অন্ধকার থেকে বাইরের উজ্জ্বল রোদে এলে মণিদীপার চেহারাটা যেন আরও ক্ষুরধার হয়ে ওঠে। পরনে রং-চটা নীল জিনস, গায়ে একটা হলদেটে খাটো টি-শার্ট, বাঁ হাতে গালা দিয়ে তৈরি মোটা একটা বালা, ডান হাতে ঘড়ি। কিন্তু এই নির্মোকের ভিতরে মণিদীপাকে সুন্দর না কুৎসিত দেখাচ্ছে সে বিচার এখন দীপের কাছে বাহুল্য মাত্র। পোশাকের চেয়ে এখন বহুগুণ বেশি আক্রমণাত্মক হয়ে দাঁড়িয়েছে মেয়েটির ব্যক্তিত্ব।
দীপ তার অসফল জীবনের ব্যাকগ্রাউন্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে মেয়েটির চোখে চোখ রাখারই সাহস পাচ্ছিল না। আড়চোখে দেখে, শ্যামল দিঘল চেহারা ও কমনীয় সুশ্রী মুখের মেয়েটি যেন তার যাবতীয় বাঙালিয়ানা আর মেয়েলিপনা ঝেড়ে ফেলে বেপরোয়া দাঁড়িয়ে আছে। এত নির্ভয় হাবভাব দীপ কোনও মেয়ের মধ্যে দেখেনি।
মার্কেটের চাতালে কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে ভ্রু কুঁচকে চারদিকে চাইলেন মণিদীপা। কার পার্কে বোস সাহেবের পুরনো মরিস গাড়িটা ধূলিধূসর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ওপেক রাষ্ট্ররা তেলের দাম বাড়ানোর পর থেকে বোস নিজের গাড়ি আর গ্যারাজ থেকে পারতপক্ষে বের করেন না। অফিসের গাড়িই ব্যবহার করেন। মণিদীপা রাস্তা পেরিয়ে গিয়ে গাড়ির লক করা দরজা খুললেন।
ভদ্রতাবশে দীপ কাছে গেল। দাঁড়িয়েও রইল। কিন্তু কিছু বলার ছিল না বলে কথা বলল না।
মণিদীপা একরকম কঠিন মুখ করে সামনের দিকে চেয়ে থেকে গাড়ি ছাড়লেন।
আস্তে আস্তে হেঁটে দীপনাথ চাদনির দিকে ফিরে আসে। হঠাৎ খেয়াল হয়, মিসেস বোসকে চেকটা দেওয়া হল না। উনিও চাইলেন না।
ভারী অন্যমনস্ক বোধ করে দীপ। রাস্তাঘাট কিছুই খেয়াল করে না। এক রিমোট কন্ট্রোলে চালিত হয়ে সে বিপজ্জনক রাস্তাঘাট পেরোয় এবং নানু মিয়ার দোকানে এসে কাঠের টুলে বসে অপেক্ষা করতে থাকে। সুটকেসটা সারাই করতে আরও একটু সময় লাগবে।
দীপ ভাবতে ভাবতে হঠাৎ বুঝতে পারে, মিস্টার বোস তাকে হয়তো খামোখা শুধুমাত্র তার বউকে হেলপ করার জন্য নিউ মার্কেটে পাঠাননি। তাকে দেখে মণিদীপাও খামোখা রেগে যায়নি। এই দুইয়ের মধ্যে তার বোধের অগম্য কোনও যোগসূত্র থাকতে পারে।
ঢাউস সুটকেসটা নিয়ে প্রায় দমসম হয়ে রেসের মাঠে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই দীপ লম্বা দৈত্যের মতো বোস সাহেবের মুখের বিরক্তিটা লক্ষ করে। গেটের কাছেই ধৈর্যহীনভাবে দাঁড়িয়ে আছেন। দীপের দিকে একবার অবহেলায় চেয়ে দেখে বললেন, ফার্স্ট রেস এখুনি শুরু হবে।
দীপ দুঃখিত মুখে বলে, সারাই করতে অনেক সময় লাগল। বাসেও ভিড় ছিল।
ট্যাক্সি নিলেই তো পারতেন।
খুঁজেছি। পেলাম না।
কথাটা ডাহা মিথ্যে। ট্যাক্সি খুঁজলে হয়তো সত্যিই পাওয়া যেত না। কিন্তু দীপ ট্যাক্সির চেষ্টাই করেনি। কারণ, ট্যাক্সি ভাড়া কে দেবে সেটা স্পষ্ট নয়। এমনকী গ্র্যান্ড স্ট্যান্ডে ঢোকার টিকিটের দামটা নিয়েও সে দুশ্চিন্তা করছে।
বোস হিপ পকেট থেকে আনকোরা নতুন এক বান্ডিল দশ টাকার নোট আর একটা প্যাডের কাগজ বের করে দীপের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে, খুব তাড়াতাড়ি করুন। বেটিং কাগজে লেখা আছে, একটু দেখে কাটবেন।
দীপ এ কাজে নতুন নয়। মাথা নাড়ল এবং সুটকেসটা নিয়েই কাউন্টারের দিকে দৌড়োল। লাইনে দাঁড়িয়ে কাগজটা আড়চোখে দেখে নেয় সে। সব কটা রেসেই আলাদা করে উইন আর প্লেস খেলছেন বোস সাহেব। ট্রেবল-টোট আর জ্যাকপটের বাছাই রয়েছে পাঁচটা করে। টাকা থাকলে কী দেদার ওড়ানো যায়!
সরু চ্যানেলে সুটকেসটা নিয়ে ভারী অসুবিধে হচ্ছিল। সামনের ও পিছনের লোকেরা তাকাচ্ছে। বিরক্তও হচ্ছে। কিন্তু দীপের কিছু করার নেই। সে পরিষ্কার বুঝে গেছে, লোকলজ্জা জিনিসটার কোনও মানেই হয় না। তার যা কাজ তা তাকে কারও পরোয়া না রেখেই করে যেতে হবে।
দীপ বোস সাহেবের কাগজ দেখে টিকিট কাটল। তারপর পকেট থেকে টাকা বের করে নিজের জন্যও একটা উইন কাটল। দু’নম্বর ঘোড়ার নাম মালকা। নামটা পছন্দ হল দীপের। নইলে ঘোড়ার সে কিছুই বোঝে না।
বোস সাহেবের সঙ্গে এখন আর দেখা করার দরকার নেই। একদম রেসের পর দেখা হলেই হবে। তাকে শুধু কাগজ দেখে টিকিট কেটে যেতে হবে।
রেস দেখার জন্য স্ট্যান্ডে গেল না দীপা মজবুত সুটকেসটা এক জায়গায় দাঁড় করিয়ে তার ওপর বসে একটু দম নিল। এই শীতের দুপুর আর তেমন শীতল নয়। তার বেশ ঘাম হচ্ছে। নিজামে ঢুকে রোল খেয়েছিল সস্তায়, এখন সেই রোলের উদগার উঠল একটা। কিন্তু বস্তুত তার পেটে এখনও যথেষ্ট খিদে আছে। দুপুরে ভাত না খেলে সে কোনওদিনই স্বস্তি বোধ করে না।
প্রথম রেসের ঘোড়াগুলিকে দেখতে পেল না দীপ। ভিড়ের মাথা টপকে জকিদের টুপিগুলিকে ছুটে যেতে দেখল শুধু। প্রচণ্ড চেঁচানিতে কান ঝালাপালা। নিস্তেজ হয়ে বসেই রইল দীপ। শুনতে পেল, কিং আরথার বাজি মেরেছে। সে জেতেনি, বোস সাহেবও নন।
দ্বিতীয় রেসের টিকিট কাটতে গিয়ে নিজের জন্য আবার দু’নম্বরই কাটে দীপ। ঘোড়ার নাম স্পার। স্পার কথাটার মানেই জানে না সে। তবু সেই অচেনা নামের ঘোড়ায় সে তার মহার্ঘ টাকা বাজি রেখে মনে মনে বলল, কোনও ঘোড়াই তো চিরকাল হেরে যায় না। একদিন না একদিন একবার হলেও জেতে।
কিন্তু স্পর জিতল না। তবে বোস সাহেবের উইন লেগে গেল এবার।
তৃতীয় রেসেও দু’নম্বর ঘোড়ায় নিজের বাজি ফেলল দীপ। যা থাকে কপালে, আজ লাগাতার দু’নম্বরেই খেলে যাবে। এবার দুনম্বরের বামটাও সুন্দর। ফ্লোরা। লাইনে তার সামনের লোকটাও বোধহয় ফ্লোরাই কাটবে। কারণ সেই লোকটার সামনে আর-একজন মুখ ফিরিয়ে বলল, ফ্লোরার ওপর ধরছিস! ওর কি আগের দিন আর আছে! ফ্লোরার টাকা অনেক খেয়েছি, কিন্তু আর ও টাকা দেবে না।
