দীপ একটু অন্যমনস্ক হয়ে যায়। মেজদার সঙ্গে দেখা না হলে সে আজ দুই নম্বর ঘোড়াগুলোর ওপর খেলত। কিছু অন্তত জিতেও যেত। কিন্তু এই অনিশ্চয়তার নামই তো ঘোড়দৌড়।
পেমেন্ট নিয়ে দীপ বাইরে এসে দেখে, বোসের গাড়িতে বসার জায়গা নেই। বন্ধু ও বন্ধুর স্ত্রীরা জায়গা জুড়ে বসে আছে। বোস দীপকে বলল, সুটকেসটা লাগেজবুকে দিয়ে দিন।
টাকাটা?–দীপ জানালায় ঝুঁকে চাপা স্বরে জিজ্ঞেস করে।
আপনার কাছে থাক। একটা ট্যাক্সি নিয়ে আমার ফ্ল্যাটে চলে আসুন।
গাড়ি ছেড়ে দেয়।
দীপ তার প্যান্টের গুপ্ত পকেটে টাকার বান্ডিলটা অনুভব করতে করতে অস্বস্তিতে পড়ে যায়। তার বিশ্বস্ততা সম্পর্কে বসের কোনও সন্দেহ নেই, তা সে জানে। কিন্তু ভয় কলকাতার চাল পকেটমারদের। টাকাটা মার গেলে শশাধ করার সাধ্য তার নেই।
রেসের মাঠ থেকে শেয়ারের ট্যাক্সি ছাড়া গতি নেই।
রেসে হারা চারজন গোমড়ামুখো লোকের সঙ্গে একটা ট্যাক্সিতে জায়গা পেল দীপ। সামনের সিটে ড্রাইভার আর তার অ্যাসিস্ট্যান্ট এবং আর-একজন যাত্রীর মাঝখানে খুবই ঠাসাঠাসি করে বসতে হয়েছে তাকে। শীতকাল বলে অতটা কষ্ট হচ্ছে না। কিন্তু ভারী আড়ষ্ট লাগছে। পিছনে হেরে রেসুড়েরা বলছে, কে জানত লাইটনিং জিতবে? পুরো গট আপ কেস।… আমি নিজে দেখেছি টপ স্কোরারকে বাঁকের মুখে ইচ্ছে করে জকি টেনে রাখছিল।… মন্দাকিনী বোধ হয় জীবনে এই প্রথম জিতল।… স্টেটসম্যান ওটাকে ফ্লকে রেখেছিল….
দীপ অত্যন্ত সজাগ হয়ে বসে আছে। তার সমস্ত মনপ্রাণ কেন্দ্রীভূত হয়ে আছে গুপ্ত পকেটের দু’হাজার টাকার ওপর। হাত দিয়ে ছুঁয়ে টাকাটা আছে কি না দেখতে ইচ্ছে করছিল তার। কিন্তু সেটা ভারী বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। লোকে জেনে যাবে, টাকা আছে।
তারাতলায় নেমে আর বাস-টাস ধরল না দীপ। সোজা হাঁটা দিল। নিউ আলিপুরের ও ব্লক অনেকটা দূর। তবু হাঁটাই ভাল।
শীতের অন্ধকার দেখতে না দেখতে নেমে আসে। দীপের ঘেমো শরীরে উত্তরের হাওয়া লেগে শিরশির করতে থাকে। তবু একটু রোমাঞ্চও আছে কোথাও। মনের গভীরে কি সত্যিকারের পাপ আছে তার? তবে কেন বোস সাহেবের ফ্ল্যাটে যেতে তার একরকম তীব্র সুখের অনুভূতি হচ্ছে? এখনও সেই কাটা চেকটা তার বুক পকেটে। স্নিগ্ধদেব চ্যাটার্জির নামটা সে একটুও ভুলে যায়নি।
বোসের ফ্ল্যাটে পৌঁছে দীপ দেখল, বোস এখনও আসেনি। সাদা উর্দিপরা একজন বেয়ারা দরজা খুলে দিয়ে ড্রয়িং কাম ডাইনিংয়ের মাঝখানে প্ল্যাস্টিকের ফুলছাপ পরদাটা টেনে দিল। ড্রয়িংরুমের ফাঁকা নির্জনতায় বসে দীপ টের পাচ্ছিল ডাইনিং হলে আজ কোনও ভোজর আয়োজন হচ্ছে। অন্তত দু-তিনজন বেয়ারা নিচু স্বরে কথা বলতে বলতে টেবিল সাজাচ্ছে। প্লেট আর চামচের শব্দ হচ্ছে টুং টাং।
বড়লোকদের ড্রয়িংরুম যেরকম হয় বোসেরটাও তাই। ভাল সোফাসেট, পেতলের ছাইদানি, মেঝেয় কার্পেট, কাচের স্ল্যাব বসানো সেন্টার টেবিল, ঘোমটা দেওয়া স্ট্যান্ডের আলো, টি ভি সেট এবং অপরিহার্য বুক-কেস।
মিসেস বোস বা মণিদীপার কোনও সাড়াশব্দই পেল না দীপ। ভদ্রমহিলা আদৌ বাড়িতে আছেন কি না তাও বুঝতে পারছে না। এ বাড়িতে তার যাতায়াত বেশ কিছু দিনের। কিন্তু এখনও সে ড্রয়িংরুমের সীমানা পার হতে পারেনি।
খবর না দিলে মণিদীপা হয়তো খবর পাবেন না ভেবে দীপ উঠে গিয়ে পরদা সরিয়ে একজন বেয়ারাকে বলল, মেমসাহেব বাড়িতে নেই?
আছেন। ড্রেস করছেন।
তাঁকে একটু সেলাম দেবে? বলো, দীপনাথবাবু এসেছেন।
বেয়ারা তেমন গা করল না যেন। তবে মাথা নাড়ল।
দীপ আবার এসে সোফায় বসে এবং একটি ইংরেজি ফ্যাশনের পত্রিকা তুলে নিয়ে ছবি দেখতে থাকে।
মণিদীপা নিঃশব্দে এলেন না। এলেন চাকরবাকর বা বেয়ারাদের কাউকে অনুচ্চস্বরে বকতে বকতে। কারও কোনও দোষ হয়ে থাকবে।
ড্রয়িংরুমের পরদা সরিয়ে ভিতরে এসে চুপ করে দাঁড়ালেন মণিদীপা। ‘কী খবর’ বা ‘এই যে, কখন এলেন’ গোছের কোনও প্রশ্ন করলেন না। দাঁড়িয়ে খুব খরচোখে দীপকে দেখছিলেন। পরনে একটা কাপতান। জাপানি কিমোনো ধরনের ভারী ঝলমলে পোশাক। মুখে রূপটান মাখা শেষ হয়েছে। মস্ত মৌচাকের মতো করে বাঁধা খোঁপা। দীপের যতদূর মনে পড়ে, ওঁর মাথার চুল বব করা। তবু খোঁপাটা কী করে সম্ভব হল তা ভেবে পায় না সে। মণিদীপার গা থেকে ভারী মোহময় একটা সুবাসও আসছিল। সম্ভবত ফরাসি সেন্ট।
দীপ মুখ তুলে বলল, সকালে সেই চেকটা দেওয়ার কথা একদম ভুলে গিয়েছিলাম।
মণিদীপা একটু যেন বিরক্ত হয়ে বললেন, এটা নিয়ে আপনি অত মাথা ঘামাচ্ছেন কেন? খুব ইমপর্ট্যান্ট কিছু নয়।
দীপ বুকপকেটে চেকটা খুঁজতে খুঁজতে বলে, আপনার কাছে না হলেও আমার তো একটা দায়িত্ব আছে। আপনিও চেয়েছিলেন।
বুকপকেট থেকে রেসের বাতিল টিকিট, ঠিকানা লেখা কাগজ এবং ভাউচার ইত্যাদি একগাদা কাগজ বেরোল বটে, কিন্তু চেকটা নেই। নেই তো নেই-ই। পোশাকে যে ক’টা পকেট ছিল সবই হাঁটকে ফেলল দীপ। মুখ লাল হয়ে উঠছে তার, কান মাথা ঝা ঝা করছে। চেকটা তার সঙ্গে হঠকারিতাই করে বসেছে শেষ পর্যন্ত।
মিসেস বোস নিঃশব্দে ব্যাপারটা লক্ষ করছিলেন। মুখে মৃদু জ্বালাভরা হাসি। দীপের খোঁজা এবং পাওয়ার পালা শেষ হলে বললেন, খামোখা ব্যস্ত হচ্ছেন। আমিই তো বলছি চেকটার কোনও দাম নেই।
দীপ নিভে গিয়ে বলে, আমি কিন্তু পকেটেই রেখেছিলাম। রেসের মাঠে হয়তো–
