বিয়ের আগে বিলুর সঙ্গে ভাব ছিল না প্রীতমের। তবে শিলিগুড়িতে বিলু মাঝে মাঝে তার পিসির বাড়ি বেড়াতে যেত। তখন দেখেছে। বিলুর হাতে কখনও এক গ্লাস জল বা এক কাপ চা খেয়েছে প্রীতম। দুটো-চারটে কথাবার্তাও হত তখন। পরে সেই পিসিই বিয়ের সম্বন্ধ আনে এবং বিয়ে হয়েও যায়। মনে আছে, প্রথম রাত্রে বিলু তাকে বলেছিল, তুমি খুব শান্ত স্বভাবের। আমার শান্ত মানুষ খুব ভাল লাগে।
এটা কি ভালবাসার কথা নয়?
আজকাল ঘরবন্দি প্রীতম প্রায়ই ভালবাসার কথা ভাবে। কিন্তু ভালবাসার কথা ভাবলে কখনওই তার বিলুর মুখ মনে পড়ে না, কী আশ্চর্য! মনে পড়ে বনগন্ধ ভরা শিলিগুড়ির মাঠঘাট, আকাশ উপুড় করা শীতের ঢালাও রোদ, নীলবর্ণ মেঘের মতো দিগন্তে ঘনীভূত পাহাড়, মহানন্দার সাদা চর, মনে পড়ে তাদের ভরা সংসারের কলরোল। ভালবাসা ছিল ঝুমকো ভোরে ফুল চুরি করতে যাওয়ায়, ভালবাসা মাখা থাকত জোহা চালের ফেনা ভাতে গলে-যাওয়া ঘিয়ের গন্ধে, হাইস্কুলের নরেশ মাস্টার মশাইয়ের বিজবিজে কাঁচাপাকা দাড়িওলা মুখে ভালবাসার নিবিড় একটা ছায়া দেখেনি কী? প্রীতম, শতম, রূপম আর মরম এই চার ভাইয়ের মধ্যে ছিল অবিরাম খুনোখুনি ঝগড়া, বিছানায় বালিশকে গদা বানিয়ে প্রবল মারপিট, খাওয়া নিয়ে, খেলা নিয়ে, জামাকাপড় নিয়ে বরাবর রেষারেষি। এখন মনে হয় তার মধ্যেই ভালবাসার কীট গোপনে গোপনে সুড়ঙ্গ খুঁড়ে এর হৃদয়ের সঙ্গে ওর হৃদয়ের পথ করে দিয়েছিল। আর মা? বাবা? কোনওদিন তারা কেউ তো মুখ ফুটে বলেনি, প্রীতম তোকে বড় ভালবাসি। কিংবা, তুই বড় ভাল ছেলে। জ্ঞান বয়সে তাদের মুখে কখনও আদরের কথা শোনেনি প্রীতম, তবু সেই বাড়ি বুকসমান ভালবাসার জলে ছিল আধোবা। চিরদিনই কলকাতা ছিল প্রীতমের কাছে নিষ্ঠুর প্রবাস। আজও তাই আছে। ভবানীপুরের এই ফ্ল্যাটটা তার কাছে নিতান্তই এক বাসাবাড়ি, মেসবাড়ির মতো, হাসপাতালের মতো একটা নিরাপদ আশ্রয় মাত্র। এখানে ড়ুবজলে স্নান নেই।
যখনই শিলিগুড়ির কথা, ভালবাসার কথা মনে পড়ে তখনই বুকের মধ্যে নাটবল্ট ঢিলে হয়ে একটা কপাট যেন ভেঙে পড়তে চায়। ভারী ঘুঘুনে এক নেই-আঁকড়া ভাব আসে মনে, শিশু হয়ে যেতে ইচ্ছে জাগে। সেই দুর্বলতাকে প্রশ্রয় দেয় না প্রীতম। কাগজ খাতা ডটপেন নিয়ে অঙ্কে ড়ুবে যাওয়ার চেষ্টা করে।
আচমকাই কলিং বেল বেজে ওঠে রি-রি করে।
প্রীতম তখনও আনমনে ভালবাসার কথাই ভাবছে। ভাবছে, তুমি কি অকৃতজ্ঞ নও প্রীতম? বিলু কি তোমার জন্য নিজেকে নিংড়ে দিচ্ছে না? দিচ্ছে তো? শুধু সকালে মুখের কাছে মুখ এনেও চুমু খায়নি বলেই কি এ বাড়িতে ভালবাসা নেই? এ কেমন ইল্লতে কথা?
কে গিয়ে দরজা খুলে দিল সদরের। হঠাৎ একটা আফটার-শেভ লোশনের সুগন্ধে ভরে গেল। শুধু আফটার-শেভ নয়, সঙ্গে হয়তো আরও কোনও সুগন্ধ আছে।
এ গন্ধ চেনা প্রীতমের। মুখে হাসি নিয়ে চোখ তুলে সে বলল, আসুন।
আজ ভালই আছেন মনে হচ্ছে! নইলে এই সাতসকালে কেউ কি অ্যাকাউন্টস নিয়ে বসে? বলতে বলতে অরুণ ইজিচেয়ার টেনে এনে বসে।
প্রীতম লক্ষ করল, অরুণ জুতোসুষ্ঠু ঘরে ঢুকেছে। প্রীতম এ নিয়ে কাউকে কিছু বলতে পারে না কখনও। কিন্তু বিলু পারে। অরুণের এ ধরনের ভুল প্রায়ই হয় এবং বিলু বকলে ফের গিয়ে জুতো ছেড়ে আসে। আজও বিলু ওকে বকবে ঠিক।
প্রীতম কিছুতেই অরুণের জুতোজোড়া থেকে চোখ তুলতে পারে না। কী সাংঘাতিক দামি এবং ঝকঝকে উঁচু হিলের জুতো! জুতো থেকে চোখ তুললে গাঢ় খয়েরি রঙের ঢোলা প্যান্ট এবং তার ওপর ডাবল ব্রেস্টেড কোট, কোটের ফাঁকে গাম্ভীর্যপূর্ণ টাই চোখে পড়বে। তার ওপর অরুণের সুন্দর গোলপানা ফর্সা মুখখানা। বেড়ালের মতো একটু কটা চোখ, সামান্য লালচে এক ঝাক চুল, চোখ দুখানা বিশাল। আভিজাত্যের স্থায়ী ছাপ তার সর্বাঙ্গে। হাতের আঙুলগুলো দেখ, কী মোলায়েম, লাল টুকটুকে পেলব।
প্রীতম হাসছিল। বলল, আজ একটু ভালই।
অরুণ খুব চোখা হেসে বলল, খুব ভাল কি থাকবেন আজ! ডাক্তার যে আজ বিকেলে আবার গোটা দশ বারো ছুঁচ ফোটাবে। আমি ঠিক ছ’টায় গাড়ি নিয়ে চলে আসব।
প্রীতম অস্বস্তি বোধ করে বলে, আপনার আসার কী দরকার? বিলুই ঠিক নিয়ে যেতে পারবে। এতদিন তো নিয়ে গেছে।
বিলু পারবে না, বলিনি তো! তবে কষ্ট হবে। দিন দিন কলকাতার কনভেয়ানস কেমন ডিফিকাল্ট হয়ে দাঁড়াচ্ছে জানেন তো! ঠিক সময়ে ট্যাক্সি না পেলে? ডেটটা মিস হওয়া কি ভাল?
প্রীতম কৃতজ্ঞতাবোধে অস্বস্তি বোধ করে সবচেয়ে বেশি। একটা লোক নিজের পেট্রল পুড়িয়ে গাড়ি নিয়ে আসবে, নিয়ে যাবে, ফের দিয়েও যাবে–এতটা কি পাওনা প্রীতমের ওর কাছে? অথচ অরুণের জন্য কিছু করারও নই,তার।
হতাশ হয়ে প্রীতম বলে, ঠিক আছে তা হলে।
ঠিকই আছে। খামোখা আমার অসুবিধের কথা ভেবে নিজেকে ব্যস্ত করেন কেন? আমার অসুবিধে হচ্ছে না।
অরুণ এরকম। কোনও জড়তা নেই, অকারণ বেশী ভদ্রতার ধার ধারে না। সবদিক দিয়েই ঝকঝকে প্রকৃতির মানুষ। ভীষণ ধারালো। উচিত কথা বলতে বা রুখে দাঁড়াতে ভয় খায় না। প্রীতমের মতো।
রান্নাঘর থেকে এলোচুল দু হাতে পাট করতে করতে তড়িৎ পায়ে বিলু ঘরে ঢুকতেই প্রীতমের বুক কেঁপে ওঠে। এইবার ঠিক অরুণের পায়ের জুতোজোড়া নজরে পড়বে বিলুর। সে চোখ কুঁচকে উদ্যত মারের অপেক্ষা করতে থাকে।
বিলু খুব ঝাঁঝালো গলায় অরুণকে বলে, আমার কমলা রঙের উলের কী হল? কবে থেকে বলছি, মেয়েটা জানুয়ারি থেকে স্কুলে যাবে! ওর ইউনিফর্ম লাগবে না?
