শ্রীনাথ বলল, তোমাকে তোমার মা আটকে রেখেছে বুঝি?
সজল মৃদু একটু হাসল। চমৎকার দেখাল ওকে। সুপুরুষ ছেলেটি। গালে টোল পড়ল। ঘন জ্বর নীচে চোখ দুটো ঝিকিয়ে উঠল বুদ্ধির দীপ্তিতে। চাপা স্বরে বলল, হ্যাঁ। কিন্তু আমার খারাপ লাগছে না।
আটক থাকলে তো খারাপ লাগারই কথা। তোমার তবে লাগছে না কেন?
খারাপ লাগলে তো আমি মার কাছে হেরে যাব। তো চায় আমার খারাপ লাগুক।
এ কথায় একটু অবাক হয় শ্রীনাথ। সজল যে অনেক গভীর করে ভাবতে পারে তা টের পায়নি কখনও। এ প্রসঙ্গে আর না গিয়ে সে জিজ্ঞেস করে, সারাদিন তুমি কী করো?
বই পড়ি। আর পাটাতনের ওপর অনেক পুরনো জিনিস আছে। এত জিনিস যে অবাক হতে হয়।
পাটাতনে ওঠা না তোমার বারণ? ওঠবার মইটা তেমন ভাল নয়। নড়বড় করে। পড়ে গেলে?
সজল ভয় খেয়ে বলে, সব সময় নয়। যখন একঘেয়ে লাগে, ঘুমটুম পায়, তখন উঠি। সাবধানে।
উঠে কী করো?
জিনিস দেখি। ওপরে অনেক জিনিস বাবা! আমি রোজ ওখানে গুপ্তধন খুঁজি।
এত সহজভাবে সজল কখনও শ্রীনাথের সঙ্গে কথা বলে না। এখন কেন বলছে তাও বোঝে শ্রীনাথ। সজল জানে তার বাবা আর মা দুই প্রতিপক্ষ। সব সময়েই সজল তার মায়ের পক্ষে। কিন্তু সেই মোরগ চুরির ঘটনার পর মায়ের ওপর গভীর ও তীব্র বিরাগ থেকে সজল সাময়িকভাবে তার বাবার পক্ষ নিয়েছে। এবং এও হয়তো কারণ যে, শ্রীনাথকে এভাবে চুপি চুপি পিছনের জানালায় হাজির হতে দেখে সে বাবার গুরুত্বটা খানিক হারিয়ে ফেলেছে।
শ্রীনাথ বলল, আমি কখনও ওই পাটাতনে উঠিনি। কী আছে বলো তো!
অনেক ট্রাংক বাক্স। পুরনো সব মেটে হাঁড়ির মুখে মালসা দিয়ে ঢেকে ন্যাকড়া জড়িয়ে রাখা। পুরনো বই আর খবরের কাগজের ভাই।
আর কী?
একটা টর্চ থাকলে বুঝতে পারতাম। পাটাতনটা দিনের বেলাতেও এত ঘুটঘুটি অন্ধকার যে কিছুই ভাল করে বোঝা যায় না।
আর উঠো না। মা টের পেলে আবার শাস্তি দেবে।
দিলেই কী? আমাকে যে গুপ্তধন খুঁজতে হবে।
ভ্রুকুটি করে শ্রীনাথ বলে, শাস্তিকে তুমি ভয় করো না?
সজল বাবার দিকে চেয়ে ফাঁকাসে হয়ে গিয়ে বসা স্বরে বলে, করি।
করবে। শাস্তিকে ভয় যে না করে তার সর্বনাশ।
সজল চুপ করে চেয়ে থাকে।
বাবা-ছেলের মধ্যে একটু আগের সহজ সম্পর্কটা হঠাৎ কেটে যায়।
শ্রীনাথ গলা খাকারি দিয়ে বলে, ইয়ে, তোমাকে একটা প্রশ্ন করার ছিল। জবাব দিতে ভয় খেয়ে। সত্যি কথা বললেও আমি রাগ করব না।
কী?
আমার ঘরের তালাটা তুমি কীভাবে খোলো? চাবি দিয়ে, না অন্য কোনও যন্ত্রপাতি আছে?
সজল একটু অবাক হয়ে বলে, কেন? চাবি দিয়েই খুলি। অবশ্য খোলাটা অন্যায় হয়েছে। আর কখনও–
বাধা দিয়ে শ্রীনাথ বলে, অন্যায় তুমি স্বীকারও করেছ। সেটা নিয়ে আমার কোনও প্রশ্ন নেই। কথা হল, চাবি দিয়েই বা খোলো কী করে? চাবি তো আমার কাছে থাকে।
সজল একটু আমতা-আমতা করে বলে, মায়ের কাছে যে চাবিটা আছে, সেইটে চুরি করি।
মায়ের কাছে! শ্রীনাথ ভীষণ অবাক হয়। ঘরের তালাটা সে মাস দুই আগে চাদনি বাজার থেকে বাইশ টাকায় কিনেছে। নামকরা তালা। দুটো চাবিই তার কাছে। তৃষার কাছে আর একটা চাবি যায় কী করে? এলেবেলে তালা নয় যে, যে-কোনও চাবিতে খুলে যাবে। শ্রীনাথ কঠিন স্বরে বলে, তোমার মায়ের কাছে তো চাবি থাকার কথা নয়।
সজল বাপের দিকে চেয়ে আবার ফ্যাকাসে হয়। শুকনো ঠোঁট জিভ দিয়ে ভিজিয়ে নিয়ে বলে, গুরুপদ চাবিওলা মাকে চাবিটা বানিয়ে দিয়েছে।
শ্রীনাথ অবাক ভাব চেপে রেখে বলে, ও তালার চাবি কি বানানো যায়? চাবি বানাবে কীভাবে? সজল মাথা নেড়ে বলে, জানি না তো! গুরুপদদা একদিন চাবিটা দুপুর বেলায় মাকে দিয়ে যায়। সেই চাবি দিয়ে মা একদিন তোমার ঘর খুলে বৃন্দাদিকে দিয়ে ঘর পরিষ্কার করিয়েছিল।
ও।–বলে স্তম্ভিত হয়ে চেয়ে থাকে শ্রীনাথ।
সজলের ভয় কাটেনি, বরং বাড়ল। সে তাড়াতাড়ি বলল, দোষটা আমারই।
তুমি মোরগটাকে মেরেছিলে?
হ্যাঁ।
মরার সময় মোরগটা কেমন করেছিল?
খুব ডানা ঝাপটাচ্ছিল। ভীষণ ডাকছিল। আমাকে ঠোকরানোর চেষ্টা করছিল। অথচ যখন চুরি করে ঠ্যাং ধরে নিয়ে যাচ্ছিলাম, তখন কিছু করেনি। ঠিক যখন কাটব তখন ওই রকম করতে লাগল। কী করে যেন টের পেল, আমি ওকে কাটব।
মোরগের তো অত বুদ্ধি নেই, তবে টের পেল কী করে?
সজল কিছুক্ষণ ভেবে বলে, ক্ষুরটা দেখে বোধ হয়।
ওরা তো ক্ষুর চেনে না।
অসহায় ভাব করে সজল বলে, তা হলে কী?
শ্রীনাথ একটু হেসে বলল, ওরা অস্ত্র চেনে না ঠিকই। তবে বোধ হয় ওরা কখনও-সখনও মানুষের চোখ মুখ আর হাবভাব দেখে কিছু টের পায়। আর কিছু না হোক, নিষ্ঠুরতাটা বুঝতে পারে, মৃত্যুর গন্ধও পায় নিশ্চয়ই।
সজল একটু অন্যমনস্ক হয়ে বোধ হয় দৃশাটা কল্পনা করে। তারপর মাথা নেড়ে বলে, আমি অতটা বুঝতে পারিনি।
শ্রীনাথ সান্ত্বনার গলায় বলে, তোমার এখনও বোঝার বয়সও হয়নি। বয়স হলেও অনেকে ব্যাপারটা বোঝে না।
কাজটা খুব অন্যায় হয়েছিল, না?
শ্রীনাথ একটা শ্বাস ফেলে বলে, আমরা সবাই যখন মাছ মাংস খাচ্ছি তখন কাজটাকে একা তোমার অন্যায় বলি কী করে? মোরগ তো সবাই মারছে। সজল একটু হেসে বলে, তা হলে অন্যায় নয় তো?
তা ঠিক বলতে পারি না। হয়তো অন্যায়ই হবে। কিন্তু তুমি ওটা করতে গেলেই বা কেন? মাংস খেতে ইচ্ছে হয়ে থাকলে মংলুকে বললেই তো পারতে। ও কেটে দিত।
মাংস খেতে ইচ্ছে হয়নি তো! মা রোজ টেংরির জুস খাওয়ায়। রোজ খেতে ভাল লাগে, বলল? খেতে খেতে এখন মাংসের গন্ধে আমার বমি আসে।
