সাংঘাতিক তো। সেজদির এই সাহসে সরিৎ ভারী বিস্মিত হয়।
সেই তো কথা। কাণ্ডটা মল্লিবাবু তার ঘর থেকে আগাগোড়া দেখেছিলেন।
সে কী? দেখেও বেরোননি?
বেরোননি কেন তার কারণ আছে। পরে বলেছিলেন, আমি তৃষার সাহস আর বীরত্বটা দেখছিলাম। স্বীকার করতে হয়, হ্যাঁ, মেয়েমানুষ বটে। এরকম একজন ঘরে থাকলে পুরুষমানুষের আর চিন্তা-ভাবনা থাকে না।
সেজদিকে খুব শ্রদ্ধা করতেন বুঝি মল্লিবাবু?
খুব। শুনিয়ে শুনিয়েই বলতেন, শ্রীনাথের বউ যেন গোবরে পদ্মফুল। দেখেছ তো মল্লিবাবুকে?
অনেকবার। দারুণ চেহারা ছিল। মিলিটারির মতো।
তবে বলো ঠাকরোনের পাশে মানাত কাকে? ছোট মুখে বড় কথা হয়ে যাবে। তবু বলি শ্রীনাথ কর্তাকে একেবারে গোবরগণেশ লাগে ঠাকরোনের পাশে। মল্লিবাবুর ঊচেগোটে জম্পেশ চেহারাখানা ছিল। কার্তিকঠাকুরটি নন, রীতিমত খাঁটিয়ে-পিটিয়ে শরীর।
সে কথা ঠিক।
তবেই বোঝে মল্লিবাবু কেন ঠাকরোনের নামে সম্পত্তি দিয়ে গেলেন। জানতেন, এঁর কাছ থেকে লোকে ভয় দেখিয়ে নিতে পারবে না।
লোকে কি চেষ্টা করেছে?
করে আবার নি! বিস্তর করেছে। তবে ঠাকরোনের সঙ্গে এটে ওঠেনি কেউ। গুঁতেকে যেমন হাজতবাস করিয়ে দেশছাড়া করেছিলেন তেমনি আরও অনেক কীর্তি আছে। থাকো, শুনবে।
দু’-চারটে বলল না শুনি।
সে অনেক আছে। লোকে সাধে কি ঠাকরোনকে মেয়েছেলে বলে ভাবে না।
কেউ ভাবে না?
নিতাই আবার মুখটা দেখার চেষ্টা করল। ছেলেটা ল্যাজে খেলাচ্ছে না তো? ভাল মানুষের মতো বলল, ঠাকরোনের সমান সমান পাল্লা টানার মতো মরদ কে আছে বলো! একমাত্র ছিলেন মল্লিবাবু। তার সামনে ঠাকরোন মাথা উঁচু করে কথা বলতেন না।
বটে! বটে!–সরিৎ নড়েচড়ে বসে।
মরদ এ তল্লাটে ওই একজনই ছিল। আর দিনে কালে আর একজনও হয়তো হয়ে উঠবে।
কে? কার কথা বলছ?
সজল খোকাবাবু।
সরিৎ একটু ধাঁধায় পড়ে যায়। সজলকে নিয়ে সে কখনও কিছু ভাবেনি। এখন হঠাৎ ভাবনাটা শুরু হল। ঝিম হয়ে খানিক এলেবেলে চিন্তা ও টলোমলো মাথায় সে সজলের মুখটা ভাববার চেষ্টা করল। তারপরই তার মনে হল, সজলের চেহারাটা বয়সের তুলনায় বেশ লম্বা। হাড়গুলো মজবুত এবং কাঠামোেটাও শক্ত, ভারী জেদি ছেলে। মায়ের শাসনে মিনমিনে হয়ে থাকে বটে, কিন্তু ওর ধাত তা নয়। পরশু কি তার আগের দিনই হবে, সজল মুরগির ঘর থেকে একটা মস্ত মোরগ চুরি করে নিয়ে যায় এবং তার বাবার দাড়ি কামানোর জার্মান ক্ষুর দিয়ে সেটাকে জবাই করে। সেই অবস্থাতেই ফেলে রেখেছিল পুকুরের ধারে। হুলো বেড়ালটা মুখে করে সেটাকে নিয়ে গোলাঘরের পিছনে ঘেঁড়াঘেঁড়ি করছিল। স্বপ্ন দেখতে পেয়ে চেঁচামেচি করায় ঘটনাটা ধরা পড়ে। প্রথমে সজলকে কেউ সন্দেহ করেনি। কিন্তু সেজদি সহজে ছেড়ে দেয়নি, সবাইকে প্রশ্ন করে অবশেষে ঠিক আসামিকে ধরতে পারে। সজল কবুল করেছে সে মাংস খাওয়ার জন্য মোরগটা চুরি করেনি। তবে? তার কোনও জবাব নেই।
খ্যাপা নিতাই বলল, ঠিক মল্লিবাবুর মতো।
কে?
সজল খোকাবাবু।
কথাটার মানে কী নিতাই?
সরিতের গলার স্বরটা হঠাৎ কঠিন হয়ে ওঠায় নিতাই সাবধান হয়ে বলে, কোনও মানে-টানে নেই বাপু। মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছে।
নেশাটা যত জোর ধরেছে বলে ভেবেছিল সরিৎ ততটা নয়। হঠাৎ এই সং-সাজা ভাড়টার ওপর তার রাগ হল প্রচণ্ড। টাপে টোপে বলছিল সে এক রকম কিন্তু এ তো পষ্টাপষ্টি সেজদির কলঙ্ক রটানো।
সরিৎ মালদায় বিস্তর মারপিট করেছে। অনেকগুলো কাজিয়া ছিল না-হক খামোখা। অনেক সময় নির্দোষ লোককেও মেরেছে। আজ একটা মতলববাজ হারামজাদাকে মারলে কেমন হয়?
ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ উঠে একটা লাথি চালায় সরিৎ, এই শালা! যত বড় মুখ ন তত বড় কথা।
নিতাই পোঁটলার মতো গড়িয়ে পড়েছে বারান্দা থেকে। পড়েই চেঁচাল, মেরে ফেললে! মেরে ফেললে!
সরিৎ লাফিয়ে নামে। মাথায় আগুন ধরে গেছে। পর পর কয়েকখানা লাথি ঝাড়ল কঁকালে। বলল, শব্দ করলে মেরে চরে পুঁতে ফেলব।
কে শোনে কার কথা। মাটিতে পড়ে খ্যাপা নিতাই গড়ায় আর জটাজুটে ধুলো মাখে আর প্রাণপণে চেঁচাতে থাকে, নির্বংশ হবি। অন্ধ হয়ে যাবি। কুষ্ঠ হবে।
১৩. বদ্রীর ইনফ্লুয়েনজা হয়েছিল
বদ্রীর ইনফ্লুয়েনজা হয়েছিল, খবর পেয়েছিল শ্রীনাথ। তারপর থেকে সে আর আসছে না। নদীর ওধারে মাইল দশেক ভিতরে শ্যামগঞ্জ বলে একটা জায়গা আছে। যেখানে এক লপ্তে প্রায় বিঘে দশেক জমি আছে। তাতে বর্গা নেই। খবরটা ভালই ছিল। কিন্তু বদ্রী একদম নাপাত্তা। সে থাকেও বহু দূরে। লাইনের ওধারে অনেকটা যেতে হয় কাঁচা রাস্তায়। জায়গাটা খুব ভাল চেনেও না শ্রীনাথ।
দাদার এই বাড়ি থেকে তার যে বাস উঠে গেছে সেটা সে টের পেয়েছে বহুকাল। ভাবন-ঘরের চাবি তার সঙ্গে থাকে। মজবুত তালা ঝোলে দরজায়। ড়ুপলিকেট চাবিটা সে বিছানার তলায় লুকিয়ে রেখেছে। সেটা যেমন কে তেমনই আছে। খোয়া যায়নি। তবু সজল কী করে ঘরে ঢোকে এবং তার জিনিসপত্র ঘাঁটে তা প্রথম-প্রথম ততটা খেয়াল করে ভাবেনি সে। কদিন আগে আবার তার ক্ষবে হাত পড়ায় হঠাৎ খেয়াল হল।
স্বপ্না এসেছিল সকালে, চা দিতে। তাকে জিজ্ঞেস করল, হ্যাঁ রে, আমার ঘরের তালাটা সজল খোলে কী করে জানিস?
স্বপ্না বা স্বল্পলেখা রোগা মেয়ে। খুব শান্ত, খুব নীরব এবং দুঃখী চেহারা। মুখখানা ভীষণ ধারালো বটে, কিন্তু স্বভাবের সঙ্গে তার মুখশ্রীর কোনও মিল নেই। নিজের এই মেয়েটিকে শ্রীনাথ কখনও ঠিক বুঝতে পারে না।
