প্রীতম স্নিগ্ধ হয়ে গেল। দুর্বল হয়ে গেল। মোহাচ্ছন্ন হল। আনমনা গলায় বলল, বিলু কি কোথাও চাকরি পেয়েছে?
একটা ব্যাংকে অ্যাপ্লাই করেছিল। পেয়ে গেছে।
আমাকে বলেনি।–দুঃখের সঙ্গে বলে প্রীতম।
অরুণ কথাটার জবাব দেয় না। শুধু হাসে।
অরুণ চলে যাওয়ার পর প্রীতম বিলুকে ডেকে বলে, তুমি চাকরি পেয়েছ, আমাকে বলোনি কেন?
বিলু প্রীতমের দিকে খুব সহজ চোখে তাকাল, আর সেই দৃষ্টি দেখেই প্রীতম বুঝল, বিলু কস্মিনকালেও তাকে ভয় খায় না। অরুণ এমন সুন্দর সাজিয়ে বানিয়ে মিছে কথা বলে!
বিলু জবাব দেয়, বললে তো তুমি খুশি হবে না। কিন্তু চাকরির এখন দরকার।
অ্যাকাউন্ট্যান্ট প্রীতম টাকার হিসেব জানে। তাই রোগা দুর্বল হাতে মাথার লম্বা চুল একটু পাট করতে করতে বলে, সেটা বুঝি। কিন্তু লাবু আর-একটু বড় হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করলে না বিলু?
ততদিন কি আমারই চাকরির বয়স থাকবে? না কি ইচ্ছে করলেই এই বাজারে চাকরি পাওয়া যাবে?
চাকরি নেওয়ার আগে আমাকে জিজ্ঞেস করলে না একবার?
বিলু ভ্রু কুঁচকে বলে, এখনও নিইনি। তোমার অসুবিধে হলে না হয় নেব না।
কথাটায় ঝাঁঝ ছিল। প্রীতম কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েছিল, ভাবাবেগ আসছিল। সেটা সামলে নিতে পারল। বলল, রাগ কোরো না। টাকার হিসেব আমি কারও চেয়ে কম বুঝি না। আমার জন্যও অনেক খরচ হচ্ছে। জমানো টাকা আর কত আছে?
খুব বেশি নেই।–বিলু অন্যদিকে চেয়ে বলল, যা আছে তা দিয়ে একটা ছোটখাটো বাড়ি একটু শহরের বাইরের দিকে হয়ে যেতে পারে।
তুমি বাড়ি করার কথা ভাবছ?
তুমি বারণ করলে ভাবব না। কিন্তু এইবেলা কিছু না করলে টাকাটা খরচ হয়ে যাবে।
বাড়ি করার কথা আমি কখনও ভাবিনি।
কেন ভাবোনি? সবাই তো এসব ভাবে।
শিলিগুড়িতে আমাদের একটা বাড়ি তো আছে।
বিলু কথাটার জবাব দিল না। কিন্তু মুখে একটা কঠিন ভাব ফুটে উঠল।
প্রীতম সবই জানে। বিলু কোনওদিন শিলিগুড়ি যাবে না। ও বাড়িটাকে সে নিজের বাড়ি বলে ভাবতেও পারে না। প্রীতম একটা সত্যিকারের দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, জমিটমি দেখেছ?
দেখিনি। তবে দু-একটা খবর পেয়েছি। অরুণের ছুটির দিন দেখে তোমাকে নিয়ে একসঙ্গে সবক’টা দেখে আসব ভেবে বেখেছি।
আমি জমির কিছু বুঝি না। তোমরা থাকবে, তোমাদের পছন্দ হলেই হল।
কেন, সেই বাড়িতে তুমিও তো থাকবে।
প্রীতম এই কথায় বিলুর দিকে বড় বড় চোখে তাকিয়ে দেখে। হঠাৎ মনে হয়, তাকে ভুলিয়ে রাখার জন্য বিলু আর অরুণ আড়ালে কোনও ষড়যন্ত্র করছে না তো! প্রীতমের ঠোঁটে জবাবটা ঝুলছিল, যদি ততদিন পৃথিবীতে থাকি। কিন্তু অত সহজ ভাবপ্রবণতার কথা বলল না প্রীতম। ভাবের ঘোরে ভেসে গিয়ে লাভ নেই। তার বড় শক্ত লড়াই।
তাই প্রীতম স্বাভাবিকভাবে বলে, ঠিক আছে। যাব।
বিলু একটু যেন সংকোচের সঙ্গে বলে, এসব টাকা-পয়সা বা বাড়ির কথা বলতে আমার খারাপ লাগে। তুমিও হয়তো খুশি হও না। কিন্তু ভাল না লাগলেও তো ভবিষ্যতের কথা ভাবতে হয়।
এত তাড়াতাড়ি ভবিষ্যতের কথা ভাবতে হবে তা কখনও চিন্তা করিনি।
বিলু কঠিন মুখে চুপ করে থাকে।
প্রীতম হাসে একটু। আশপাশ থেকে রেডিয়োতে দূরাগত একটা ক্রিকেট খেলার ধারাবিবরণীর শব্দ আসছে। প্রীতম নিজের পাজামায় ঢাকা পা দু’খানা দেখতে থাকে। ইডেনে টেস্ট খেলা দেখে দু’বছর আগেও সে হেঁটে ভবানীপুর ফিরেছে।
বিলু মৃদু স্বরে বলল, আমি লাবুকে নিয়ে কেনাকাটা করতে বেরোচ্ছি। বিন্দু রইল।
প্রীতম চোখ বন্ধ করে হুঁ দিল।
ভালবাসা থাক বা না থাক, বিলু বাড়িতে না থাকলে প্রীতমের বড় ফাঁকা আর নিরর্থক লাগে।
বিলু চলে গেলে প্রীতম বিন্দুকে ডেকে খবরের কাগজটা চাইল। কাগজ মুখের সামনে মেলে ধরে শূন্য চোখে চেয়ে রইল খানিকক্ষণ। কিছুতেই মন দিতে পারল না।
পা দুটো ঝিন ঝিন করছিল। আজকাল প্রায়ই এটা হয়। অনেকক্ষণ ধরে কুঁচকি থেকে পাতা পর্যন্ত পা দুটোয় ঝিঝি ছাড়তে থাকে। প্রীতম তার অস্ত্রশস্ত্রের জন্য হাত বাড়ায়। নিরন্তর শরীরের সঙ্গে তার লড়াই। তাকে তো বাঁচতেই হবে। অসহনীয় ঝিনঝিন অনুভূতিটাকে সহনীয় করতে সে প্রাণপণে চোখ বুজে সেতারের বাজনার শব্দ মনে আনতে থাকে। বহুক্ষণের চেষ্টায় শরীরের ঝিনঝিনকে সে সেতারের ঝালার সঙ্গে মিলিয়ে নিতে পারে। তাতে অস্বস্তি কমে যায় না, কিন্তু খানিকটা সহনীয় হয়। সেতার হয়ে যাওয়ার একটা অন্যরকম অভিজ্ঞতাও হতে থাকে তার।
এ বাড়িতে কেউ গানের তেমন ভক্ত নয় বলে রেকর্ড প্লেযাব কেনা হয়নি। প্রীতম ভাবল বিলুকে একটা সস্তার রেকর্ড প্লেয়ার কিনতে বলবে। আর অনেক সেতার-সরোদের রেকর্ড। তার
অস্ত্র চাই।
বিলু তার জন্য হুইল চেয়ার কেনার কথা ভাবছে, চাকরি করার কথা ভাবছে, ভবিষ্যৎ চিন্তা করছে। আসলে এসবের পিছনে প্রীতমের অনস্তিত্বের কথাই কি ভাবা হচ্ছে না? বুকের মধ্যে ঘুমিয়ে থাকা ভয় হঠাৎ চিনচিন করে ব্যথিয়ে ওঠে, ককিয়ে ওঠে। মরে যাব নাকি?
বে-খেয়ালে হাত মুঠো পাকায় প্রীতম, চোখ বুজে দাঁতে দাঁত চেপে প্রাণপণে বিড়বিড় করে বলতে থাকে, ভাল আছি। ভাল আছি। ভাল আছি। ভাল আছি। এবার থেকে যখনই কেউ জিজ্ঞেস করবে, কেমন আছেন? তক্ষুনি খুব হোঃ হোঃ করে হেসে আনন্দে ভেসে যেতে যেতে প্রীতম বলবে, ভাল আছি।
রাস্তা পার হওয়ার জন্য ফুটপাথের ধার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ছোট্ট লাবু মুখ তুলে মায়ের দিকে চাইল। সে কিছু বলতে চায়, কিন্তু ভরসা পায় না। মা মারবে।
