শ্রীনাথের প্রশ্ন শুনে স্বপ্ন ড্যাব ড্যাব করে চেয়ে থেকে বলল, বোধ হয় চাবি আছে।
চাবি তো আমার কাছে।
তা হলে ঠিক জানি না।
সজলকে দেখতে পেলে পাঠিয়ে দিস তে।
ও আসবে না।
কেন?
সেদিন সেই মোরগ চুরির পর থেকে মা ওকে দক্ষিণের ঘরে সারাদিন শেকল দিয়ে আটকে রাখে।
ও।–বলে একটু গম্ভীর হয়ে যায় শ্রীনাথ। ভিতরবাড়িতে কী হয় না হয় তার সব খবর তার কানে এসে পৌঁছয় না। শ্রীনাথ চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, আচ্ছা যা।
স্বপ্ন চলে যাচ্ছিল। শ্রীনাথ ডাকল, শোন।
বলো।
চাবির কথাটা তোর মায়ের কানে তুলিস না।
স্বপ্ন একটু হেসে বলল, কে ওসব কথা তুলবে বাবা! মা যে রেগে আছে দু’দিন ধরে! ভাইকে শুধু গলা টিপে মেরে ফেলতে বাকি রেখেছে। ছোটমামা না আটকালে কী যে হত!
বিরক্ত হয়ে শ্রীনাথ বলল, দোষ যখন স্বীকারই করেছে তখন অত মারধরের কী দরকার ছিল!
মা জানতে চাইছিল মোরগটাকে ও মারল কেন! সেই কথাটার জবাব দেয়নি যে। শুধু বলেছে, আমি চুরি করেছি. আমিই কেটেছি। কিন্তু কেন তা বলতে পারছে না।
কেন আবার! রক্তের দোষ! মায়াদয়াহীন বলেই তরতাজা মোরগটাকে মেরে মজা দেখেছে। আমি তো দেখেছি ও প্রায়ই ডিম চুরি করে এনে ঢিল ছোড়ে তাই দিয়ে।
স্বপ্না চলে গেল। চাবির রহস্যটা বসে বসে ভাবতে লাগল শ্রীনাথ। ভেবে কোনও হদিশ করতে পেরে বাগানে নেমে গেল।
গাছপালার মধ্যে শ্রীনাথের আনন্দ অগাধ। আচার্য জগদীশ বোস গাছপালার মধ্যে প্রাণ আবিষ্কার করেছিলেন। সারা দুনিয়ার বোকা লোকেরা এক বাঙালির কাছে শিখেছিল এই মহান সত্য, তবু নোবেল প্রাইজ দেয়নি। শ্রীনাথের হাতে ক্ষমতা থাকলে জগদীশবাবুকে চারবার নোবেল প্রাইজ দিত। গাছপালার প্রাণ যে কত বড় আবিষ্কার তা কেন যে তেমন স্বীকার করল না সাহেবরা! জগদীশ বোস নেটিভ বলেই কি? হবে। সাহেবরা বড় নাকউঁচু জাত।
প্রতিদিন শ্রীনাথ নিজেও গাছপালার প্রাণ আবিষ্কার করে। এখানে এক অদ্ভুত নীরব অনুভূতির সাম্রাজ্য। বাক্য নেই, শ্রবণ নেই, যৌনতা নেই, তবু জন্ম আছে, বেঁচে থাকা ও বেড়ে ওঠার আপ্রাণ প্রয়াস আছে। ক্রিসেনথিমাম, কসমস, পপি বা গোলাপ বলে কথা নেই, নগণ্য আগাছাও শ্রীনাথের প্রিয়। ফুলের বাগান থেকে বহুবার ওপোনো আগাছা সে ঘের-দেয়ালের ধারে ধারে পুঁতে দিয়ে। এসেছে। আজও বীজ থেকে গাছের জন্ম দেখে অবাক হয় শ্রীনাথ। বসে বসে ভাবে। চোখে। সবুজের ঘোর লেগে যায় তার। মাটির ভিতব পোঁতা শুকনো বীজ থেকে গুপ্ত সৈনিকের মতো সারি সারি ওরা কী করে যে বেরিয়ে আসে! কী অদ্ভুত! কী আশ্চর্য! একই মাটি থেকে বীজের রকমফেরে কী করে জন্মায় এত রকমের গাছ!
শ্রীনাথের হাতের গুণে সামনের বাগানটা হয়েছে দেখবার মতো। অবশ্য কারও চোখে পড়ে না তেমন। লোক লাগিয়ে শুকনো ডালপালা দিয়ে দেড় মানুষ সমান উঁচু দুর্ভেদ্য একটা বেড়া দিয়ে রেখেছে শ্রীনাথ, যাতে তেমন চোখে না পড়ে। খ্যাপা নিতাইয়ের কুকুরটা আর কোনও কাজের না হোক, গাছের পাতা খসলেও চেঁচায়। শুধু চেঁচাতে জানে। তবু সেই ভয়েই ফুলচোররা বড় একটা হানা দেয় না। এ হল শ্রীনাথের নিজস্ব বাগান। নার্সারি থেকে বিচিত্র ফুলের বা ফলের বীজ আর চারা নিয়ে আসে সে। সার দেয়, জল দেয়, আর দেয় অগাধ মায়া মেশানো ভালবাসা। গাছ তেজে বেড়ে ওঠে। বার বার অবাক করে, আনন্দে ভরে দেয় শ্রীনাথকে। যতক্ষণ সে বাগানে থাকে ততক্ষণ সে অন্য মানুষ। কাম নেই, ক্রোধ নেই, লোভ নেই, অভিমান নেই, এমনকী অহংবোধটুকু পর্যন্ত থাকে না। ওয়ার্ডসওয়ার্থ বা বিভূতিভূষণের মতো সেও তখন অর্ধেক নিজেকে প্রকৃতির মধ্যে বিসর্জন দেয়। সম্মোহিত হয়ে থাকে নীরব প্রাণের খেলা দেখে।
একটা নাইট কুইনের গোড়া উসকে দিচ্ছিল শ্রীনাথ। হঠাৎ নজরে পড়া বাগানের পিছন দিয়ে তাগাছায় ঢাকা পড়ো এক ফালি জমির দিকে। কেউ চলাচল করে না, দুর্ভেদ্য জঙ্গলে ঢেকে আছে। কিন্তু ওই পড়ো জমি দিয়ে যেতে পারলে সকলের অলক্ষে দক্ষিণের ঘরের পিছন দিকটায় হাজির হওয়া যায়।
একটু ভাবল শ্রীনাথ। যাওয়াটা ঠিক হবে কি?
তারপর ভেবে দেখল, তার সংকোচের কোনও কারণ তো নেই। সে তো এখনও এ বাড়ির কর্তা।
খুরপি রেখে শ্রীনাথ উঠল। জঙ্গলে কাঁটাগাছ থাকতে পারে বলে ঘরে গিয়ে বাগানের কাজের হাওয়াই চটি ছেড়ে একজোড়া পুরনো রবারের বর্ষার জুতো পরে নিল। সা বা অন্য কিছুর ভয় তার নেই। জন্মসুত্রেই বোধ হয় সে কোনও জায়গায় সাপ আছে বা নেই তা টের পায়। গত গ্রীষ্মেও একদিন ভোররাতে অন্ধকারে বারান্দার সিঁড়িতে পা বাড়িয়েও সে পা ফেলেনি। মন থেকে কে যেন সাবধান করে দিয়েছে। পা আটকে গেছে। পরে টর্চ জ্বেলে দেখেছে, কেউটে। এখন শীতকাল বলে আরও ভয় নেই।
পড়ো জমিটা মোটামুটি নির্বিঘ্নেই পেরিয়ে গেল শ্রীনাথ। দক্ষিণের ঘরের পিছনে নিষ্পত্র ঝোপঝাড়। একটু খড়মড় শব্দ হয়ে থাকবে।
ঘরের ভিতর থেকে ভয়ে ভয়ে সজল বলল, কে রে?
শ্রীনাথ জানালায় পৌঁছে দেখল, পড়ার টেবিলে বসে সজল সোজা জানালার দিকেই চেয়ে আছে। ঠোঁট দুটো একটু ফাঁক হয়ে আছে। চোখে অবাক চাউনি।
বাবা!
শ্রীনাথ মৃদু ম্লান একটু হাসল। বলল, ভয় পাওনি তো!
না। তুমি ওখানে কী করছ?
তোমার সঙ্গে একটু কথা ছিল।
সজল আরও অবাক। বাবার কথা থাকলে এমন চোরের মতো পিছনের জানালা দিয়ে কেন? কিন্তু সেটা বলল না সজল। চেয়ে রইল।
