ঘুম ভাঙলেই রোজ আঁশটে, কটু একটা গন্ধ এসে নাকে লাগে। জানালার ধারেই পাড়ার রাজ্যের তরকারির খোসা, মাছের আঁশ, এঁটোকাটা জমা হয়ে থাকে। করপোরেশনের টিনের ঠেলাগাড়ি একটু বেলায় এসে নিয়ে যায়। ততক্ষণ গন্ধটা বেশ তীব্র। তারপরও গন্ধ একটা থাকেই। একতলার ঘর বলে এইসব অস্বস্তি। তবে এখন আর অতটা টের পায় না দীপ। সয়ে গেছে। শুধু এই সকাল বেলায় ঘুম ভাঙলে এখন কয়েকটা শ্বাসে গন্ধ পায়।
দীপনাথ বেশ ভোরেই বিছানা ছাড়ে। আজও গা থেকে কম্বলটা একটু আলসেমিভরে সরিয়ে উঠে পড়ল। কাজ আছে। সাতসকালে রাস্তায় কে কাকে ‘শুয়োরের বাচ্চা’ বলল সেটা বড় কথা নয়, কিন্তু কথাটা শুনে ঘুম ভাঙল বলে দীপনাথের মন থেকে সহজে গেল না সেটা।
কম্বলটা ভাঁজ করে রাখতে গিয়ে দীপনাথের একটু কষ্ট হল মনে। দাদা মল্লিনাথ তাকে এই বিলিতি কম্বলটা দিয়েছিল। ওয়াড় কবে ছিড়ে গেছে, উদ্যোগহীন মল্লিনাথ আর ওয়াড় করায়নি। অযত্নের ব্যবহারে গায়ের ঘষটানিতে রোয়া উঠে ভিতরের বুনোট বেরিয়ে পড়েছে কয়েক জায়গায়, তেলচিটে ময়লা ধরায় সবুজ আর হলুদ চৌখুপিগুলোও আবছা হয়ে এসেছে। আর একটা বা দুটো শীতের পরই ভিখিরি-কম্বল হয়ে যাবে।
কেন কোনও জিনিসেই তার যত্ন নেই? এ কথা ভাবতে ভাবতে দীপনাথ নিজের ওপর বিরক্ত হয়। শিয়ালদার মোড় থেকে কিনে আনা তেতো ও রসাল নিমকাঠি দিয়ে দাঁতন করতে করতে কলঘরে যাওয়ার আগে সে দু’জন চিত ও কাত হয়ে পড়ে থাকা রুমমেটকে দেখে নেয়। একটি নিতান্তই বাচ্চা ছেলে, কলেজে ফার্স্ট ইয়ারে ভর্তি হয়েছে। অন্যজন ফুড ডিপার্টমেন্টের মধ্যবয়সি ইন্সপেক্টর। দীপনাথের সঙ্গে কারওরই খুব একটা ভাব নেই। লেপের তলায় দু’জনেই এখন নিথর। ছাত্রটি উঠবে সাতটা নাগাদ, ইন্সপেক্টর আরও পরে। এখন বাজে পৌনে ছ’টা মাত্র।
ভিতরে একটু দরদালান মতো। দরদালানের শেষে একটু চৌখুপি কাটা একধাপ নিচু করে বাঁধানো চৌবাচ্চার চাতাল। জলের চাপ কম বলে সকলেই আজকাল গ্রাউন্ড-লেভেলের নীচে ঢৌবাচ্চা বানায়।
চৌবাচ্চার ধারে অবশ্য যেতে পারল না দীপ। সেখানে ম্যানেজারের বউ তার ছোট ছেলেকে বড়-বাইরে করাতে বসেছে। দীপ সুতরাং দরজায় দাঁড়িয়ে দাতন চিবোতে থাকে। ম্যানেজারের বউয়ের মুখখানা কোনওদিনই দেখেনি দীপ। বউটি লম্বা ঘোমটা দিয়ে থাকে। কিন্তু আন্দাজ করা যায় বউটি তরুণী এবং দেখতে ভালই। গায়ের রং বেশ ফর্সা। তবে এর মতো নিষ্ঠুর প্রকৃতির মহিলাও হয় না। দু’ঘরের মাত্র ছ’জনকে নিয়ে এই ছোট্ট বোর্ডিং-এর লোকদের ম্যানেজার এমনিতেই যাচ্ছেতাই খাবার দেয়, তার ওপর এই বউটি ইচ্ছে করেই এত খারাপ রাধে যে মুখে দেওয়া যায় না। ফলে কেউই পুরোপেট খেতে পারে না। প্রতিদিনই থাকে রসুন দেওয়া শাক, কলাইয়ের ডাল আর তেলাপিয়া মাছের একটি গাদার টুকরো। দীপনাথ খাওয়ার সময় প্রতিদিনই বমি-বমি ভাব টের পায়। এ দিয়েও হয়তো খাওয়া যেত কিন্তু এই বউটি তা হতে দেয় না। কলাইয়ের ডাল ফোড়ন ছাড়া বেঁধে দেয়, যা খাওয়া সম্ভবই নয়। সর্ষেবাটা আর গুঁড়োমশলা দিয়ে রাঁধা মাছটিও গলা দিয়ে নামানো শক্ত। দীপনাথ প্রায়দিনই বাইরে খেয়ে নেয়। বউটির ঘোমটার আবরু আছে বটে কিন্তু মানবিক লজ্জাবোধটুকু নেই।
দীপনাথ দাঁতন করতে করতে দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে কঠোর দৃষ্টিতে বউটিকে দেখছিল। সে যে অপেক্ষা করছে তা টের পেয়েছে। একবার মুখ ঘুরিয়ে ঘোমটার আড়াল থেকে চকিতে দেখে নিল তাকে, তারপর ন্যাংটো এবং ভেজা ছেলেটাকে দুহাতে আলগা করে শূন্যে তুলে হরিণের পায়ে। পালাল।
প্রাতঃকৃত্যের পর, রুমমেটরা ঘুম থেকে ওঠার আগেই দীপনাথ তার ব্যায়াম সেরে নেয়। নিজেকে ফিট রাখতে হলে এটুকু অবশ্যই দরকার। গোটা ষাটেক বৈঠক আর ত্রিশটা বুকডন, কয়েকটা যোগাসন এবং বুলওয়ার্কার নিয়ে একটু পেশি খেলানো। চল্লিশ মিনিট থেকে এক ঘণ্টা যায়। তা যাক। দীপনাথ জানে, শরীরকে সক্ষম রাখতে গেলে ব্যায়াম ছাড়া পথ নেই। বসিয়ে রাখলেই শরীরে ঘুণ ধরে, আজ গ্যাস অম্বল, কাল রক্তচাপ, হার্টের ব্যামো দেখা দেবেই। শরীরের যত্ন নিতে দীপনাথ ঠেকে শিখেছে। এর আগে মেস বোর্ডিং-এ বার দুয়েক সে শক্ত টাইফয়েড আর হাইপার-অ্যাসিডিটিতে ভুগে বিছানা নিয়েছিল। ফলে শৌখিন শরীর হলে তার চলবে না। দুর্ভাগ্যবশত তার আপনজন বলতে কেউই নেই। দাদা, ভাই বা বোন আছে বটে কিন্তু তাদের সঙ্গে একসাথে বেড়ে ওঠেনি বলে সম্পর্ক তেমন গাঢ় হয়নি। ফলে অসুখ বা বিপদ ঘটলে ভাই-বোনদের কাছে ধরনা দিতে তার লজ্জা করে। নিজের দায়িত্ব তার একেবারেই নিজের। অসুখ হয়ে পড়ে থাকা তার পোষায় না।
ব্যায়ামের পর কাচের গেলাসে ভেজানো কাবলি ছোলা খেয়ে স্টেটসম্যানটা খুলে বসে দীপ। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ে এবং আড়চোখে ঘড়ি দেখে। অফিস টাইমের আগেই বোসের ফাইবার গ্লাসের সুটকেসটা সারাতে চাদনি চক যেতে হবে। সুটকেস সারিয়ে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে অফিসে যাবে। অফিসে তার বাঁধাধরা কাজ নেই। গেলেই হয়। আসলে সে বোস সাহেবের চব্বিশ ঘণ্টার চাকর।
পৃথিবীর খবর খুব ভাল নয়। খবরের কাগজওলারা সেই নিরানন্দ ছবিই তুলে ধরে বারবার। এনার্জি ক্রাইসিস, ইনফ্লেশন, পৃথিবী জুড়ে উগ্রপন্থীদের উৎপাত, দুর্ঘটনা। খবরের কাগজ ভাজ করে রেখে দীপ উঠে পোশাক পরে নেয়। চৌকির তলা থেকে সুটকেসটা বের করে টেনে। ওজনে হালকা হলেও বেশ বড়সড় জিনিস। বাসে-ট্রামে নেওয়া কষ্টকর। বোস এটার জন্য ট্যাক্সির ভাড়া দেয়নি।
