বিলু আনমনে দাঁড়িয়ে আছে। ভ্রূ কোঁচকানো। ভাবছে’ লাবু আবার মুখ তুলে মায়ের মুখটা দেখে। তারপর ডাকে, মা!
উঁ!
লাল আলো জ্বলে গেছে। পেরোবে না?
হুঁ। চলো।–বিলু শক্ত মুঠিতে মেয়ের হাত ধরে রাস্তা পার হয়।
আনমনে হাঁটছিল বিলু। লাবু হঠাৎ হাত টেনে ধরে বলে, মা! জল!
বিলু বিরক্ত হয়। দেখে মাংসের দোকান থেকে অঢেল রক্তমাখা জল ফুটপাথ বেয়ে বয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ায় পিছন থেকে একটা লোক বিলুব ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়তে পড়তে কোনওরকমে সামলে পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে গেল। বিলু মেয়ের চুল টেনে দিয়ে বলে, কতবার বলেছি না, রাস্তায় সভ্য হয়ে চলবে। জল তো কী হয়েছে?
লাবু মায়ের দিকে চেয়ে ভয়ে কাঠ হয়ে যায়। আস্তে করে বলে, জুতোয় লাগবে তো!
জুতোয় নোংরা লাগেই, তাতে কী?
লাবু আর জবাব দেয় না। টুকটুক করে মায়ের পাশে পাশে হাঁটে। আবার হঠাৎ ডাকে, মা।
আবার কী?
ফিতে।
তোমার অনেক ফিতে আছে। আর নয়।
চশমা?
তাও নয়। বায়না করবে না একদম।
লাবু ঘাড় হেলিয়ে রাজি হয়ে গেল।
তাড়াতাড়ি হাঁটো লাবু। বাবা একা রয়েছে।
পায়ে লাগছে।
কী হয়েছে পায়ে?
লাবু থামে এবং হেঁট হয়ে নিজের পায়ের জুতো খুলতে চেষ্টা করে। পারে না। অসহায় মুখে মার দিকে চেয়ে থাকে।
উবু হয়ে স্ট্র্যাপটা খুলে বিলু জুতোর ভিতর থেকে একটা কমলালেবুর বিচি বের করে ফেলে দেয়। বলে, কতবার শিখিয়েছি জুতো পরার আগে ঝেড়ে নিয়ে পরবে! মনে থাকে না কেন?
বিলু দোকান থেকে গুঁড়ো সাবানের প্যাকেট, মাখন, বিস্কুট ইত্যাদি কেনে। তারপর লাবুকে বলে, তুমি একটু বাইরে গিয়ে দাঁড়াও তো লাবু। বেশি দূরে যেয়ো না। সিঁড়িতে রোদ আছে, ওখানে গিয়ে দাঁড়িয়ে রাস্তা দেখো।
লাবু বাধ্য মেয়ের মতো সিঁড়িতে গিয়ে দাঁড়ায়, কিন্তু ঘাড় ঘুরিয়ে চেয়ে থাকে মায়ের দিকে। মা যতক্ষণ টেলিফোনে কথা বলবে ততক্ষণ তাকে দুরে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। সে জানে।
বিলু ফোনে অরুণকে পেয়ে বলে, ওর অ্যাটিচুড কেমন দেখলে?
খারাপ কিছু নয়। মেনে নেবে।
তুমি চলে আসার পর ও চাকরি নিয়ে আবার কথা তুলেছিল। ভারী অবুঝপানা করে। বলে, লাবু বড় হলে চাকরি কোরো। তাই কি হয়?
তুমি রাগ-টাগ দেখাওনি তো!
আমি বুঝি শুধু রাগই দেখাই? তোমরা আমাকে কী ভাবো বলো তো?
এই তো আমার ওপর রাগ দেখাচ্ছ।
তোমার কথা আলাদা।
আলাদা কেন? আমি রিঅ্যাক্ট করি না বলে?
ঠিক তাই। তোমার মতো কম রিঅ্যাকশনারি আমি বেশি দেখিনি।
অরুণ হাসল। বলল, তা হলে আমি তোমার রাগের জিম্মাদার রইলাম। প্রীতমবাবুকে অনুরাগটুকুই দিয়ো।
ছি ছি।
হঠাৎ ছিছিক্কার কেন?
এত বাজে অনুপ্রাস বহুকাল শুনিনি। তুমি না স্মাট ছিলে? রাগের সঙ্গে অনুরাগ মেলানো কি তোমাকে মানায়? শোনো, ও জমি দেখতে রাজি হয়েছে। তুমি কবে ফ্রি হবে বলো তো! গাড়ি নিয়ে সব কটা জমি একদিনে ঘুরে দেখতে হবে।
বিলু, জমি কেনার ডিসিশনটা পাল্টাও আবার বলছি। কে তোমার বাড়ি তৈরির খবরদারি করবে? তার চেয়ে ফ্ল্যাট কেনো।
ফ্ল্যাটেই যদি থাকব তবে তা কিনতে যাব কেন? ভাড়া দিয়েই তো থাকতে পারি।
ফ্ল্যাট কিনলে ভাল পাড়ায় যে মেটিরিয়ালের তৈরি বাড়িতে থাকতে পারবে, জমি কিনে বাড়ি করলে সেটা তো পাবে না। খরচ বেশি, ঝামেলা বেশি।
তবু আলাদা বাড়িই আমার পছন্দ।
তোমার যে এস্টিমেট তাতে জমি কেনার পর দু’খানা ঘর তৈরির টাকাও থাকবে না।
চাকরি করলে টাকা হবে। ধীরে ধীরে করব।
অরুণ একটু চুপ করে থেকে বলে, তুমি হয়তো পারবে। তুমি চিরকালই অন্যরকম ছিলে।
ছাড়ছি।
ফোন রেখে বিলু দেখে, লাবু হাটুর কাছে দাঁড়িয়ে মুখ তুলে চেয়ে আছে। তাকাতেই বলল, একটা পাগল আমাকে ডাকছিল। বিলু সামান্য একটু লজ্জা পেল কি?
লাবু ঘরে ঢুকেই থমকে গেল। বাবা কাত হয়ে শুয়ে আছে। বালিশ থেকে মাথাটা নীচে পড়ে গেছে। বাবার শরীরের ওপর মস্ত পাতা খোলা খবরের কাগজটা পড়ে আছে।
মা বাথরুমে ঢুকে যেতেই খুব আস্তে আস্তে হেঁটে বাবার বিছানার কাছে আসে লাবু। সে জানে, মানুষ মরে গেলে শ্বাস ফেলে না।
লাবু বাবার নাকের কাছে ছোট্ট হাতটা বাড়িয়ে দিল। খুব জোরে জোরে শ্বাস পড়ছে বাবার। সন্তর্পণে খবরের কাগজটা টেনে আনে লাবু। ছোট হাতে অত বড় বড় পাতা ভাজ করতে পারে না। কোনও রকমে ঘুচুমুচু করে দলা পাকিয়ে টেবিলে সরিয়ে রেখে দেয়।
একটু ছোঁবে বাবাকে? ভয় করে। কত রোগা না লোকটা! এত রোগা কেন? এত অসুখ কেন?
প্রীতমের একটা রোগা হাত খাট থেকে বেরিয়ে ঝুলে আছে। লাবু খুব ভয়ে ভয়ে একবার হাতটা ছোয়। ভয় করে। হাতটা ঠান্ডা। কত বড় বড় নখ বাবার হাতে! ভয় করে।
বাবা চুল কাটে না কেন মা?–ভাত খেতে বসে লাবু মাকে জিজ্ঞেস করে।
বিলুর খেয়াল হয়, তাই তো। অনেকদিন প্রীতমের চুল ছাঁটানো হয়নি। সে লাবুর দিকে তাকিয়ে বলে, ও মেয়ে। বাবার দিকে তো খুব নজর তোমার!
০৯. দীপের ঘুম ভাঙল
দীপের ঘুম ভাঙল কানের কাছে ‘শুয়োরের বাচ্চা’ কথাটা শুনে। তার বিছানা ঘেঁষেই জানালা এবং জানালার পাশেই রাস্তা। এখনও ভাল করে আলো ফোটেনি। একেই শীতকাল, তার ওপর বাইরে কিছু কুয়াশা থাকতে পারে। শীতকালে ঘরের জানালা বন্ধ থাকে, মাথার জানালাটা কিছু তফাতে বলে ভোলা। কিন্তু কোনওটা দিয়েই আলো বা হাওয়া আসে না তেমন। অতিশয় ঘিঞ্জি গলির মধ্যে এই ঘর। এখান থেকে সব সময়ে মনে হয়, বাইরে মেঘ করে আছে কিংবা সন্ধে হয়ে এল।
