দীপ ধমক দিয়ে বলে, চোপ শালা! ওসব বললে মুখ ভেঙে দেব। জানো না, আমি চব্বিশ ঘণ্টার চাকর! ডিউটি করছি।
ডিউটি? না কি রথ দেখা আর কলা বেচা। ভাঁড়িয়ে না বাপ, সব বুঝি। এই ঘুটঘুটে লোডশেডিং-এ খড়ের গাদায় সুঁচ খোঁজার যে জোস দেখছি তোমার, তার পিছনে কেবল ডিউটি আছে বললে ঘোড়ায় পর্যন্ত হাসবে।
দূর গাড়ল। মিসেস বোসকে নিয়ে ভেবে ফালতু লাভ কী? একে বড়লোকের বউ, তার ওপর চাবুকের মতো তেজি মেয়ে। আমার মতো ম্যান্তামারাকে পাত্তা দেবে নাকি? স্বপ্নের পোলাও আমি খাই না হে।
রাখো রাখো! মেয়েছেলে ইজ মেয়েছেলে। সে যেমনই হোক, আর যারই বউ হোক। পুরুষের আবার অত কাণ্ডজ্ঞান থাকে নাকি? যার থাকে তার থাকে, কিন্তু তোমার অন্তত নেই।
আমার মন অত নরম নয়। এই তো দেখলে সেদিন দশ-বারো বছরের পুরনো সিগারেটের নেশা, কেমন ছেড়ে দিলাম। ভিতরের ইস্পাতে একটুও মরচে পড়েনি।
যত যা-ই বলল, আমার খুব ভাল ঠেকছে না। মেয়েছেলেটাও ইদানীং তোমাকে একটু একটু নজর করছে। চাকরির কথা ভেবে সাবধান থেকো। গ্যাড়াকলে পড়ে গেলে বোস তোমাকে ঘোল খাইয়ে ছাড়বে।
আরে না না। বলতে বলতে দীপ আবছায়ায় একটা মুঠো গয়নার দোকানের সামনে মিসেস বোসের মতো একজনকে দেখতে পেয়ে খুব কাছে এগিয়ে গিয়ে প্রায় ঘাড়ে শ্বাস ফেলে বলল, মিসেস বোস?
মহিলা মুখ ফেরালেন।
দীপ বলল, সরি।
গলির পর গলি খুঁজে যাচ্ছে দীপা পাচ্ছে না।
তার ভিতরকার দুর্বাসাটা অক্রূর-সংবাদ দিল, লোডশেডিং বলে কেটে পড়েনি তো? খামোখা নাকাল হোচ্ছ খুঁজে খুঁজে।
উহু! দীপ মাথা নেড়ে ভাবে, অন্ধকারে ভয় খাওয়ার মেয়ে নয়।
মার্কেটের মাঝমধ্যিখানে গোল চত্বরটায় দাঁড়িয়ে দীপ চারদিকে গলির মুখের দিকে চিন্তিত চোখে ঢায়। স্ট্র্যাটেজি ভাবে।
ভিতরকার দীপ খুব হাসে, মিসেস বোসকে খোঁজার জন্য যে পরিমাণে হামলে পড়েছ তাতে মনে হচ্ছে না পেলে হার্টফেল করবে। তবে আমি তোমাকে বরং একটা টিপস দিই বুন্ধুরাম। বাইরে গিয়ে কার-পার্কটা খোঁজো। যদি বোসের অফিসের গাড়িটা দেখতে পাও তবে সেখানে একদম স্ট্যাচু হয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নিজের নাড়িটা বরং দেখো।
দীপ লম্বা পায়ে দক্ষিণের ফটকের দিকে এগোল। তড়িঘড়িতে কোনওদিকে নজর করছিল না। কিন্তু ভাগ্য সহায়। আচমকাই একটা হ্যাজাকের আলোয় সামনের দোকান থেকে হাতে মস্ত বেতের বাস্কেট ঝুলিয়ে বেরিয়ে এলেন মিসেস বোস। পরনে জিনস আর কামিজ।
দীপের বুকের মধ্যে একটা ব্যাং হঠাৎ তার স্থবিরতা ঝেড়ে ফেলে মস্ত এক লাফ মারল।
মিসেস বোস!–দীপের গলা কাঁপছে।
আরে! আপনি এখানে?
আপনার খোঁজেই।
মিসেস বোসের হাত থেকে বাস্কেটটা নেওয়ার জন্য হাত বাড়ায় দীপ। উনি বাস্কেটটা সরিয়ে নিয়ে বলেন, আই নিড নো হেলপ। আমার খোঁজে আপনাকে কে পাঠাল? মিস্টার বোস নাকি?
আর কে!–দীপ যতদূর সম্ভব অধস্তনের মতো বিনয়ী হেসে বলে।
অন্ধকারটা দীপের চোখে সয়ে গেছে। হ্যাজাকের আলোটাও বেশি চোখ ধাঁধাচ্ছে না। কাজেই আলো-অন্ধকারের সমস্যায় দীপ আর পীড়িত নয়। মিসেস বোসের ভ্রু-র ভাঁজ স্পষ্টই দেখতে পেল সে। এবং ভয় পেল।
তবে ভ্রু কুঁচকেও মিসেস বোস হেসে ফেললেন। বললেন, এটা স্পাইং নয় তো! ফিনানসিয়াল অফেনস ধরার জন্য মিস্টার বোস হয়তো আপনাকে লাগিয়েছেন।
না, না। আমি জাস্ট হেলপ করতে এসেছি।
মিসেস বোস মাথা নেড়ে বলেন, আমার হেলপ দরকার নেই। আমি ওয়ার্কিং উয়োম্যান। নিজেকে আমি শ্রমিক বলে মনে করি।
দীপ বলল, তা হলে মিস্টার বোসকে সেই কথাই বলব তো? আপনি আমার সাহায্য নেননি।
যা খুশি বলবেন। সেটা আপনার ভাববার কথা।
মিসেস বোস চোখে পরকলাটা পরেননি। পরলে ভাল হত। বাগডোগরার পর থেকে মিসেস বোস সম্পর্কে খুব সচেতন হয়ে পড়েছে দীপ। এতকাল তেমন লক্ষ করেনি, কারণ মিসেস বোসও লক্ষ করেননি তাকে। এখন দীপ টের পায়, মিসেস বোসের চোখে একটা অত্যন্ত শানিত এবং সৌজন্যহীন কঠিন দৃষ্টি রয়েছে। ইচ্ছে করলে উনি খুবই অভদ্র হতে পারেন।
দীপ একটু নিভে যায় মনে মনে। ম্লান মুখে বলে, শ্রমিক তো আমিও।
মিসেস বোস হাতের বাস্কেটটা দোলাতে দোলাতে দক্ষিণের ফটকের দিকে হাঁটছিলেন। পিছনে পিছনে বশংবদের মতো দীপ। মিসেস বোস মাথা ঝাঁকিয়ে বব চুলের ঝাপটা মেরে বললেন, কক্ষনও আপনি শ্রমিক নন। খাঁটি শ্রমিক হলে আপনাকে শ্রদ্ধা করতাম। আপনি হলেন মিস্টার বোসের কোর্ট জেস্টার, যাকে পারিষদ বলে।
রাগ অভিমান ইত্যাদি বহুকাল হল দীপের নেই। তার আদ্যন্ত চিন্তা হল টিকে থাকার। নানা ঘষটানিতে তার অনেক ফালতু জিনিস ভোতা হয়ে গেছে। কাজেই এ কথায় সে অপমান বোধ করল না! বলল, কথাটা হয়তো ঠিক। কিন্তু আমার পজিশনে না থাকলে আমার প্রবলেমটাও বোঝ যাবে না মিসেস বোস।
মিসেস বোস ঘাড় ফিরিয়ে দীপের দিকে তীক্ষ নজরে এক ঝলক তাকালেন। তারপর গম্ভীরভাবে বললেন, যদি আমাকে নিতান্তই সম্বােধন করতে হয় তবে দয়া করে আমার নাম ধরে ডাকবেন। আমার নাম মণিদীপা। নিজেকে আমি মিসেস বোস বলে ভাবতে ভালবাসি না। আমাকে যারা চেনে তারা সবাই মণিদীপা বলে ডাকে। মিসেস বোস বলে নয়।
দীপ একটু থমকায়। তারপর আস্তে করে বলে, আমার পক্ষে সেটা একটু বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে কি? মিস্টার বোসই বা কী ভাববেন?
মণিদীপা কঠিন স্বরেই বলেন, আপনি শ্রমিক নন, স্লেভ। বন্ডেড লেবারার। শ্রমিকদের আত্মমর্যাদা আপনার চেয়ে হাজার গুণ বেশি। তবু আপনাকে বলে দিচ্ছি, যদি মণিদীপা বলে ডাকতে পারেন তবেই ডাকবেন। নইলে সম্বােধন করার দরকার নেই।
