কৌতূহলবশে সুটকেসটা খুলল দীপ। ভিতরটা ভেলভেটের মতো নরম কাপড় দিয়ে ঢাকা, গভীর বেগুনি তার রং, অনেকগুলো পকেট রয়েছে নানা মাপের। দীপনাথ লোভী নয়, চোর নয়। তবু তার আঙুল প্রতিটি পকেটের ভিতর খুঁজতে লাগল। কী খুঁজছে তা সে জানে না। একেবারে সামনের দিকে লম্বা পকেটটাতে তার আঙুল একটুকরো কাগজ চিমটি দিয়ে তুলে আনল।
একটু অবাক হয়ে দীপনাথ দেখে মিসেস বোসের সই করা একটা বেয়ারার চেক। টাকার অঙ্ক লেখা আছে আড়াই হাজার। কে একজন স্নিগ্ধদেব চ্যাটার্জির নামে লেখা হয়েছে। চেকটা অবশ্য ব্যাংক থেকে ফেরত দিয়েছে। লাল কালি দিয়ে আগাগোড়া চেকটাকে আক্রোশভরে কেটে দিয়েছে কেউ। দীপনাথ চেকটা পকেটে রেখে দিল।
সকালের দিকে বোস সাহেবকে তার বাড়িতে রোজ একটা ফোন করার নিয়ম আছে। কোনও কাজ থাকলে বোস সাহেব তা ফোনেই বলে দেন।
আমহার্স্ট স্ট্রিট পোস্ট অফিস থেকে দীপ ফোন করতেই মিসেস বোসের গলা পাওয়া গেল। গলাটি মিষ্টি বটে, কিন্তু বেশ ঝাঁঝালো।
দীপনাথ সবিনয়ে বলে, আমি দীপ।
বুঝেছি। মিস্টার বোস এইমাত্র বাথরুমে গেলেন।
দীপনাথ আড়চোখে ঘড়ি দেখে। এ সময়ে বোস সাহেবের বাথরুমে যাওয়ার কথা নয়। ঘড়ির কাঁটায় চলা মানুষ। বাথরুমে থাকেন আটটা থেকে সওয়া আটটা। এখন সাড়ে আটটা বাজছে প্রায়।
দীপ মৃদু স্বরে বলে, আজ যেন একটু ইররেগুলার হলেন মিস্টার বোস।
ওপাশে মিসেস বোস থমথমে গলায় বললেন, হ্যাঁ। কয়েকজন ভিজিটর এসে পড়েছিল বলে দেরি। আপনি কি একটু ধরবেন?
দীপনাথ সংকোচের সঙ্গে বলে, আমি ডাকঘর থেকে ফোন করছি। এখানে তো বেশিক্ষণ লাইন আটকে রাখতে দেবে না।
উঃ, আপনার যে কত প্রবলেম দীপনাথবাবু! ঠিক আছে, আপনি না হয় পরে ফোন করবেন।
শুনুন মিসেস বোস, আপনাদের সুটকেসটার মধ্যে একটা জিনিস ছিল।
কী জিনিস? দামি কিছু?
না। স্ক্র্যাপ একটা চেক। স্নিগ্ধদেব চ্যাটার্জির নামে দেওয়া আপনার সই করা চেক।
হঠাৎ খুব কঠিন হয়ে গেল মিসেস বোসের কণ্ঠস্বর। বললেন, আপনি সুটকেসটা খুলেছিলেন কেন?
দীপনাথ একটু হাসল আপনমনে। বলল, সারাতে হলে মিস্ত্রিরাও তো খুলবে। তাই আমি আগেভাগে দেখে নিচ্ছিলাম, ভিতরে কিছু রয়ে গেছে কি না।
ও। ঠিক আছে।
চেকটা কী করব?
স্ক্র্যাপ চেক যখন, ফেলে দিন।
বলেই পরমুহূর্তেই মিসেস বোস হঠাৎ তীক্ষ্ণ গলায় বললেন, না, না। শুনুন, চেকটা আপনি নিজে নিয়ে এসে আমাকে দেবেন। প্লিজ, হারিয়ে ফেলবেন না।
আচ্ছা।
ফোন রেখে রাস্তার মোড়ের কাছে স্টার সেলুনে দাড়ি কামিয়ে নিতে বসে নিমীলিত চোখে আয়নায় নিজের সাবানের ফেনায় অর্ধেক ঢাকা মুখের দিকে চেয়ে দীপ ভাবে, মিসেস বোস খুব সাবধানি মেয়ে। চেকটা দীপ নষ্ট করে নাও ফেলতে পারে এবং সেটা দিয়ে কোনওদিন মিসেস বোসকে ব্ল্যাকমেল করতেও পারে, এই ভয়েই না ফেরত চাইল! আজকাল মানুষ মানুষকে একদম বিশ্বাস করে না।
দীপ স্নিগ্ধদেব চ্যাটার্জির একটা কাল্পনিক চেহারা ভাবতে চেষ্টা করল। নামটাই এমন মোলায়েম এবং দেবত্বে ভরা যে, যতবার চোখ বুজল ততবার শিবনে এক জটাধারী পুরুষকে দেখতে পেল। নিশ্চয়ই ওরকম নয় আসল স্নিগ্ধদেব। সম্ভবত পায়জামা পাঞ্জাবি পরা দাড়িওলা, রোগা ও রগচটা এবং ভীষণ পড়াশুনো জানা কোনও উগ্রপন্থী যুবাই হবে। মিসেস বোসের একটা পলিটিক্যাল লাইন আছে, সে জানে। কিন্তু কিছুতেই স্নিগ্ধদেবকে মিসেস বোসের গোপন প্রেমিক বা জার বলে মনে হয় না। কারণ, মিসেস বোস ওরকম নয়। গোপনতার ধারও ধারে না। যা চায় তা মুখ ফুটে চাইতে জানে। দরকার মতো স্বামীকে ছেড়ে চলে যাওয়ার মতো যথেষ্ট হিম্মত আছে। না, মিসেস বোসের চরিত্রের সঙ্গে গুপ্তপ্রেম ব্যাপারটা একদম খাটে না। তবু কোথাও একটা গোপনীয়তা আছেও। নইলে শেষ মুহূর্তে চেকটা অত আকুলভাবে ফেরত চাইত না।
দীপ যখন চাঁদনি চওকে পৌঁছোল তখন বেলা সাড়ে ন’টা। নানু মিয়ার দোকানে সুটকেসটা জমা করে বেরোল আবার ফোন করতে। মিস্টার বোস এতক্ষণে অফিসে এসে গেছেন।
ফোন ধরেই মিস্টার বোস বলেন, আজ শনিবার খেয়াল আছে তো?
হ্যাঁ।
আপনি বেলা একটার মধ্যে রেসের মাঠে পৌঁছে যাবেন। আজ অফিসে আসার দরকার নেই। আর শুনুন মিসেস বোস নিউ মার্কেটে গেছেন। যদি অসুবিধে না হয় তা হলে গো দেয়ার অ্যান্ড ট্রাই টু বি সাম হেলপ টু হার।
আচ্ছা।–বলতে গিয়ে দীপ অনুভব করে একটা অদ্ভুত আনন্দে তার গলাটা হঠাৎ কাঁপছে।
বোস ফোনেই একটু শ্লেষের হাসি হেসে বলেন, বেটার ট্রাই টু রেসট্রেন হার ফ্রম বায়িং থিংস। ও কে?
ও কে।
বোস ফোন রেখে দেন।
চাঁদনি চক থেকে নিউ মার্কেটে লম্বা পায়ে এক লহমায় পৌঁছে যায় দীপ। কিন্তু ভারী হতাশ হয়ে দেখে, নিউ মার্কেটে ঘুটঘুট করছে অন্ধকার। লোডশেডিং-এর মধ্যে টিমটিমে মোম জ্বলছে মাত্র। এই আলোয় কাউকে চিনে বের করা খুবই মুশকিল।
দীপ পরিস্থিতিটা একটু ধীর স্থিরভাবে বুঝে নিল। নিউ মার্কেটের গোলকধাঁধায় কীভাবে, কোন প্ল্যানমাফিক এগোলে মিসেস বোসকে খুঁজে বের করা অসম্ভব হবে না সেই স্ট্র্যাটেজিটা ঠিক করে শিকারি বেড়ালের মতো লঘু সতর্ক পায়ে এগোতে লাগল।
দীপের ভিতরে যে আর-একটা দুর্মুখ, দুর্বাসা টাইপের দীপ বাস করে সে ঠিক এই সময়ে প্রশ্ন করল, মিসেস বোসকে খুঁজে বের করার পিছনে তোমার আসল স্বার্থটা কী বলো তো বাপ! নিছক ডিউটি না অন্য কিছু?
