না করাই বোধ হয় ভাল। বরং মনে মনে সকলের মঙ্গল প্রার্থনা করাটাই এখন দরকার।
সরিৎ কথাটা বুঝল। একটু গম্ভীর হয়ে বলল, এটা খুব ঠিক কথা। জানতে গেলেই মন খারাপ হবে। কেউই তো ভাল নেই।
