আপনজনের অভাব এমন কোনওদিন টের পায়নি বিলু। এই রোগা মানুষটাকে এতদিন তো ভারী মনে হয়নি তার। প্রীতম কোনওদিনই বিলুর ওপর নিজেকে ছেড়ে দেয়নি। মনে হচ্ছে, আজ থেকে দিল। ফলে বিলুর ভারী বিপদ হল এখন থেকে। কেউ পাশে থাকলে সে অনেকটা জোর পেত।
প্রীতমের ভার সে একা বইবে কী করে?
মা! আমি একটু খেলনা ধরব?
বিলু ফিরে তাকিয়ে লাবুকে দেখে। ছোট্ট অসহায়, একান্ত নির্ভরশীল। লাবুকেও তো বইতে হবে তার, যতদিন না লাবু নিজের ভালমন্দ বুঝতে শেখে! বাপন্যাওটা লাবুকে বাপের কাছ থেকে কেড়ে নিতে খুব বেগ পেতে হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পেরেছে বিলু। ফলে লাবুর ভারও তাকে একা বইতে হয়।
মেয়ের দিকে চেয়ে একটা বড় শ্বাস ফেলে বিলু। লাবু তাকে ভীষণ ভয় পায়। সব সময়ে চোর হয়ে থাকে। সামান্য নড়াচড়া করতেও মায়ের অনুমতি নেয়। তবু এরকম কড়া শাসন ছাড়া উপায়ই বা কী বিলুর! দুষ্টু, দামাল, অবাধ্য মেয়ে হলে বিলুর বড় বিপদ হত।
বিলু গলায় সামান্য মাপমতো আদর মিশিয়ে বলল, খেলো। তবে শব্দ কোরো না। বাবার ঘুম যেন না ভাঙে।
লাবু মাথা নেড়ে চলে গেল।
অনিয়ম বিলু পছন্দ করে না। তবুও প্রীতমকে অঘোরে ঘুমোতে দেখে বিলু স্নান-খাওয়া বাকি রেখে বাইরের ঘরের সোফায় শুয়ে হঠাৎ ঘুমিয়ে পড়ল।
উঠল বেলায়, প্রীতমের ডাকে। বিলু! বিলু! আমার খিদে পেয়েছে।
ঘুম ভেঙে বিলুর কেমন একরকম লাগতে থাকে। মাথাটা ফাঁকা এবং টলমলে। বুকটা খাঁ খাঁ করছে তেষ্টায়। কেবল মনে হচ্ছে, কেউ নেই, আমাদের কেউ নেই।
প্রীতমের মাথা ধুইয়ে খাওয়াতে বসে বিলু হঠাৎ আজ বলে ফেলল, শিলিগুড়ি থেকে কাউকে আনাবে?
প্রীতম অবাক হয়ে বলে, কেন?
আমাদের এখন একজন সহায়-সম্বল দরকার। আপনজন বলতে তো কেউ নেই।
প্রীতম মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বলে, কে আসবে?
তুমি চাইলে নিশ্চয়ই আসবে কেউ না কেউ।
আসার মধ্যে এক আসতে পারে না। কিন্তু তারই বা এসে লাভ কী?
লাভ হয়তো একটু আছে। আমার না হলেও তোমার।
অসময়ের ঘুম থেকে উঠে প্রীতম দেখেছে, ঘরের বাদুড়ঝোলা অন্ধকারগুলো আর নেই। সে ঘৰকে বলেছে, আমি বেশ ভাল আছি। আর এখন সত্যিই সে অনেক ভাল আছে।
প্রীতম মাথা নেড়ে বলল, মা! মায়েদের ভীষণ মায়া। আমার এ চেহারা মায়ের না দেখাই ভাল। তা হলে আর যে ক’দিন বাঁচত তাও বাঁচবে না।
বিলুর কোনওদিন সহজে অভিমান-টান হয় না। আজ এ কথায় হল। বলল, শুধু মায়ের দিকটাই দেখলে! আমি কীভাবে বেঁচে আছি তা দেখলে না!
মা আমাকে পেলে বড় করে দিয়েছে। এখন মায়ের পালা শেষ। ছেলেরা বড় হলে মায়েদের খুব বেশি কিছু করার থাকে না।
বিলু দীর্ঘশ্বাস কখনও ছাড়ে না। এখন ছাড়ল। বলল, তুমি আর বড় হলে কোথায়? এখনও মায়ের আঁচলই তোমাকে ঘিরে আছে।
কথাটার মধ্যে একটু খোঁচা ছিল। প্রীতম মাথা নেড়ে বলল, তুমি যদি না পারো তবে আমাকে কোনও নার্সিং হোম বা হাসপাতালে দাও। আমার মাকে বা আর কাউকে এর মধ্যে টেনে এনো না।
বিলুর মুখ থমথম করে উঠল। ভাতের চামচ তুলেছিল প্রীতমের মুখের কাছে, প্রীতম মুখ ফিরিয়ে নিল বিরক্তিতে। আর খাবে না জানে বিলু। সে নিজে যেমন পুরুষালি স্বভাবের, প্রীতম তেমনি ঠিক মেয়েলি স্বভাবের।
বিলুর ঠোঁটের আগায় অনেক জবাব এসেছিল, কিন্তু সংযত রাখল নিজেকে। ভাতের প্লেট নিয়ে উঠে চলে গেল।
ছাদের দিকে অপলক চেয়ে শুয়ে রইল প্রীতম। চেয়ে থাকলেও তার মন অন্য কাজ করছে। ভিতরে একটা বাঁধ ভেঙে প্লাবন হয়ে গেছে। সেই বাঁধ মেরামত চলছে। এত সহজে সে কি ধরা
পড়বে মৃত্যুর ফাঁদে? আগে বেঁচে থাকাটাকে মাঝে মাঝেই খুব অর্থহীন মনে হত। মনে হত, মৃত্যুটা কেমন? এখন আর তা মনে হয় না। এখন মনে হয়, বেঁচে থাকার জন্যই বেঁচে থাকা। এর প্রতিটি মুহূর্তের দাম কোটি কোটি টাকা। মৃত্যু একটা মাইনাস পয়েন্ট। তা দিয়ে কিছুই প্রমাণ করা যায় না।
১২. কুয়াশামাখা জ্যোৎস্নায় নদীর ধারে
কুয়াশামাখা জ্যোৎস্নায় নদীর ধারে পাঠশালার বারান্দায় দুটো লোক জবুথুবু হয়ে বসে আছে। আজ একেবারে রক্তজমানো ঠান্ডা। থেকে থেকে উত্তুরে হাওয়া মারছে, তাতে ভিতরের প্রাণবায়ুটা পর্যন্ত যেন নিবু নিবু হয়ে আসে। জ্যোৎস্নায় দেখা যায়, নদীর বুকটা খাঁ খাঁ করছে, শুকনো আর সাদা। একধার দিয়ে শুধু নালার মতো একটা জলধারা কষ্টেসৃষ্টে বয়ে যাচ্ছে। নদীর খাত আগে গভীর। ছিল। এখন মাটি আর বালি জমে জমে তা প্রায় মাঠঘাটের সমান উঁচু হয়ে এল। বর্ষার প্রথম চোটেই জলের ঢল উপচে মাঠঘাট ভাসায়, পাঠশালায ক্লাসঘরে গোড়ালিড়ুব জল দাঁড়িয়ে যায়। তাই এখন গ্রীষ্মের বদলে পাঠশালায় বর্ষার লম্বা ছুটি দেয়।
এই পাঠশালা, এই নদী, চারদিকের মাঠঘাট এসব কিছুর সব গল্পই জানে নিতাইখ্যাপা। খুব যত্নে ছোট কলকেয় গাঁজা সাজতে সাজতে বলল, এ জায়গার একটা নেশা আছে। থাকো কিছুদিন, টের পাবে। মেরে তাড়ালেও যেতে চাইবে না।
ধুর! এ তো ব্যাকওয়ার্ড জায়গা।
নিতাই ইংরিজি কথাটা বুঝল না। তবে আন্দাজে ধরল, নিন্দের কথাই হবে। একটু চড়া স্বরে বলল, এ জায়গার মাটির তলায় কী আছে জানো? বিশ্বেশ্বর শিবলিঙ্গ। তাকে জড়িয়ে আছে সাতটা জ্যান্ত সাপ। মাকালতলার মোড়ে যে বটগাছ আছে, ঠিক তার দেড়শো হাত নীচে। একটা গুপ্ত সুড়ঙ্গ আছে, তা দিয়ে যাওয়া যায়। তবে সুড়ঙ্গের হদিশ কেউ জানে না।
যত সব গুলগপ্পো।
