অরুণ বিন্দুমাত্র অপ্রতিভ না হয়ে অন্যদিকে চেয়ে বলে, কমলা রং কাকে বলে তাই তো আমি বুঝি না। আমি একটু রংকানা আছি।
তা জানি। কানা শুধু নয়, ঠসাও। কতবার জুতো নিয়ে রুগির ঘরে ঢুকতে বারণ করেছি?
০৮. বিয়ের পর যখন অরুণ এ বাড়িতে আসত
বিয়ের পর যখন অরুণ এ বাড়িতে আসত তখন প্রীতম ওর সঙ্গে বিলুর সঠিক সম্পর্কটা জানত না। আজও জানে কী? আসলে মানুষে মানুষে সঠিক সম্পর্ক বলে তো কিছু নেই। সম্পর্ক পালটে যায়।
সাহস করে একদিন তবু প্রীতম জিজ্ঞেস করেছিল বিলুকে, অরুণের সঙ্গে তোমার বন্ধুত্বটা কেমন ছিল? খুব গাঢ়?
বিলু খুব একটা সংকোচ বা লজ্জা বোধ করেনি প্রশ্ন শুনে। তবে চোখের পাতাটা একটু নত করেছিল। কয়েক সেকেন্ডের দুর্বলতা মাত্র। তারপর বলল, আমরা একসঙ্গে স্কটিশ চার্চে পড়তুম বলিনি তোমাকে?
বলেছ।
অরুণ ছিল আমার দু’ বছরের সিনিয়র। এমন পাজি না, একদিন ওর পোষা বেজিটাকে এনে ছেড়ে দিয়েছিল করিডোরে। মেয়েদের মধ্যে সে কী চেঁচামেচি আর আতঙ্ক! আমি তো একটা জানালায় উঠে বসে রইলুম।
সেই থেকে তোমাদের ভাব?
সেই থেকেই। তবে আরও অনেক কাণ্ড আছে। শুধু যে ইয়ারকি করে বেড়াত তা নয়। ইয়ারকিটা ওর মুখোশ। ভিতরে ভিতরে ভীষণ সিরিয়াস।
অরুণ তোমার চেয়ে বয়সে বড়, ছাত্র হিসেবেও সিনিয়র। তবু ওকে তুমি-তুমি করে ডাকো কেন?
ঠোঁট উলটে বিলু বলল, ওকে আপনি বলতে যাবে কে? মেয়েরা সবাই ওকে নাম ধরে তুমি-তুমি করে বলত। তুমি কি অরুণ সম্পর্কে জেলাস ফিল করো প্রীতম?
না, না, তা নয়।লজ্জা পেয়ে প্রীতম বলেছিল, আসলে আমি মানুষের সম্পর্কে জানতে ভালবাসি।
বিলু মৃদু হেসে বলল, তুমি কী জানতে চাও জানি। তুমি খুব শান্ত, ভালমানুষ। কিছু মনে করবে তো?
না, কী মনে করব? মনে করার কিছু থাকলে কবেই তা বলে ফেলতাম।
বিলু একটু যেন আধোগলায় বলল, ওর সঙ্গে আমার ভাব ছিল। খুব ভাব। হয়তো বিয়েও করতুম। করলে না কেন?
একটা কথা ভেবে।
কী কথা?
ও ভীষণ মেয়েদের সঙ্গে মিশত। বাছবিচার ছিল না। ওরকম পুরুষ একটু আনফেইথফুল হয়। জানো তো, পুরুষরা প্রকৃতির নিয়মেই পলিগেমাস। তারা কখনও একজন মহিলাকে নিয়ে খুশি নয়। তার ওপর অরুণ আবার ভীষণ ফ্রি-ওয়ার্লড তত্ত্বে বিশ্বাসী। ও বিয়ে, বন্ধন, সংসার, সন্তান ইত্যাদি রেসপনসিবিলিটি একদম জানে না। আমি বাপু অতটা আধুনিক নই। তাই ভেবেচিন্তেই ওকে বিয়ে করিনি, তোমাকে করেছি।
সেজন্য আজ তোমার দুঃখ হয় না বিলু?
ধুস, দুঃখ কিসের? আমার অত সেন্টিমেন্ট নেই। যা করেছি তা হিসেব করেই করেছি।
আমার সঙ্গে অরুণকে কখনও তুলনা করতে ইচ্ছে হয় না তোমার?
যাঃ! নেভার। তুলনা করব কেন? ও একরকম তুমি অন্যরকম।
প্রীতম হাসিঠাট্টার হালকা চালটা বজায় রেখেই বলল, ধরো আমি তো বেশ রোগা, আর অরুণ কত স্বাস্থ্যবান। অরুণ আমার চেয়ে অনেক ফর্সা। ও প্রচণ্ড বড়লোক আর দুর্দান্ত স্মার্ট—যে গুণগুলো আমার নেই।
তেমনি তুমি আবার শান্ত, দায়িত্বশীল, গভীর মনের মানুষ। সকলের ততো সব গুণ থাকে না। শোনো তুমি কি অরুণ সম্পর্কে সত্যিই জেলাস নও?
প্রীতম হাসিমুখে মাথা নেড়ে বলল, না, নই বিলু। বরং অরুণকে আমার বেশ পছন্দ।
বিলু খুব গভীর মনের মেয়ে নয়, প্রীতম জানে। তবু সেদিন বিলু খুব গভীর অতল এক চোখে প্রীতমের মুখখানা মন দিয়ে অনেকক্ষণ দেখল। তারপর শুকনো গলায় বলল, অরুণের এ বাড়িতে আসা যদি তোমার পছন্দ না হয় তবে বলে দিয়ে, আমি ওকে বারণ করে দেব। তাতে ও কিছু মনেও করবে না।
ছিঃ বিলু!
বিলু নতমুখ হয়ে বলল, তুমি অত করে জানতে চাইছিলে বলে আমার মনে হচ্ছিল, তুমি বোধহয় ব্যাপারটা ভাল চোখে দেখছ না।
প্রীতম খুব স্পোর্টসম্যানের মতো কলার উঁচু করা গলায় বলে, আমার কাছে ব্যাপারটা নিতান্তই মজার। মফস্সলের ছেলে তো, আমরা জানি, প্রাক্তন প্রেমিকরা তাদের হাতছাড়া প্রেমিকাদের মুখোমুখি বড় একটা হয় না। তা হলে আর জীবনে ট্র্যাজেডি বলতে কিছু থাকে, বলো?
এ কথায় বিলু হেসে ফেলল। বলল, দেব-দানবের যুগ তো এখন আর নেই।
ফলে এ বাড়িতে অরুণের যাতায়াত বহাল থাকল। ঢাকা চাপার কিছু রইল না।
এখন বিলুর ধমক খেয়ে এই যে অরুণ উঠে গেল বাইরের ঘরে, জুতো ছেড়ে আসতে, তার মধ্যেও যেন অরুণের ওপর বিলুর গভীর অধিকারবোধ ফুটে উঠল। বুকের মধ্যে সামান্য চিনচিন করে ওঠে প্রীতমের। এত অধিকারবোধ নিয়ে আর এত জোরের সঙ্গে বিলু কোনওদিন তাকে কোনও হুকুম করেনি।
কিন্তু মানুষে মানুষে স্থায়ী সম্পর্ক বলেও তো কিছু নেই। প্রেমিকা চিরকাল প্রেমিকা থাকে না, স্ত্রীও থাকে না স্ত্রী। এইসব সম্পর্ক ভাঙচুর করতে করতে পৃথিবী খুব দ্রুত এগোচ্ছে।
মোজা পায়ে অরুণ ফিরে এসে বসে এবং বলে, তোমার বড় নিচু নজর বিলু, আজ আমি এত সুন্দর পোশাক পরে এসেছি, তবু তুমি আমার জুতোজোড়াই দেখলে?
বিলু একটু কঠিন গলায় বলে, এটা রুগির ঘর মনে রেখো।
সেকথা ঠিক। ভুলে যাই।বলে একটু লজ্জার হাসি হাসে অরুণ।
প্রীতম লক্ষ করে, সবকিছু অরুণকে মানাল। ওর ওঠা, হাঁটা, হাসি, লজ্জা এ সবকিছুই যেন বহুকাল ধরে রিহার্সাল দিয়ে যত্নে রপ্ত করা।
আবার একটু চিনচিন করে প্রীতমের।
বিলু কথার ফাঁকেই গিয়ে মেয়েকে বাথরুমে পৌঁছে দিয়ে ফিরে এসে অরুণকে বলে, সবকিছুই তো আজকাল তুমি ভুলে যাও। একটা হুইল চেয়ারের কথা বলেছিলাম, মনে আছে?
