আপনি নিশ্চিন্তে বসুন। ওটা কেউ পেয়ে থাকলেও ব্যস্ত হওয়ার কিছু নেই। আমাকে ব্ল্যাকমেল করা অত সহজ নয়।
দীপ শিউরে ওঠে। আজ সকালে সেও ব্ল্যাকমেলের কথাই ভেবেছিল না কি? সে তাড়াতাড়ি বলল, না, ব্ল্যাকমেলের কথা নয়।
তবে আর কিসের ভয়? চেকটা এমনভাবে কাটা হয়েছে যে ওটা আর ক্যাশ করা সম্ভব নয়। তা ছাড়া ব্যাংকে আমার অত টাকাও নেই। স্নিগ্ধ বেচারা খামোখা ব্যাংকে গিয়ে হয়রান হয়েছিল।
দীপ চুপ করে বসে থাকে। ভারী লজ্জা করছে চেকটা হারিয়ে ফেলায়। উনি হয়তো ভাবছেন, চেকটা সে-ই রেখে দিয়েছে। প্রয়োজনমতো কাজে লাগাবে।
মণিদীপা অতিরিক্ত স্নেহের সঙ্গে বললেন, মিস্টার বোস বোধ হয় রেসের পর কোথাও বসে বিয়ার-টিয়ার খাচ্ছেন। আপনাকে বসতে হবে। একটু চা বলে দিই?
চা!–বলে দীপ একটু ভাবে, তারপর মাথা নেড়ে বলে, দরকার নেই। আমি বরং উঠে পড়ি। উইনিং টিকিটের টাকাটা যদি আপনি রেখে দেন—
বলতে বলতে দীপ উঠে প্যান্টের গুপ্ত পকেটের দিকে হাত বাড়ায় এবং ভাবে, হায় ভগবান! চেকটার মতো টাকাগুলোও যদি এতক্ষণে ম্যাজিকের মতো গায়েব হয়ে গিয়ে থাকে।
মণিদীপা মাথা নেড়ে বললেন, আমাকে বোস সাহেব অত বিশ্বাস করেন না দীপনাথবাবু। আমি বিশ্বস্তও নই। টাকাটা আমার হাতে এলে আমি নিশ্চয়ই খরচ করে ফেলব। তখন আপনি খুব মুশকিলে পড়বেন। বরং একটু বসুন, মিস্টার বোস এসে যাবেন।
দীপ সুতরাং বসে পড়ে। বলে, টাকাটা যে আপনার হাতে দেওয়া যাবে না এমন কথা কিন্তু মিস্টার বোস আমাকে বলেননি।
মণিদীপা হেসে বলেন, ও কখনও বলবে না। কিন্তু এইসব ছোটখাটো ঘটনার ভিতর দিয়ে আপনার বুদ্ধিকে ও পরীক্ষা করবে। নাড়ুগোপালের মতো চেহারা দেখে ওকে বোকা ভাববেন না। ও শেয়ালের মতো চালাক। পরীক্ষায় আপনি পাশ করলেই যে ও আপনাকে কোনও চান্স দেবে তাও ভাববেন না। মানুষকে নানাভাবে পরীক্ষা করাটা ওর হবি। আমাকেও অনবরত পরীক্ষা দিতে হচ্ছে।
বলে মণিদীপা ইংগিতপূর্ণভাবে চুপ করে থাকেন।
দীপ বোঝে, এটাও একটা পরীক্ষা। মণিদীপা দেখছেন, সে ওঁদের স্বামী-স্ত্রীর ব্যাপারে কোনও আগ্রহ প্রকাশ করে কি না। সে ইদানীং চালাক হয়েছে, তাই ওসব কথার ধার দিয়েই গেল না। বলল, টাকাগুলো যতক্ষণ সঙ্গে থাকবে ততক্ষণই অস্বস্তি।
টাকার কিছু হ্যাজার্ডস তো আছেই।–বলে মণিদীপা একটু হাসলেন। এতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলেন, এবাব পাশের কৌচে বসে বললেন, কত টাকা জিতেছে ও?
প্রায় দু’হাজার।
মণিদীপা ভ্রু কুঁচকে একটু ভেবে বললেন, টাকা আয় করা কারও কারও কাছে কত সোজা!
তা ঠিক। মণিদীপা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, আপনিও রেস খেললেন নাকি?
আমার ভাগ্যটা একদম কানা। চল্লিশ টাকার মতো হেরে গেছি।
কোনও দিন জিতেছেন?
না।
তা হলে আপনাকে ভাগ্যবানই বলতে হয়।
কেন?
জিতলে রেসের মাঠের নেশা আপনাকে ভূতের মতো পেয়ে বসত। আমিও প্রথম প্রথম ওর সঙ্গে খুব যেতাম। কিন্তু প্রত্যেকবার হেরে হেরে বিরক্তি ধরে যাওয়ায় আর যাই না। কিন্তু টের পেতাম যারা এক-আধবার জেতে তারা আর নেশাটা কিছুতেই ছাড়তে পারে না।
দীপ একটু হেসে বলল, আমার প্রবলেমটা তা নয়। আমি যে-কোনও নেশাই ছাড়তে পারি।
মণিদীপা মাথা নেড়ে বলেন, ইউ আর নট একসেপশন।
দীপ হঠাৎ টের পায় তার নামের সঙ্গে মণিদীপার নামের একটা আশ্চর্য মিল আছে। সে দীপনাথ, আর মিসেস বোস মণিদীপা। এতক্ষণে এ মিলটা তার মনে পড়েনি তো! আশ্চর্য!
দীপ বলল, আসলে আমি কোনও কিছুতেই তেমন ইন্টারেস্ট পাই না। আমার আগ্রহ শুধু কোনওক্রমে বেঁচে থাকার।
মণিদীপা উদাসভাবে বললেন, আমারও কি তাই নয়? সকলেরই তাই। তবু মানুষের ইন্টারেস্টেরও তো শেষ নেই। রেসের মাঠে আমি আমার স্কুলের একজন পুরোনো মাস্টারমশাইকে দেখতে পেয়েছিলাম, যাকে সবাই সাধুসন্ত বলে মনে করত।
মণিদীপা চায়ের কথা বলেননি, কিন্তু তবু চা এল। ট্রে ভরতি চায়ের পট, দুধের পাত্র, চিনির বোল, একটা মস্ত প্লেটে নিউ মার্কেটের ভাল কেকের একটা বড় টুকরো, দুটো বড় সন্দেশ আর একটা কাটলেট গোছের জিনিস। এ বাড়িতে দীপ কদাচিৎ আপ্যায়িত হয়েছে। এতটা তো কোনওদিনই নয়। সে বলল, এত?
আমার বাপের বাড়িতে লোক এলে চা আর খাবার দেওয়ার নিয়ম। গরিবদের বাড়িতেই ওসব নিয়ম থাকে। বড়লোকরা খুব কাঠ-কাঠ ডিসিপ্লিনে চলে, তাই অতিথি আপ্যায়ন না করলেও বলার কিছু নেই। তবে মাঝে মাঝে গার্টি দিতে হয়। আজ যেমন।
দীপ চুপ করে রইল। চুপ করে থাকার চেয়ে বড় কূটনীতি তার জানা নেই। অল্পস্বল্প খাচ্ছিলও সে। তবে খুব সংকোচের সঙ্গে।
মণিদীপা হঠাৎ খুব হেসে উঠে বললেন, সত্যিই আপনার কোনও ব্যাপারে ইন্টারেস্ট নেই দেখছি!
দীপ কৌতূহলে মুখ তুলে বলে, কেন?
একবারও তো জিজ্ঞেস করলেন না স্নিগ্ধদেব লোকটা কে!
দীপ গম্ভীর হয়ে বলে, আমার জানার দরকার তো নেই।
দরকার নেই, সে তো ঠিকই। কিন্তু কৌতূহলও কি হয় না?
দীপ কেকটার তেমন স্বাদ পাচ্ছিল না, ভালই হওয়ার কথা। বলল, কেউ একজন হবেন। হয়তো আপনার ভাই-টাই।
কী বুদ্ধি! আমি বোসের বউ হলে আমার ভাই চ্যাটার্জি হয় কী করে?
অসবর্ণ তো হতে পারে!
মোটেই না। আমার বাপের বাড়ি মিত্র।
ও। তা হলে বন্ধু?
মণিদীপা মস্ত এক শ্বাস ছেড়ে বললেন, শুনলে হাসবেন। স্নিগ্ধদেবের বয়স চল্লিশের ওপর। রং কালো, চেহারা রোগা এবং দেখতে মোটেই ভাল নয়। মাথার চুল পাতলা হয়ে টাক পড়ে এল প্রায়। তার স্ত্রী এবং দুই ছেলেমেয়ে আছে। স্কুলমাস্টার এবং বেশ গরিব।
