ঝিমুনি কাটিয়ে চোখ চাইতেই বুঝতে পারে, নিতাই তাকে কী যেন জিজ্ঞেস করছে।
কী বলছ?
বলি, দিদি তোমাকে মালদা থেকে এখানে আনাল কেন?
কী জানি। লিখেছিল এখানে কাজ করতে হবে।
কী কাজ?
তা কে জানে! জমিজিরেত সম্পত্তির ব্যাপারটা আমি ঠিক বুঝি না।
নিতাই একটা শ্বাস ফেলে বলে, শ্রীনাথবাবুও বোঝেন না। বোঝেন বটে তোমার দিদি। জঁহাবাজ মেয়েমানুষ। মল্লিবাবু ঠিক লোক চিনত, তাই শ্রীনাথবাবুর নামে সম্পত্তি লিখে দিয়ে যায়নি। গেলে এতদিন পুরোটা ফুঁকো হয়ে যেত।
কেন বলো তো?
সে আর বলে কাজ নেই। শ্রীনাথ কর্তা মল্লিবাবুর দোষগুলো পুরোমাত্রায় পেয়েছেন, গুণগুলো পাননি। এবার বুঝে নাও। আমি এই ছোট মুখে বড় কথা বলতে চাই না বাবা। তবে ঠাকরোনের সঙ্গে ওঁকে মানায় না।
সরিৎ হেসে বলে, তা আমার দিদিও তো মেয়েমানুষ, তারও এগারো হাতে কাছা হয় না।
আ ছি ছি, তোমার দিদির কথা এখানে হবে কেন? ওসব কথা এলেবেলে মেয়েছেলে সম্পর্কে খাটে। ঠাকরোন কি তেমনধারা মেয়েমানুষ?
তবে কেমনধারা?
নিতাই একটু ফাঁপরে পড়ে গিয়ে বলে, তোমার দিদিকে আসলে কেউ আমরা মেয়েছেলে বলে ভাবিই না। সবাই যমের মতো ভয় খাই।
সরিৎ মৃদু-মৃদু হাসে। সেজদিকে কুমারী অবস্থাতেও লোকে একটু সমঝে চলত। লম্বা সুগঠিত চেহারার সেজদির দিকে নজর দিত অনেকেই, কিন্তু ভিড়তে ভয় পেত। একবার সেজদির সঙ্গে রাস্তায় যেতে পিছনে একদঙ্গল ছেলের মন্তব্য কানে এসেছিল সরিতে, এ যা ফিগার মাইরি, সাতটা মিলিটারিও ঠান্ডা করতে পারবে না।
কথাটা শ্লীল নয়, শুনে সরিৎ লজ্জাও পেয়েছিল বটে। কিন্তু কথাটা মিথ্যেও নয়। বলতে কি সেজ জামাইবাবুর আদুরে মোলায়েম চেহারার পাশে সেজদিকে মানায় না। ভাই হিসেবে তার কথাটা ভাবা উচিত নয়, তবু তার মাঝে মাঝে ইদানীং সন্দেহ হচ্ছে, নরম-সরম জামাইবাবু তার পাঞ্জাবি মেয়ের মতো ফিগারওলা সেদিকে ঠান্ডা করতে পারে কি না। কথাটা এই নেশার ঘোরে মনে হওয়ায় হাসিটা চাপতে পারল না সরিৎ। ফিক ফিক করে হাসতে লাগল। বিয়ের আসরে সেজদি আর জামাইবাবুকে দেখে মুখ-পাতলা বড় জামাইবাবু বলেই ফেলেছিল, এ যে প্রশান্ত মহাসাগরে একটা কাঁচকলা। কথাটা মনে হওয়ায় সরিৎ আবার হাসে। হাসতেই থাকে।
খ্যাপা নিতাই চোখ খুলে গম্ভীর গলায় বলল, হাসছ যে!
একটা কথা ভেবে।
কী কথা?
সে আছে!
নেশাটা খুব ধরেছে তোমায়। বাড়িতে গিয়ে খানিকটা দুধ খেয়ে নিয়ো। নইলে এ নেশায় শরীর শুকিয়ে যায়।
আর কী হয়?
ব্রেন খুব কাজ করে। লোকে গাঁজাখোরকে গাঁজাখোর বলে বটে, কিন্তু মগজকে এমন তরতরে করার মতো জিনিস আর নেই। গাঁজা হচ্ছে কুলোর মতো, ঝেড়ে ঝেড়ে আজেবাজে চিন্তা মগজ থেকে ফেলে দেয়। কাজের জিনিসগুলো রাখে।
কুলোর উপমায় সরিৎ আবার ফিক করে হাসে। বুঝতে পারে, হাসিটা কিছুতেই সে সামলাতে পারছে না। খুব ডগমগ লাগে ভিতরটা। সেজদিকে এখানকার এরা সবাই ভয় খায় জেনেও তার হাসি আসতে থাকে। সে বলে, সেজদিকে তোমরা যে মেয়েমানুষ বলে মনে করো না সেই কথাটা আমি আজই সেদিকে বলে দেব।
নিতাই আবার ফঁপরে পড়ে গিয়ে বলে, তাই কি বললাম নাকি?
তাই তো বললে!
দূর বাপু, তুমি সব কথারই সোজা মানেটা ধরো। এ কথার মধ্যে একটা প্যাঁচ আছে, সেটা তো বুঝবে।
প্যাঁচটা আবার কী?
নিতাই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, তখন মল্লিবাবু বেঁচে। গুঁতে নামে একটা বিখ্যাত চোর ছিল এ তল্লাটে। গুণী লোক। তার হাত খুব সাফ ছিল। তো সে একবার এ রকম মাঘের রাত্তিরে। তোমাদের দক্ষিণের ঘরে হানা দিয়েছিল। সে ঘরে ঠাকরোন আর তার মেয়েরা শোয়। শ্রীনাথবাবু তখন কলকাতায়। সজলখোকা তখনও হয়নি।
গল্পটা বলতে বলতে নিতাই একবার আঁধারভেদী বেড়ালচক্ষুতে সরিতের মুখখানা দেখে নেয়। শালা শুনছে তো ঠিক? প্যাঁচটা ধরতে পারছে তো?
সরিৎ শুনছে। মন দিয়েই শুনছে। এসব কথাই তো সে শুনতে চায়।
সরিৎ বলল, হুঁ।
নিতাই থুঃ করে কৃত্রিম থুথু ফেলে বলে, তা ঘরে ঢুকতে অবশ্য গুঁতেকে কষ্ট করতে হয়নি। ঠাকরোন বুঝি বাইরে গিয়েছিলেন দরজাটায় শেকল দিয়ে। গুঁতে তক্কেতক্কে ছিল, সেই ফাঁকে গিয়ে ঢুকে মেয়েদের গলার হার, হাতের বালা হাতাচ্ছে।
তুমি তখন কোথায় ছিলে?
আমি তখনও সাধু হইনি। গোলাঘরের পাশে মল্লিবাবু একটা কাঁচা ঘর করে দিয়েছিলেন, সেইখানে মড়ার মতো পড়ে ঘুমোতাম।
তো কী হল?
গুঁতে যখন বেরোতে যাচ্ছে সেই সময় ঠাকরোন উঠোন পেরিয়ে ফিরে আসছিলেন।
উঠোন পেরিয়ে কেন? কলঘর কি তখন উঠোনের অন্যধারে ছিল?
নিতাই একটা নিশ্চিন্তির শ্বাস ছাড়ল। যাক বাবা, ছেলেটা একেবারে গাড়ল নয়। ঠিক ঠিক শুনছে, জায়গামতো প্যাঁচটা ধরতেও পারছে।
নিতাই একটু আমতা আমতা করে বলল, ঠিক তা নয়। ঠাকরোন হয়তো বাড়িটা চক্কর মারতে বেরিয়েছিলেন। খুব ডাকাবুকো মানুষ তো। ভূত-প্রেত চোর-ডাকাত কাউকে ভয় নেই।
উঠোনের এধারে কে থাকত?
নিতাই অবাক হওয়ার ভান করে বলল, কে আবার থাকবে? তখন তো এত ঘর ওঠেনি। উত্তরধারে মল্লিবাবুর সেই ঘর এখনও আছে, উনিই থাকতেন।
সরিৎ মৃদু হাসে। গোলমালটা সে আগেই আন্দাজ করেছিল, এখন ঠিক ঠিক মিলে যাচ্ছে। গাড়ল নেতাইটা বুঝতে পারছে না যে, গুহ্যকথা ফাঁস হয়ে যাচ্ছে।
সরিৎ বলল, তারপর?
ঠাকরোনের হাতে পাঁচ ব্যাটারির টর্চ ছিল। চোখধাঁধানো আলো হত সেটাতে। গুঁতে যেইমাত্র চৌকাঠ ডিঙিয়েছে অমনি ঠাকরোন টর্চটা মারলেন। এঁতে এক লাফে উঠোনে নেমেই ঠাকরোনের হাতের টর্চটা কেড়ে নিয়ে উঠোনে ফেলে দিয়ে দু’হাতে মুখ আর হাত চেপে ধরে বলল, টু শব্দ করলে মেরে ফেলব। গুঁতে ভেবেছিল, মেয়েমানুষকে আর ভয় কী? মতলব ছিল,ঠাকরোনকে ঘরে ভরে দিয়ে বাইরে থেকে শেকল টেনে পালাবে। অন্য সব মেয়েমানুষ হলে তা পারতও। ওই অবস্থায় বেশির ভাগ মেয়েছেলেরই দাঁত কপাটি লাগার কথা। কিন্তু ঠাকরোনের ধাত অন্য। এক ঝটকায় গুঁতের হাত ছাড়িয়ে এমন এক চড় কষালেন গুঁতে সেইখানে বসে পড়ল। আশ্চর্য যে ঠাকরোন কাউকে ডাকাডাকি করেননি, হাল্লাচিল্লা ফেলেননি। সেইখানে পুঁতেকে ধরে লম্বা টর্চখানা দিয়ে এমন উত্তম কুস্তম পেটালেন যে, তার ধাত ছাড়ার জোগাড়।
