এই একটা রহস্য থেকে গেল চিরকাল। কেন যে বড়দা মল্লিনাথ তার যাবতীয় বিষয়-আশয় ভাইয়ের বউকে লিখে দিয়ে গেল তা কে বলবে! দীপনাথের কোনও লোভ নেই বটে, কিন্তু ব্যাপারটা মনে পড়লে তার খুব ধাঁধা লাগে। কিছু কুকথাও শুনেছে সে মল্লিনাথ আর বউদিকে নিয়ে। কথাগুলো সুখশ্রাব্য নয়। গায়ে জ্বালা ধরে যায়।
দীপনাথ বলল, বলছি তো, ওদের টান্সার দরকারটা আদপেই প্রধান নয়। ওদের যেটা নেই সেটা হল আপনজন।
কথাটা শ্রীনাথের বোধহয় মনোমত হল। ওপর নীচে বুঝদারের মতো মাথা নেড়ে বলল, ওইটেই তো সবচেয়ে বড় সমস্যা। আপনজন পাওয়াই সবচেয়ে কঠিন। জন থাকলেও তারা আপন হতে চায় না। তুই নম্বর দেখে টিকিট কাট।
তাই কাটে দীপনাথ।
বাইরে এসে শ্রীনাথ জিজ্ঞেস করে, এখন কী করছিস?
একটা গুজরাটি কোম্পানির ব্রাঞ্চ ম্যানেজারের সেক্রেটারি।
কত দিচ্ছে-থুচ্ছে?
দেয় একরকম। চলে যায়।
ওটা কোনও কাজের কথা নয়। পে স্কেল আছে তো?
না। চাকরিতে সদ্য ঢুকেছি, ওসব এখনও ঠিক হয়নি।
বিয়ে করে বসিসনি তো?
না।
করিস না। ও ঝামেলায় না যাওয়াই ভাল।’
শ্রীনাথের মুখে এ কথা শুনবে বলে আশা করেনি দীপনাথ। বউদির সঙ্গে কি তা হলে ওর বনিবনা হচ্ছে না!
শ্রীনাথ নিজেই রহস্য পরিষ্কার করে দিয়ে বলল, চারদিকে এত থিকথিকে মানুষজন দেখে আমার বিয়ের ওপর বিতৃষ্ণা এসে গেছে। আর লোক বাড়িয়ে লাভ কী? তা ছাড়া আজকালকার মেয়েরা যত্নআত্তিও জানে না। ঘাড়ে চেপে বসে বসে খায় আর রক্ত শোষে।
কথাগুলো নীরবে শুনল দীপ। মনে মনে হাসল। দীপনাথের ভালমন্দ ভেবে এত কথা বলেনি মেজদা। ও নিজের কথা ভেবে বলছে। দুনিয়ার সব মানুষই আজকাল নিজের নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা দিয়ে আর পাঁচটা লোকের ভালমন্দ বিচার করে।
শ্রীনাথ আর দীপনাথ দু’জনেই এই রেসটায় মার খেল। শ্রীনাথের টিপস মেলেনি। তবে দীপ অন্যমনস্কতার মধ্যেও চমকে উঠে দেখল, এই রেসে বাজি মেরেছে দু’নম্বর ঘোড়া। তারও আজ আগাগোড়া দু’নম্বরে বাজি ধরারই সংকল্প ছিল। ধরলে ঠকতে হত না।
শ্রীনাথ নিজের টিকিটটা দুমড়ে ছুড়ে ফেলে দিয়ে বলল, তোর মেসের ঠিকানাটা দিয়ে রাখিস তো। একবার দিয়েছিলি, সেটা বোধ হয় হারিয়ে গেছে।
দীপ বলে, হারিয়ে ভালই হয়েছে। সেই বোর্ডিং-এ আমি আর থাকি না। এখনকার ঠিকানা আলাদা। অনেকদিন আমার কোনও খোঁজ রাখো না মেজদা!
তুই নিজেই কি রাখিস!
রতনপুরে সবাই ভাল আছে?
আছে ভালই। সবজি, ডিম, মাছ সব বাড়িতে বা জমিতে হচ্ছে। খাঁটি সব জিনিস পাচ্ছে, ভাল থাকার কী?
সজল কত বড় হল?
এঁচড়ে পাকা।
অনেকদিন আগে ওকে চিড়িয়াখানা দেখাব বলে কথা দিয়েছিলাম। সেটা আর হয়নি।
চিড়িয়াখানা বহুবার দেখেছে। চিন্তা নেই। তা ছাড়া নিজেদের বাড়িতেই তো চিড়িয়াখানা। কত পাগল, ছাগল, সাধু, বদমাশের আনাগোনা।
শ্রীনাথের কথার ভিতর একটা ভয়ংকর বিদ্বেষ আর ঘৃণা ফুটে বেরোচ্ছে। ঠিক অনুধাবন করতে পারছে না দীপনাথ। তবে আঁচটা গায়ে লাগছে। শ্রীনাথ কখনও বোধহয় কাউকে সুখী করেনি, সুখী সে নিজেও হয়নি।
পরের রেসগুলিতে একের পর এক দু’নম্বর ঘোডা বাজিমাত করে গেল। শ্রীনাথের একটা টিপসও মিলল না। সেজন্য শ্রীনাথকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। স্বধর্মে মরাও যে ভাল এই আপ্তবাক্যটা যে মনে রাখেনি দীপ! নিজের সংকল্পে অচল থাকলে সে আজ বহু টাকা জিততে পারত।
শ্রীনাথ দাঁড়াল না। রেস শেষ হতেই বলল, চলি রে।
ভিড়ের ভিতর দুর থেকে মেজদাকে লক্ষ করছিল দীপনাথ। তার কেন যেন মনে হচ্ছিল, রেসের মাঠে মেজদা একা আসেনি। দীপনাথের সঙ্গে কথা বলতে বলতে মাঝে মাঝে ভিড়ের মধ্যে কাকে যেন চোখের ইশারা দিচ্ছিল।
দীপনাথের অনুমান মিথ্যে নয়। শ্রীনাথ পেমেন্ট কাউন্টারের কাছ বরাবর পৌঁছলে একটা কালো মতো বদমাশ চেহারার লোক আর ফর্সা মতো একটা মেয়ে তার সঙ্গ নিল।
গ্র্যান্ড স্ট্যান্ড থেকে বোস নেমে আসে। সঙ্গে তার সমপর্যায়ের কয়েকজন বন্ধুবান্ধব এবং তাদের দু’জনের দু’রকম সুন্দরী দুটি স্ত্রী। সবাই খুব হাসছে। প্রায় সবাইকেই চেনে দীপ।
ক্লাইন ওয়ালকটের পি আর ও দত্ত দীপকে দেখে বলে উঠল, হ্যাল্লো! হাউ ইজ লাইফ?
দত্তর মুখটা রক্তাভ। আলগা একটা চকচকে ভাব তার চোখে। অঢেল বিয়ারের প্রভাব। দীপ মৃদু হেসে বলল, টেরিফিক।
তার হাতের সুটকেসটা সবাই দেখছে, তবে ভদ্রতাবশে কেউ জিজ্ঞেস করছে না কিছু। সবাই ফটকের দিকে হাঁটছে। দীপ বুঝতে পারছে না উইনিং টিকিটের পেমেন্টগুলো কে নেবে! সে জানে, বোস নিজে পেমেন্ট নিতে ভালবাসে। আজও নিজেই নেবে কি? সুটকেস নিয়ে দলের পিছু পিছু হাঁটতে হাঁটতে এই ছোট সমস্যাটা আবার ভাবিয়ে তুলল তাকে। কোনও ব্যাপারেই সে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। ফলে দ্বিধাগ্রস্ত ও সমস্যাপীড়িত মন নিয়ে সে মহিলা দু’জনের সৌন্দর্যও ভাল করে উপভোগ করতে পারছে না।
ফটকের কাছাকাছি এসে অবশ্য বোস তাকে সমস্যা থেকে মুক্তি দিয়ে বলল, দীপবাবু, আপনি বরং পেমেন্টটা নিয়ে আসুন। আমরা বাইরে অপেক্ষা করছি।
সুটকেস দুলিয়ে দীপ দৌড়ল। বোস প্রায় হাজার দুয়েক টাকা জিতেছে। টাকায় টাকা আনে। বেশি টাকা না খেললে এ টাকাটা উসুল করতে পারত না বোস। দীপ নিজে একটির বেশি দুটি টিকিট কাটার সাহস পায়নি। সামনের লাইনে দু-চারজনের মুখে খুব ফ্যাকফেকে হাসি। একজন চেঁচিয়ে বলছে, আজ ছিল দুইয়ের দিন।
