প্রীতম ঘুনঘুনে নেই-আঁকড়া স্বরে বলে, না, ওরকম দেখতে ভাল লাগে না। ওভাবে কখনও আমার সামনে এসো না। আমার খারাপ লাগে।
আচ্ছা।-বলে বিল চলে যায়।
জানালা দিয়ে কিছুই দেখার নেই প্রীতমের। ইজিচেয়ারে আধশোয়া হয়ে রাস্তা দেখা যায় না। শুধু কয়েকটা বাড়ির তিন বা চারতলা আর আকাশ দেখা যায়। কিন্তু প্রীতমের কোনও অন্যমনস্কতা নেই। যেটুকু দেখে সেটুকুই যথাসাধ্য চেতনা আর প্রখর অনুভূতি দিয়ে গ্রহণ করে অভ্যন্তরে।
বিলু খাবার নিয়ে আসে। প্রীতমের গলায় বাচ্চাদের মতো একটা ন্যাপকিনের বিপ বেঁধে দেয়। তারপর পাশে একটা টুলে বসে আস্তে আস্তে খাইয়ে দেয় তাকে। খাওয়া জিনিসটা বরাবরই প্রীতমের কাছে খুব বিরক্তিকর ছিল। খেতে হবে বলেই তার খাওয়া। বরাবর সে খায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে এবং খুব তাড়াতাড়ি। বিলু এখন তা হতে দেয় না। প্রীতমও বুঝেছে খাওয়াটা খুবই জরুরি ব্যাপার। যদি বেঁচে থাকতে হয়, যদি লড়াই চালাতে হয়, তবে যথেষ্ট রসদের দরকার।
প্রীতম মুখ ফিরিয়ে বলে, আজকাল আমার খাওয়া কি খুব বেড়ে গেছে বিলু?
অন্য বউ হলে বলত, ছিঃ ছিঃ, ওসব কথা কি বলতে আছে? বিলু গম্ভীর মুখে বলল, আরও একটু বাড়লে ভাল হয়।
প্রীতম লক্ষ করল, বিলুর চুল এখনও রুক্ষ, এলোমেলো, কপালে সিঁদুর লেপটানো। এ নিয়ে আর বলতে গেলে সকালের নরম-সরম বিলু আর নরম-সরম থাকবে না। রেগে যাবে, ঠান্ডা কঠিন এক ব্যবহার দিয়ে সারাদিন প্রতিবাদ জানিয়ে যাবে।
খাওয়া শেষ হলে প্রীতম মুখ তুলে ফের জানালা দিয়ে বাইরে চেয়ে থাকে। ও-ঘরে লাবু ঘুম ভেঙে মাকে ডাকতে থাকে, মা! ও মা! মা! ও মা! মা! ও মা! ঠিক নামতা পড়ার মতো। বিলু বোধহয় বাথরুমে। সাড়া দিচ্ছে না। কিন্তু যতক্ষণ না সাড়া দেবে ততক্ষণ এক সুরে, এক গলায় একঘেয়ে ডেকেই যাবে লাবু।
মেয়েকে পারতপক্ষে ডাকে না প্রীতম। বড় মায়া। এই বাসায় এই এক পুকুর ভালবাসার ড়ুবজল অপেক্ষা করে আছে তার জন্য। বড় গভীর জল। একবার পা বাড়ালে তলিয়ে যেতে হবে। এখন ভালবাসায় ভেসে যেতে নেই। মন নরম হবে, মৃত্যুভয় এসে যাবে তবে। প্রীতম তাই কান কাড়া করে মেয়ের ডাক শোনে, কিন্তু নিজে তাকে ডাকে না বা সাড়াও দেয় না। লাবুর সঙ্গে তার এখন আড়ি।
ঝি-টা বাড়িতে নেই, দোকানে গেছে। প্রীতম লাবুর ওই অবিকল পাখির স্বরের ডাক সইতে পারছে না। ছটফট করে ভিতরটা। আপনা থেকেই শরীরটা দাঁড়িয়ে পড়তে চায়। সরু হাত তুলে সে কপাল টিপে ধরার এক অক্ষম চেষ্টা করে।
বাথরুম থেকে বন্ধ দরজা ভেদ করে বিলুর ক্ষীণ স্বর এল এই সময়ে, আসছি-ই।
লাবু শোনে এবং চুপ করে। মেয়েটা কেমন একরকম হয়ে যাচ্ছে দিন দিন। মাকে ছেড়ে এক মুহূর্ত থাকতে চায় না। সারাদিন খাওয়া নিয়ে বিলু ওকে মারে, বকে। বিলুকে ভয়ও পায় ভীষণ, আবার অবাধ্যতাও করে যায় অনবরত। মার খেলে মায়ের কাছ থেকে সরে যায় না, পালায় না। একই জায়গায় দাঁড়িয়ে অসহায় ভয়ে আর ব্যথায় চিৎকার করতে থাকে।
যত ভাববে তত মায়ার পলি জমবে মনের মধ্যে। তাই প্রাণপণে নিজের অনুভূতির অন্য জগৎ জাগিয়ে তুলতে চেষ্টা করে প্রীতম। আগে উদাস ছিল প্রীতম, এখন সে অনেক অনুভূতিপ্রবণ হয়েছে। কীটপতঙ্গ জীবাণুদের জগৎকে সে আজকাল স্পষ্ট টের পায়। বাড়িময় যেসব আরশোলা ওড়ে, যে একটা-দুটো ইঁদুর বা ছুঁচো আনাগোনা করে তাদের গতিবিধি, সময়জ্ঞান ও চরিত্র সম্পর্কে সে অনেক অভিজ্ঞ হয়েছে ইদানীং। একটা দুধের শিশু বেড়াল অনেক তাড়া খেয়েও এই ফ্ল্যাটের আনাচে কানাচে নাছোড়বান্দা হয়ে ঘুরে বেড়াত। তাকে দু চোখে দেখতে পারত না প্রীতম। এখন সেই বেড়ালটা বড় হয়েছে। সারাদিন পাড়া বেড়ায়, কিন্তু মাঝে মাঝে এসে প্রীতমকে দেখা দিয়ে যায় ঠিকই। আর রোজ রাতে নিয়মিত এসে প্রীতমের খাটের তলায় শুয়ে থাকে। কখন শুতে আসবে বেড়ালটা, তার জন্য ঘুমের আগে উন্মুখ হয়ে থাকে প্রীতম, এলে নিশ্চিন্ত হয়।
মানুষ কীভাবে বেঁচে থাকবে তার তো কোনও বাঁধাধরা ছক নেই। প্রীতম এইভাবে বেঁচে আছে, সুতরাং যতদূর সম্ভব এই বাচাটাকে সে সইয়ে নেয়। খুব কঠিন কাজ কিন্তু প্রীতমকে পারতেই হবে।
লাবু ছিল তার প্রাণ। যতক্ষণ বাসায় থাকত প্রীতম ততক্ষণ লাবু এঁটুলির মতো লেগে থাকত তার সঙ্গে। মেয়ের প্রতি তার ভালবাসা ছিল একবুক তেষ্টার মতো, সহজে মিটতে চাইত না। মেয়েকে ছুঁয়ে না থাকলে রাতে ঘুমোত পারত না প্রীতম। অসুখ হওয়ার পর বিলু লাবুকে সরিয়ে নিয়েছে। সরিয়ে নেওয়া নয়, যেন ছিড়ে নেওয়া। প্রথমদিকে লাবুকে ছাড়া খাঁ খাঁ শুন্য লাগত বুক। তারপর সয়েও গেছে। আগে আগে লাবু বাবার কাছে আসতে না পারায় ভীষণ কাঁদত, নিষেধ। মানতে চাইত না, ফাঁক পেলেই এসে ঝাঁপিয়ে পড়ত কোলে। কিন্তু ক্রমে সেও দুরত্ব রক্ষা করে চলতে শিখল তো! পারতপক্ষে প্রীতমও আর মেয়েকে ডাকে না, কথা বলে না। তাও সইল তার।
বিলুর সঙ্গে বরাবরই একটু দূরত্ব ছিল প্রীতমের। ঝগড়াঝাটি নয়, মন কষাকষিও নয়, ঠান্ডা লড়াইও বলা যায় না। তবে বিলু একটু অন্যরকম, কোনওদিনই প্রীতমের কাছে নিজের মনটা সবটুকু খুলে দেয়নি সে। বিয়ের পর প্রথম ভাব হলে মানুষ কত আগড়ুম বাগড়ম বলে, কত তুচ্ছ কথার পাহাড় বানায়। বিলু কোনওদিন সেরকম ছিল না। কথা বরাবর কম বলত। কিন্তু একথাও বলা যাবে না যে, বিলুর প্রীতমের প্রতি ভালবাসা নেই। বললে খুব মিথ্যে বলা হবে, ভুল বলা হবে। গড়পড়তা বাঙালি বউরা যা করে বিলু তার চেয়ে একরত্তি কম করে না তার জন্য। কিন্তু তার ওই সেবার মধ্যে কোথায় যেন দক্ষ নার্সের পটুত্ব আছে, কোনও আবেগ নেই। অন্য কারও স্বামীর এরকম শক্ত অসুখ হলে চোদ্দোবার কেঁদে ভাসাত, বিলু একদিনও চোখের জল ফেলেনি। কিন্তু যারা কেঁদে ভাসায় তারাও হয়তো ওষুধ দিতে এক-আধবার ভুল করে, রুগির সেবা করতে করতে হয়তোবা কখনও বিরক্তি প্রকাশ করে ফেলে। বিলুর সেরকম ভুল হয় না, বিরক্তির প্রকাশও তার নেই। তবে বিলুর মুখ সর্বদাই গম্ভীর, বিষণ্ণ। যে স্থায়ী বিরক্তির ছাপ বিলুর মুখে আছে তার সঙ্গে প্রীতমের অসুখের কোনও সম্পর্ক নেই।
