ভুলিনি, কিন্তু প্রীতমবাবুর সঙ্গে আমার কথা হয়েছে, উনি হুইল চেয়ার পছন্দ করেন না।
বিলুর মুখ থমথমে হয়ে যায়। প্রীতমের দিকে চেয়ে মৃদু স্বরে বলে, হুইল চেয়ার হলে তোমার একা থাকতে তেমন কষ্ট হবে না।
বলতে নেই, আগের তুলনায় তার ধৈর্য ও স্থৈর্য বেশ কমে আসছে। যেমন বিলুর এই হুইল চেয়ারের ব্যাপারটায় এখন হল। অত্যন্ত তেতো স্বরে সে বলল, না না, ওসব আমি পছন্দ করি না। ঘরে একটা জবরজং জিনিস ঢুকিয়ে জঙ্গল বানাতে হবে না।
যদি এরকম স্বরে অরুণ কিছু বলত তা হলে বিলু ওকে তেড়ে মারতে যেত। কিন্তু প্রীতমের সঙ্গে বিলুর ব্যবহার অন্যরকম। কথাটা শুনে বিলু নিজের নখের দিকে চেয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, তুমি না চাইলে অন্য কথা। হলে তোমার সুবিধেই হত।
আমার কোনও সুবিধে হবে না বিলু। কেন কথা বাড়াচ্ছ?
বালিশে এলিয়ে চোখ বোজে প্রীতম। চোখের পাতাটা পুরো বন্ধ হওয়ার আগেই এক পলকের দৃশ্যটা চোখে পড়ল। অরুণ হাতের ইশারায় বিলুকে সরে যেতে বলছে।
বাথরুম থেকে লাবুও ডাকছিল। বিলু নিঃশব্দে চলে যায়।
অরুণ চেয়ারটা বিছানার আরও একটু কাছে টেনে এনে বসে। নরম গলায় বলে, ঘরে বসে থেকে থেকে তো পচে গেলেন মশাই! একটা কথা বলব? একদিন চলুন দিল্লি বা বম্বে রোড ধরে খানিকটা বেড়িয়ে আসি। এ বছর ওয়েদারটাও ভাল।
ইচ্ছে করে না যে! শরীরে অত শক্তিও নেই।
দূর মশাই! এই মনোবল নিয়ে আপনি লড়ছেন! শক্তি কারও শরীরে, কারও মনে। মনটা শক্ত করুন, ঠিক পারবেন।
ভাল লাগে না।
তবে কী ভাল লাগে? ঘরে বসে থাকতে?
প্রীতম ক্ষীণ হেসে বলে, ঘর আমার খারাপ লাগে না। বাইরেই তো যত গোলমাল।
বিলু ঠিকই বলে, আপনি ভীষণ ঘরকুনো এবং ঘোর সংসারী। সেইজন্যই কি বউকে চাকরি করতে দিতেও চান না?
মেয়েদের চাকরি করা আমাদের পরিবারে কেউ পছন্দ করে না।
সে তো বুঝলাম। বলে হঠাৎ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে অরুণ আবার বলল, কিন্তু এখন বিলুর চাকরি করা একটু দরকারও যে।
কেন?–বুলেটের মতো প্রশ্নটা বেরোয় প্রীতমের মুখ থেকে।
অরুণ মৃদু স্বরে বলে, আপনি নিজে অ্যাকাউন্ট্যান্ট, আপনাকে আমি আর কী বোঝাব?
প্রীতমের চিন্তার স্রোত খুব ধীরে ধীরে খাত বদল করে। সে আবার চোখ বুজে নিঃঝুম হয়ে শুয়ে মনে মনে খুব দ্রুত হিসেব করে দেখে নেয়। ভলান্টারি রিটায়ারমেন্টের দরুন সে এক লাখ ত্রিশ হাজার টাকার মতো পেয়েছিল। সেই টাকার ওপরেই এতদিন সংসার চলছে। বসে খেলে রাজার ভাঁড়ারও শেষ হয়।
অরুণ মৃদু স্বরে বলে, খরচও তত কম নয়। মেয়েদের চাকরি করা হয়তো স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ভাল না হতে পারে আপনার কাছে। কিন্তু জরুরি প্রয়োজন হলে নিশ্চয়ই তাতে আপনার আপত্তি হবে না?
বিলু তো আমাকে কিছু বলেনি।
বিলু আপনাকে বলতে তেমন জোর পাচ্ছে না।
প্রীতম দাঁতে ঠোঁট কামড়ায়। বিলু তাকে বলতে জোর পাচ্ছে না, তবে অরুণকে বলছে কিসের জোরে? প্রীতম বিরক্তির গলায় বলে, বলতে জোরের দরকার কী?
অরুণ আরও একটু কাছে এগিয়ে আসে এবং খুবই নিচু গলায় বলে, আপনি যতটা শান্তশিষ্ট দেখতে, ঠিক ততটাই কি ডেনজারাস নন? বিলু বলে, প্রীতমের মুখোমুখি হলে ওর ঠান্ডা গভীর চোখের দিকে চেয়ে আমার বুকের মধ্যে গুড়গুড় করে।
কথাটার মধ্যে খুশি হওয়ার মতো কিছু একটা ছিল বোধহয়, নইলে প্রীতমের ভিতরে একটা বিদ্যুৎ খেলে গেল কেন? চোখ খুলে সে বলল, আমি ডেনজারাস হতে যাব কেন? বিলু ওসব বলে
বুঝি!
অরুণ হাসিমুখে চেয়ে থাকে। তার চোখে সপ্রশংস দৃষ্টি। চাপা গলাতেই বলে, ডেনজারাস বলতেই তো আর মারদাঙ্গাবাজ লোক নয়। আপনার বিপজ্জনকতার উৎস হচ্ছে স্ট্রং লাইকস অ্যান্ড ডিসলাইকস। আপনি মুখে কিছু তেমন বলেন না, কিন্তু একটু নাকের কুঞ্চন বা ঠোঁট ওল্টানো কিংবা চোখের এক ঝলক দৃষ্টি দিয়ে অনেক কিছু বুঝিয়ে দেন। যারা কম কথা বলে এবং যারা চাপা স্বভাবের, তাদের সবাই ভয় পায়।
প্রীতম নিজের এত গুণের কথা জানত না। কথাগুলো যে সত্যি নয় তাও সে একটা মন দিয়ে বুঝতে পারে। সে জানে তুখোড় বুদ্ধিমান অরণ তাকে তেল দিচ্ছে। একটা উদ্দেশ্য নিয়েই দিচ্ছে। তবু অন্য একটা অবুঝ মন এই এত সব মিথ্যে গুণের কথা হাঁ করে গিলল। নিজের খুশির ভাবটা চাপা দেওয়ার জন্য সে একটা কৃত্রিম দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, আমাকে কারও ভয় পাওয়ার কিছু নেই।
প্রীতমকে এক মোহময় সম্মোহনে আচ্ছন্ন করে দিতে দিতে বড় আন্তরিকভাবে অরুণ বলে, আছে। আপনি তা হয়তো টের পান না। বিল পায়।
প্রীতম একটু অন্যমনস্ক থেকে বলে, ব্যাংকের টাকা কি ফুরিয়ে এসেছে?
তা নয়। এখনও অনেক আছে। হয়তো দু-চার বছর চলে যাবে। কিন্তু তারপর একদিন ফুরোবে।
কত আছে?
বিলু বলছিল কত যেন!
আমাকে বললে পারত।
প্রীতম আবার চোখ বাজে। গোঁ আঁকড়ে ধরে থেকে লাভ নেই সে জানে। চোখ খুলে আবার তাকায় এবং বলে, লাবুর কী হবে? বিলু চাকরি করতে গেলে ওকে দেখবে কে?
আয়া থাকবে। আপনিও তো রয়েছেন। লাবুর জন্য চিন্তা নেই। যেসব বাড়ির স্বামী স্ত্রী দু’জনেই চাকরি করে তাদের ছেলেমেয়েও তো মানুষ হচ্ছে।
প্রীতম মাথা নেড়ে বলে, ঠিক মানুষ হচ্ছে বলা যায় না। মায়ের সঙ্গ না পেলে বাচ্চারা ভীষণ রাগী, অভিমানী, জেদি আর হিংসুটে হয়ে ওঠে।
কথাটা স্বীকার করে অরুণ মাথা নাড়ে। সাদা একটা হাসিতে প্রীতমের মাথা গুলিয়ে দিয়ে বলে, লাবু তার বাবাকে তো পাবে। লাবু তো বাবা ছাড়া কিছু বোঝে না।
