গরিবকে সাহায্য করতে চেয়েছিলেন?
না। টাকাটা ওকে দিচ্ছিলাম, ও পার্টি-ফান্ডে জমা দেবে বলে।
রাজনীতির লোক নাকি?
ভীষণ। এবং এত গাটসওয়ালা লোক এ দেশে দুটো নেই। আপনি যদি ওর সঙ্গে দশ মিনিট কথা বলেন তা হলেই আপনার লাইফ-ফিলজফি পালটে যাবে।
দীপ খুব চালাকের মতো বলে, তা হলে দেখা না করাই ভাল।
আসলে দীপ ব্যক্তিপূজা ভালবাসে না। এলেমদার যে-কোনও লোককে বিগ্রহের আসনে বসাতে সে রাজি নয়।
মণিদীপা বললেন, আপনি ওকে চেনেন না।
দীপ লক্ষ করে মণিদীপার চোখে হঠাৎ স্বপ্নের সুদূর ফুটে উঠল।
১১. এখানে দু’কাঠা চার ছটাক জমি
এখানে দু’কাঠা চার ছটাক জমি আছে। দাম পঁচিশ হাজার।
বড্ড বেশি। নাকতলায় এত বেশি জমির দাম নয়।
নাকতলা কি আগের নাকতলা আছে বউদি? জমির সামনে যোলো ফুট চওড়া রাস্তা হবে।
সে যখন হবে তখন দাম বেশি দেব।
আসলে জমিটা পছন্দও নয় বিলুর। বড় ঘিঞ্জি পাড়ার মধ্যে, চারধারে বড় বড় বাড়ি। রাস্তাও ভাল নয়। কাঁচা ড্রেন থেকে ঝাঁঝালো কটু গন্ধ আসছে। সে নাকে রুমাল চাপা দিয়ে একটু পিছিয়ে এল। পাশেই একটা দোতলা বাড়ি থেকে একটা বউ তাকে লক্ষ করছে।
দালাল লোকটা মরিয়া হয়ে বলল, দুটো প্লট ছেড়ে পরের প্লটে একজন ফিল্ম স্টার থাকে।
কৌতূহলে বিলু জিজ্ঞেস করে, কে?
দালাল যার নাম বলল সে আসলে পড়তি অভিনেত্রী। বিলু তাই আগ্রহী হল না। বলল, গলফ ক্লাবের একটা প্লটের কথা বলেছিলেন যে।
দালাল খদ্দেরের ধাত বুঝে একটু অবহেলার স্বরে বলে, সে বিক্রি হয়ে গেছে। আরও বেশি দাম ছিল।
এই শীতেও পরিশ্রান্ত বোধ করে বিলু। সকাল থেকে এ পর্যন্ত গোটা চারেক প্লট দেখল। বেহালা, কসবা, গড়িয়া আর নাকতলা। সবই কলকাতার বাইরের অঞ্চল। কিন্তু কোথাও তেমন খখালামেলা নেই আর। অবারিত মাঠঘাট নেই। আবার লোকবসতি বেশি বলে তেমন ফ্যাশনদুরস্ত বাজারহাট বা দোকান-পসারও তেমন হয়নি। ভবানীপুরে থেকে থেকে অভ্যাসটাই খারাপ হয়ে
গেছে।
গাড়িটা অনেক দূরে রাখতে হয়েছে। এত দূরে গাড়ি আসেনি। হয়তো আসত, কিন্তু দালালই সাহস পায়নি রাস্তা ভাল নয় বলে।
বিলু একটু উম্মার সঙ্গে বলে, পছন্দসই একটা জমিও কিন্তু আপনি দেখাতে পারলেন না।
দালাল লোকটি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলে, কোনওটা তো অপছন্দের নয় বউদি। এই জায়গাগুলো সবই ডেভেলপ করবে, তখন দেখবেন প্লটটা নিয়ে রাখলেন না বলে দুঃখ হবে।
ডেভেলপ করেনি বলছেন, তা হলে দামই বা অত বেশি কেন? এসব জায়গার দাম আরও কম হওয়া উচিত।
দালাল মাথা নেড়ে বলে, পঁচিশ হাজার আজ বলছে। এক মাস পরেই দেখবেন, ত্রিশ উঠে গেছে। আর জমির দাম একবার উঠলে আর কখনও নামে না। ওই একটা জিনিস কেবল উঠেই যাবে।
শীতের রোদ বলে রোদের তেজ কম নয়। মাথা বাঁচাতে ঘোমটা দিয়েছে বিলু, চোখ বাঁচাতে গগলস্। এখন বেলা বাড়ায় একটু গরমও লাগছে। হেঁটেছে অনেকটা।
দালাল শেষ কথা বলল, জমির তো আর সাপ্লাই বাড়বে না। ও ভগবান যা মেপে দিয়ে রেখেছেন। তাই চিরকাল থাকবে। কিন্তু চাহিদা বেড়েই যাবে, দামও চড়বে। যত সব বড় ফ্যামিলি ভেঙে টুকরো টুকরো হচ্ছে, আর সঙ্গে সঙ্গে জমির জন্য হন্যে হয়ে উঠছে লোক। বাপ নিজে বাড়ি করল তো তার তিন উপযুক্ত ছেলে তিনটে বাড়ি হাঁকাল, কেউ কারও সঙ্গে থাকতে চায় না আজকাল। প্রত্যেকেই চায় আলাদা সংসার, আলাদা বাড়ি। তা ছাড়া বাড়িওয়ালারা হুড়ো দেয় বলেও লোকে নিজে বাড়ি করতে চায়।
অরুণের সাদা অ্যামবাসাডার গাড়ি রোদে ঝিকোচ্ছে বড় রাস্তায়, অরুণ পিছন ফিরে প্রীতমকে কী যেন বলছে। পিছনের সিটে প্রীতম বসে আছে নির্জীব হয়ে। সে কিছুই শুনছে বলে মনে হল না। চোখ বোজা, ঠোঁটে ক্লান্ত একটু হাসি।
অরুণ বলল, পছন্দ হয়েছে?
না, বড্ড ঘিঞ্জি।
তোমার জন্মেও পছন্দ হবে না।
বিলু কুটি করে বলে, পছন্দের মতো হলেই পছন্দ হবে।
দালাল লোকটা সামনের সিটে অরুণের পাশে উঠে বসে। বিলু পিছনের সিটে প্রীতমের পাশে বসে বলে, তোমাকে খামোখা কষ্ট দিলাম।
প্রীতম চোখ মেলে চেয়ে বলে, খুব নয়, তবে এখন শুয়ে থাকতে ইচ্ছে করছে।
শোবে? শোও না!–বলে বিলু নিজের কোল দেখিয়ে দিয়ে ঠিক হয়ে বসে।
প্রীতম শোয় না। অরুণের সামনে কেমন দেখাবে। সে বলল, না, পারব।
একটা বা দুটো বালিশ আনলে পারতে।–অরুণ গাড়িতে স্টার্ট দিয়ে বলে।
ভুল হয়ে গেছে।–বিলু জবাব দেয়।
প্রীতম লজ্জার সঙ্গে বলে, না না, সেটা খারাপ দেখাত। আমার অত বেশি কষ্ট হচ্ছে না।
হলেই কি আপনি বলবেন!–অরুণ মুখ ফিরিয়ে একটু হাসে। তারপর মাথা নেড়ে বলে, আপনি তাজ্জব লোক।
কেন?–মৃদু উদাস গলায় প্রশ্ন করে প্রীতম। ঠিক প্রশ্নও নয়। সে যে একটু তাজ্জব লোক তা সে জানে।
আপনি ভাবেন, নিজের কষ্টের কথা স্বীকার করার মানেই হল, ডিফিট।
এ কথার নিশ্চয়ই জবাব হয়। কিন্তু প্রীতম জবাব দেওয়ার মতো দমে কুলিয়ে উঠতে পারে না। বহুক্ষণ সে বসে আছে। হেলান দিয়ে যথেষ্ট নরম গদিতে ড়ুবে থাকা সত্ত্বেও তার শরীর এখন খাড়া থাকতে চাইছে না। শরীরের জীবাণুরা খেপে উঠছে। ঝিঝি ডাকছে সারা পা জুড়ে।
একটু মাথা হেলিয়ে দিতেই বিলুর কাঁধে আশা পায় সেটা। বিলু বলে, তোমার লজ্জার কী? ভাল করে মাথা রাখো।
প্রীতম আবার ঘাড় সোজা করে বসে।
উঠলে কেন?
রাস্তাঘাট দেখি। বহুকাল এসব দিকে আসিনি।
বিলু মৃদু স্বরে বলে, দেখতে হবে না। মাথাটা আমার কাঁধে রেখে চোখ বুজে থাকো। কোনও কাজ হল না আজ, শুধু শুধু তোমাকে টেনে আনলাম।
