নিতাইখ্যাপা এবার খেপে গিয়ে বলে, আর চাঁদে যে মানুষ গেছে সে গপ্পোটা কী? সেটা গুল নয়? হিমালয় পাহাড়ে মানুষ ওঠার গল্প গুল নয়? নিতাই সব জানে। বেশি বকিয়ো না।
সরিৎ হাসে। বলে, এখানে আর কী কী আছে?
সে অনেক আছে। শুনলে মহাভারত। থাকো, জানতে পারবে।
বলে নিতাই কলকেটা এগিয়ে দিয়ে বলে, ধরাও। অগ্রে ব্রাহ্মণং দদ্যাৎ। প্রসাদ দিয়ো।
আমার পৈতে নেই, ব্রাহ্মণ-টাহ্মণ আবার কী?
ও বাবা, গোখরো সাপের বিষাত উপড়ে ফেললেই সেটা তেঁাড়া হয়ে যাবে নাকি? পৈতে থাক থাক ব্রাহ্মণ বলে কথা।
কলকেটা নিয়ে সরিৎ সন্দেহের গলায় বলে, খুব কড়া নয় তো! মাথাটাথা ঘুরে গেলে মজা দেখাব।
আরে না। মিহিন ধোঁয়া, ভারী মিষ্টি, শরীরটা গরম হবে, মাথাটা হালকা লাগবে। একটার বেশি টান দিয়ো না, ধোঁয়াটা বেশিক্ষণ ধরে রেখো না।
রাখলে কী হবে?
নেশা করেছ টের পেলে তোমার দিদি আমাকে ঠেঙিয়ে তাড়াবে।
তা তুমি তো হিমালয়ে চলেই যাচ্ছ। তাড়ালে ভয় কী?
সে তো যাবই। খাঁটি জিনিস এখনও সেখানেই পাওয়া যায়। আমাকে এক পোটকা সাধু এসে ভেজাল মাল দিয়ে গেছে। মন্ত্রে তেমন কাজ হচ্ছে না।
সরিৎ খুব আস্তে ন্যাকড়া জড়ানো কলকেয় টান দিল। মিষ্টি, মাতলা ধোঁয়া। ধক করে গলায় লাগল না, কিছু তেমন টেরই পাওয়া গেল না। ফলে আর-একটা জোর টান মেরে ধোয়াটা ধরে রাখল বুকে।
হাত বাড়িয়ে নিতাই কলকেট নিয়ে বলে, সাবধান কিন্তু। ধরা পড়লে আমার নাম কোরো না।
আরে না!–বলে ধোঁয়াটা আস্তে আস্তে ছেড়ে দেয় সরিৎ।
নিতাই কলকেটা জুতমতো ধরে বলে, নিতাইয়ের কপালটা খুব ভাল কিনা! যেখানে যত খারাপ ব্যাপার হবে সবাই ধরে নেয় এ নিশ্চয়ই নিতাইয়ের কাজ। তোমার ভেঁপো ভাগনেটা কোথা থেকে খারাপ খারাপ কথা শিখে এসেছে, সে দোষটা পর্যন্ত আমার ঘাড়ে চালান করল মদনা।
বাণ মারতে পারো না! বাণ মেরে সব ফিনিশ করে দাও।
নিতাই অভিমানভরে বলে, বাণমারা নিয়ে সবাই আমাকে খ্যাপায়। তুমিও নতুন এসেই পেছুতে লাগলে?
সরিৎ বাঁশের ঠেকনোয় মাথা রেখে কুয়াশামাখা আধখানা চাদের দিকে চেয়ে বলল, খ্যাপাব কেন? বাণ মারা জানলে আমিও বিস্তর লোককে বাণ মারতাম।
নিতাই শ্বাসটা সম্পূর্ণ ছেড়ে কলকেয় একটা চুমু খেয়ে মুখ লাগাল, তারপর হাপরের শব্দ করে টেনে নিতে লাগল ধোঁয়া। ধিইয়ে উঠল কলকের আগুন। অনেকক্ষণ ঝিম মেরে থেকে বলল, আমিও মারি। কিন্তু মদনা শালা মরে না।
মদনটা কে বলো তো?
ঠিকাদারবাবুকে চেনো না? ভুশুণ্ডির কাক। দেখলেই চিনবে। মল্লিবাবুর সঙ্গে খুব মাখামাখি ছিল।
সরিৎ খুব সাবধানে জিজ্ঞেস করল, মল্লিবাবু লোক কেমন ছিল?
নিতাই আবার টান মেরেছে। ধোঁয়া বেরিয়ে যাওয়ার ভয়ে অনেকক্ষণ কথা বলল না। তারপর নাক দিয়ে দুটো সাদা সাপ ছেড়ে দিয়ে বলল, যারা বিয়ে করে না তারা লোক খারাপ হয় না। পুরুষদের খারাপ করে তো মেয়েছেলেরা। যাদের এগারো হাতেও কাছা হয় না।
মেয়েছেলের ওপর তোমার অত রাগ কেন বলো তো?
মা বোন পর্যন্ত মেয়েছেলেরা ভাল। যেই বউ হল অমনি সর্বনাশ।
সরিতের নেশা হয়েছে কি না তা বুঝতে পারছে না। তবে মাথাটা হালকা লাগছে, টলমল করছে। শরীরে তেমন ঠান্ডা টের পাচ্ছে না। বরং একটা যেন হাঁসফাঁস লাগে। তবু সেজদির বাড়ির রহস্যটা জানবার একটা আগ্রহ সে এসে থেকেই বোধ করছে। গত সাত দিনে সে শুধু রহস্যটা টের পেয়েছে। বোঝেনি। এ ব্যাপারে কাউকে প্রশ্নও করা যায় না। কেবল নিতাইখ্যাপার কথা আলাদা।
সরিৎ খুব সাবধানে জিজ্ঞেস করল, মল্লিবাবু বিয়ে করল না কেন?
বিয়ে করেনি তাতে কী? ভালই ছিল। অনেক মেয়েমানুষ ছিল তার। লাইনের ওধারে মঙ্গলহাটের চামেলীর কাছে খুব যাতায়াত ছিল, কলকাতাতেও তো ছিলই শুনি। ফুর্তিতে থাকত। ফেলো কড়ি মাখো তেল। কোনও বাঁধাবাঁধি নেই।
বিয়ে করবে না তো এত সব সম্পত্তি করতে গিয়েছিল কেন? কার ভোগে লাগবে?
ও হচ্ছে পুরুষ মানুষের একটা নেশা। রোজগার করবে, সম্পত্তির মালিক হবে, এ না হলে পুরুষ কিসের? ভোগের কথা যদি বলল তো ভোগ মল্লিবাবু একাই কিছু কম করেনি।
এত লোক থাকতে সেজো জামাইবাবুকেই বা সম্পত্তি দিয়ে গেল কেন, জানো?
সে অনেক গুহ্য কথা আছে। থাকলে টের পাবে। তবে সম্পত্তি তোমার ভগ্নিপোতের নয়, দিদির।
তাও জানে সরিৎ। সেই শশাকেই কি জামাইবাবু বাড়ি থেকে অনেকটা বাইরের দিকে আলাদা ঘরে পর-মানুষের মতো বসবাস করছে? সেজদির সঙ্গে জামাইবাবুর কথাবার্তা প্রায় নেই বললেই হয়। এ বাড়ির ছেলেমেয়েগুলো একটু নির্জীব যেন। গাছপালা, পুকুর, আলো-হাওয়া, প্রচুর খাবার-দাবার সত্ত্বেও বাড়িটায় যেন আনন্দ নেই।
খ্যাপা নিতাই আর কী বলে শোনার জন্য উৎকণ্ঠ হয়ে থাকে সরিৎ।
নিতাই বোম ভোলানাথের মতো চোখ বুজে থাকে খানিক। তারপর গদগদ স্বরে বলে, জয় কালী।
সরিৎকেও গাঁজাটা বেশ ধরেছে। চোখে অনেক ঝিকিমিকি দেখছে সে। শরীরের মধ্যে দে দোল দোল ভাব। চিন্তাশক্তি ঠিক থাকছে না, একটু একটু গুলিয়ে যাচ্ছে বোধভাষ্যি।
কী খাওয়ালে গো নিতাই! বাড়ি যেতে পারব তো! পা টলবে না?
আরে দূর দূর। খুব পারবে বাড়ি যেতে। অত ভয় খেলে কি নেশা করে সুখ আছে? চেপে বসে থাকো, চারদিককার কাণ্ডকারখানা দেখো আর হাসতে থাকো। জয় কালী!
নিতাইয়ের দেখাদেখি চোখ বুজে ধ্যানস্থ হতে গিয়ে মুহূর্তের মধ্যে তন্দ্রা এসে যায় সরিতের। হালকা মাথাটা বাঁশের ঠেকনোয় কিছুতেই আটকে থাকতে চায় না। ঝুঁকে পড়ে সামনের দিকে।
