কিন্তু তাতে দীপের কিছু যায় আসে না। সেই ফ্লোরাতেই বাজি ধরল। এবং জিতল না। বোস সাহেবের ঘোড়াও আর সে মেলায় না। রেসের পর টাকা নেওয়ার সময়েই দেখবে।
চতুর্থ বাজিতে টিকিট কাটতে গিয়ে একটু দ্বিধায় পড়ল দীপ। দু’নম্বরের নাম লাকি ডিপ। কিন্তু পাঁচ নম্বরের নাম মণিদীপ। আশ্চর্য! কিন্তু পাঁচ নম্বর না কেটে দীপ করেই বা কী! মণিদীপারা যে ভারী তেজি হয়।
দীপ সুটকেস সামলে চ্যানেল থেকে বেরিয়ে এল। এবং খানিকটা অবাক হয়ে দেখল, একটা চেনা মুখের লোক হাঁ করে তাকে দেখছে। কে লোকটা?
পরমুহূর্তেই ভারী লজ্জা পায় দীপ। এ যে মেজদা শ্রীনাথ। কতকাল দেখা নেই।
১০. রেসের মাঠে
রেসের মাঠে অবশ্য চেনা লোককেও চেনা দেওয়ার নিয়ম নেই। এই সত্যটা মিস্টার বোসের সঙ্গে রেসের মাঠে এসে এসে বুঝেছে দীপনাথ। তাই সে শ্রীনাথকে দেখে মুখ ফিরিয়ে নেয়। এবং আড়চোখে দেখে, শ্রীনাথও অন্য দিকে চলে যাচ্ছে।
এইভাবেই তারা দুই ভাই দুই দিকে আলাদা হয়ে চলে যেতে পারত এবং দীর্ঘকাল আর তাদের হয়তো দেখা হত না। কিন্তু পরের রেসে টিকিট কাটতে গিয়ে দীপনাথ আর শ্রীনাথ একেবারে আগুপিছু পড়ে গেল। বস্তুত দীপনাথের শাস শ্রীনাথের ঘাড়ে পড়ছে।
তবু কথা বলছিল না দীপ। অন্য দিকে চেয়ে ছিল। টিকিট কেটে বেরিয়ে আসার পর হঠাৎ শ্রীনাথই মুখোমুখি হয়ে জিজ্ঞেস করল, কত নম্বরে ধরলি?
দুই।–খুব লজ্জার সঙ্গে দীপনাথ বলে।
গাধা।–শ্রীনাথের উত্তর।
একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দীপনাথ বলে, বাজে ঘোড়া নাকি?
ঘোড়াই নয়। বললাম তো, গাধা। এসব না বুঝেসুঝে পয়সা নষ্ট করতে আসিস বুঝি?
দীপনাথ মাথা নেড়ে বলে, আমি আসি না। বসের সঙ্গে আসতে হয়।
পরেরগুলো অমন আনতাবড়ি খেলিস না। টিপস দিচ্ছি, টুকে নে।
দীপনাথ দ্বিধা করতে থাকে। তার এমন অনেক টাকা নেই যে নষ্ট করবে। টিপস নেওয়াই হয়তো ভাল। শ্রীনাথ এসব হয়তো তার চেয়ে বেশিই বোঝে। সে বলল, টুকতে হবে না। বলল, আমার মনে থাকবে।
শ্রীনাথ সে কথায় কান না দিয়ে একটা বাতিল টিকিটের পিছনে ডটপেন দিয়ে কয়েকটা নম্বর লিখে তার হাতে দেয়। বলে, বিলুদের খবর কী? প্রীতমের নাকি অসুখ! তোর বউদি বলছিল।
খুব অসুখ। হয়তো বাঁচবে না।
কথাটা শুনে শ্রীনাথ একটু কেমন হয়ে যায় যেন। বলে, কী অসুখ? ক্যানসার নাকি?
না। হাড়ের ভিতরে আর নার্ভে ইনফেকশন। ডাক্তার কিছু ধরতে পারছে না।
চিকিৎসার কী হচ্ছে?
যা হওয়ার সবরকম হচ্ছে। আকুপাংচারও।
পরের রেসটা শুরু এবং শেষ হল। তুমুল হট্টগোলেও দুই ভাই তেমন উত্তেজিত হল না। কিন্তু বোর্ডে নম্বর উঠলে দু’জনেই পুতুলের মতো টিকিটের নম্বর মিলিয়ে নিল। দীপ জেতেনি। কিন্তু শ্রীনাথের মুখে সামান্য হাসির ফুসকুড়ি গলে যাওয়ায় দীপ বুঝল, মেজদা জিতেছে। সে বলল, প্রীতমকে কোথাও একটু চেঞ্জে নিয়ে যাওয়া দরকার। কাছেপিঠে হলেই ভাল হয়।
এতক্ষণ আড়চোখে দীপনাথের হাতের সুটকেসটা বারবার দেখছিল শ্রীনাথ। হঠাৎ বলল, কোথাও যাচ্ছিস নাকি? হাতে সুটকেস কেন?
না, এটা সারানো হল।
শ্রীনাথকে একটু অন্যমনস্ক লাগছিল দীপনাথের। কোনও দিকেই যেন ঠিক মন নেই অথবা বহু দিকেই মন দিতে হচ্ছে। কথা বলতে বলতে ভিড়ের মধ্যে কার দিকে চেয়ে যেন একটু চোখের ইশারাও দিল।
দীপনাথের মনে হয়, শ্রীনাথের কোথাও একটা গূঢ় পরিবর্তন ঘটেছে। চালচলতির মধ্যেই একটা উড়ুউড় ভাব।
শ্রীনাথ আনমনে কী একটু ভেবে হঠাৎ বলল, ওদের টাকা-পয়সা কীরকম?
সেটা এখনও কোনও দুশ্চিন্তার বিষয় নয়। অফিস থেকে প্রীতম বেশ কিছু টাকা পেয়েছে।
শ্রীনাথ ভ্রু কুঁচকে বলল, গত বছরই তো ভাইফোঁটা নিয়ে এলাম। বিলু সেবার মস্ত মস্ত গলদা চিংড়ি আনিয়েছিল, চল্লিশ না পঞ্চাশ টাকা কেজি। তখনও খারাপ কিছু দেখিনি প্রীতমের।
গত বছর! ভুল বলছ। গত বছর নয়, তার আগের বার।
তাই নাকি? হতে পারে। বিলুর সদ্য একটা মেয়ে হয়েছিল তখন। সেটা তখনও খুব ছোট। আর কিছু হয়েছে তার পরে?
না। তুমি বহুকাল যাও না বিলুর বাসায়।
এবার একদিন যাব।
দীপ একটু রাগ করে বলল, রেসের মাঠ পর্যন্ত আসতে পারলে। বিলুর বাসা আর কত দূর! এখান থেকে ভবানীপুর তো হেঁটেই যাওয়া যায়।
শ্রীনাথ একটু হাসল। একসময়ে সে সুপুরুষ ছিল। বয়েসকালে আবার চেহারাটা জেল্লা দিচ্ছে। তবে বড়ই নরম পৌরুষহীন চেহারা। কিন্তু হাসলে চেহারার জেল্লা ভেদ করে একটা বিষণ্ণতা যেন ফুটে বেরোতে চায়। বলল, এই পথটুকু পার হওয়া যে কত শক্ত!
পুতুলের মতোই নিজেদের অজান্তে পরের রেসটার জন্য টিকিট কাটতে কাউন্টারে এসে দুই ভাই দাঁড়ায়। দীপনাথ বলে, ওটা কোনও কাজের কথা নয়। একটা লোক মরতে চলেছে, তাকে এই বেলা একবার শেষ দেখাও তো দেখে আসতে হয় মেজদা। নইলে কথা থাকবে।
যেতেই হবে!–দীর্ঘশ্বাস ফেলে শ্রীনাথ বলে।
দীপনাথ শ্রীনাথকে নিশ্চিন্ত করার জন্য খুব সাবধানে বলল, ওদের টাকা-পয়সার বা অন্য কোনওরকম হেলপ দরকার নেই। জাস্ট মাঝে মাঝে গিয়ে একটু মনোবল বাড়িয়ে আসা আর কী! প্রীতমটা বেঁচে থাকার জন্য কত যে আকুলি-বিকুলি করে।
শ্রীনাথ আবার একটু হাসে। বলে, টাকাপয়সার দরকার হলে দিতে ভয় পাব নাকি?
আমি সেভাবে বলিনি।
দূর বোকা! আমিও সেভাবে বলছি না। আসলে আমার যেটুকু আছে তা নিতান্তই আমার। সে অবশ্য সামান্যই। দাদার টাকা তো আর আমার নয়। তোর বউদির। আমারটুকু আমি দিতে পারি।
