একটা দিনের বাড়তি আয়ু পাওয়া, আর-একটা দিনের সূর্যের আলো দেখাই কি এখন যথেষ্ট বেশি আহ্লাদের বিষয় নয়?
তাই সকালের দিকে প্রীতম ক্লান্ত থাকলেও মনটা একরকম শক্ত সমর্থ রয়ে যায়। চোখ বুজে সে মৃদু মৃদু একটু হাসতেও থাকে। যতক্ষণ না বিলু এসে মশারি তুলে উঁকি দেয়।
মাঝে মাঝে মশারির মধ্যে এক-আধটা মশার গুনগুন শুনে মাঝরাতে চোখ মেলে চায় প্রীতম। খুব কান পেতে শোনে। বেড় সুইচ টিপে আলোও জ্বালায়। অবশ্যই মশা মারবার জন্য নয়। সে সাধ্য তার নেই। হাঁটু গেড়ে বসো, সাবধানে মশাটাকে খুঁজে বের করো, সেটাকে কোথাও নিশ্চিন্তে বসতে দাও, তারপর এগিয়ে গিয়ে দু হাতে চটাস করে মারো। না, এতসব প্রীতমের কাছে বিরাট বিরাট কাজ। মারবার কথা তার মনেও হয় না।
ঘুম ভেঙে সে মশারির মধ্যে কোনও মশার অস্তিত্ব টের পেলে চুপ করে শব্দ শোনে, তারপর ফিসফিস করে বলতে থাকে, তোমরা অন্য জগতের। তোমরা এক চিন্তাশূন্য কর্তব্যের জগৎ থেকে আসা জীব। সূখীও নও, দুঃখীও নও। জেগে থাকো, আমার সঙ্গে জেগে থাকো।
বিলু মশারি তুলে উঁকি দিয়ে জিজ্ঞেস করে, তুমি জেগেছ?
হুঁ।
বাথরুমে যাবে এখন?
একটু পরে।
পরে আবার কেন? এখনই সেরে নাও। গরম জল বসিয়ে এসেছি। ওঠো।
বলে হাত বাড়িয়ে পাঁজাকোলা করে প্রীতমকে বসায় বিলু। প্রীতম তখন বিলুর শরীরে বাসি জামাকাপড়ের গন্ধ পায়। বিলুর শরীরে কোনও উৎকট গন্ধ নেই। গ্রীষ্মকালেও বিলুর ঘাম হয় না। তবু সব শরীরেই যেমন একটা না একটা গন্ধ থাকে তেমনি বিলুরও আছে। প্রীতম গন্ধটা ভালই বাসে।
দাঁড় করানোর সময় বিলুর মুখ প্রীতমের মুখের কাছাকাছি এসেছিল। বিলু বলল, আজ ভাল করে তোমার পঁত মেজে দিতে হবে। মুখে দুর্গন্ধ হচ্ছে।
দাঁড়ানোটা ভারী কষ্টকর প্রীতমের কাছে। তবু এখনও বিলুর ওপর শরীরের পুরো ভর ছেড়ে দিয়ে দাঁড়াতে পারছে। বিলু বলল, কতবার বলি বাথরুমে যাওয়ার দরকার নেই। বিছানাতেই তো
প্লাস্টিকের গামলায় মুখ ধোওয়া যায়।
আমার ঘেন্না করে।
ঘেন্না করলে চলবে কেন? যেমন অবস্থা তেমনি তো ব্যবস্থা হবে।
এখনও পারছি।
কষ্টও হয় তো!–বিলু বলল।
আমার চেয়ে তোমার কষ্টই বেশি।
আমার কষ্ট! আমার আবার কষ্ট কী!
সকালের দিকে বিলুর মন ভাল থাকে। এই সময়টায় বিলুর শরীরটা যেন মায়ের শরীরের মতো নতা ও সুঘ্রাণে ভরা থাকে।
বিলুর শরীরে ভর দিয়ে হাঁটি হাঁটি পা-পা করে বাথরুমে যায় প্রীতম। বিলু খুবই সাবধানে তার বগলের নীচে কাঁধ দিয়ে, কোমরে হাত জড়িয়ে ধরে থাকে তাকে।
বাথরুমে বাচ্চা ছেলের মতো তাকে ধরে থেকে হিসি করায়, তারপর একটা বেতের চেয়ারে বসিয়ে মাথাটা বুকের সঙ্গে চেপে ধরে গুঁড়ো মাজনে আঙুল দিয়ে খুব যত্নে তার দাঁত মেজে দেয়। কোষে জল নিয়ে কুলকুচো করায়।
এসব করতে করতেই বলে, আজ স্নান করাব তোমাকে।
ভাল লাগে না। বড্ড ঝামেলা।
স্নান না করলে শরীর কষে যাবে।
আজকের দিনটা থাক।
রোজই তো থাকছে। ডাক্তার বলেছে সপ্তাহে তিন দিন স্নান করাতে।
আবার ধরে নিয়ে এসে চেয়ারে বসিয়ে চিরুনিতে চুল পাট করে দেয়। বাসি জামাকাপড় বদলে দেয়। বিছানার চাদর, বালিশের তোয়ালে পালটে দেয়। বোজই চাদর আর তোয়ালে পালটানো হয়, ডেটল-জলে কাচা হয়। বেডসোর যাতে হতে না পারে তার জন্য পিঠে সযত্নে একটা ওষুধ দেওয়া পাউডার ছড়িয়ে দেয়।
এইসব প্রাতঃকৃত্যের পর শরীরের ভার অনেক কমে যায় প্রীতমের। বিলু তাকে সকালের ঠান্ডা থেকে বাঁচাতে জামার ওপর গরম সোয়েটার পরিয়ে দেয়, হালকা শাল টেনে দেয় গলা অবধি।
তারপর বিছানায় হাত রেখে মুখের কাছে ঝুঁকে জিজ্ঞেস করে, আজ কী খাবে?
এই সময়ে রোজ প্রীতমের মনে হয় বিলু এখন খুব আলতো আমাকে চুমু খেলে কত ভাল হত! এরকম অবস্থায় খাওয়াই তো নিয়ম। খাবে কি?
কিন্তু বিলু কখনওই তা করে না। প্রীতমও কোনওদিন এরকম কোনও প্রস্তাব মুখ ফুটে করতে পারেনি।
প্রীতম বলে, যা খেতে দেবে তাই খাব।
কোনও বায়না নেই তো?
প্রীতম স্নিগ্ধ হেসে বলে, না। কোনওদিন বায়না করেছি? বলো!
বিলু হাসে না। ভ্রু কুঁচকে কেমন একটু আনমনা হয়ে যায়। আর ঠিক এই সময় প্রীতমের মনে হতে থাকে, এবার বিলু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলবে। নিশ্চয়ই ফেলবে।
কিন্তু বিলুর দীর্ঘশ্বাস নেই। কোনওদিনই দীর্ঘশ্বাস ফেলে না বিলু।
প্রীতম বলে, আজকাল ডিমে বড় আঁশটে গন্ধ লাগে। আজ আমি ডিম খাব না।
এই তো বায়না করছ! করো না বলে?
এটা তো না খাওয়ার বায়না। একে বায়না বলে না।
এটাও বায়না।—বিলু বলল, কিন্তু হাসল না। অথচ এরকম কথায় একটু হাসাটাই কি নিয়ম নয়?
বিলু বলল, ঠিক আছে, মাখন দিয়ে ডিমের পোচ করে দিচ্ছি, তা হলে অতটা আঁশটে গন্ধ লাগবে না।
দাও। আর জানালার কাছে ইজিচেয়ারটা পেতে দাও। একটু বাইরেটা দেখি।
বিলু লোহার ইজিচেয়ারটা পেতে দেয়, ধরে ধরে নিয়ে গিয়ে বসায়, সযত্নে গলা পর্যন্ত চাপা দিয়ে দেয়।
প্রীতম বিলুর দিকে চেয়ে বলে, সকালে উঠে রোজ একটু ফিটফাট হয়ে নাও না কেন? চুল উড়ছে, সিদুর লেপটে আছে, ওরকম চেহারা দেখতে কি ভাল?
আমার এখন সাজবারই সময় কিনা!
প্রীতম ভ্রু কুঁচকে বলে, কেন? তোমার কি দুঃসময় চলছে?
তবে কি সুসময়?
তাও নয়। কিন্তু তোমাকে দেখে মনে হয়, তুমি সব হাল ছেড়ে দিয়ে বসে আছ।
বিলু মৃদু স্বরে আত্মবিশ্বাসহীন গলায় বলে, হাল ছাড়ার কী আছে! ঘরে রুগি থাকলে কার সাজতে ইচ্ছে করে বলো তো!
