আসলে দোষ তো নিতাইয়ের নয়। সজলখোকাবাবু নিজেই এসে শিখতে চায় যে। খারাপ কথা শুনলে খুব খুশি হয়, হেসে গড়িয়ে পড়ে। এই যেমন রঘু স্যাকরা। নিতাইয়ের তা হলে দোষটা হল কোথায়?
নদী পেরিয়ে গোরুবাথানের জঙ্গলে গিয়ে ইস্পাতকে নিয়ে অনেক ঘোরাফেরার পর বেলা গড়িয়ে নিতাই ফিরে আসে। কোঁচড়ের মুড়ি যেমন কে তেমন থেকে নিউড়ে গেছে। গুড়ের ডেলাটা বের করে খেয়ে জল খেল নিতাই। তারপর কম্বল গায়ে দিয়ে শুয়ে পড়ল।
টের পেল, জ্বর আসছে। ব্যথার তারসে আসে ওরকম। শুয়ে শুয়ে সে পুতুলরাণীর কথা ভাবে।
ভারী নাকি মোটাসোটা হয়েছে। তা হলে দেখতে এখন ভালই লাগে নিশ্চয়ই। মহাকালী ভয়ংকরী! শক্তি দে মা। শক্তি দে। মন্ত্রের জোর দে।
যন্ত্রণায় পাশ ফিরে শোয় নিতাই। হিমালয়ে যেতেই হবে। আসল বিদ্যে শিখে আসতে হবে।
০৭. প্রীতমের ঘুম ভাঙে খুব ভোরবেলায়
প্রীতমের ঘুম ভাঙে খুব ভোরবেলায়, যখন সূর্য ওঠে না, যখন চারদিক এক ভুতুড়ে আবছায়ায় নিঃঝুম হয়ে পড়ে থাকে। তখনই কি প্রথম ঘুম ভাঙে প্রীতমের? তা তো নয়। সারারাত আরও বহুবার ঘুম ভেঙে যায় তার। খুব তুচ্ছ সব কারণে। কখনও রান্নাঘরের এঁটো বাসনে ধেড়ে ইঁদুরের শব্দ, আরশোলার পাখার আওয়াজ, কখনওবা নিছকই স্বপ্ন দেখে, কখনও এমনিই।
ঘুম ভাঙলেই বড় একা। ভীষণ একা। পাশের ঘরে এক খাটে বিলু আর লাবু, খাওয়ার ঘরের মেঝেয় বিন্দু নামে নতুন কিশোরী ঝি। তাদের ঘুম খুব গাঢ়। প্রীতমের কোনওদিনই গাঢ় ঘুম ছিল না। আর বরাবরই সে ঘুম ভেঙে একাকিত্বকে হাড়ে হাড়ে, মজ্জায় মজ্জায় টের পেয়েছে।
এখন প্রীতম আরও একা। সামান্য সর্দিজ্বর বা ইনফ্লুয়েঞ্জা হলেও বরাবর বিলু ছোয়াচ বাঁচিয়ে চলেছে প্রীতমের। এখন দীর্ঘ রোগভোগের কালবেলা চলছে। এখন তার নিরেট নিচ্ছিদ্র একা থাকা, একা হয়ে যাওয়া।
কিন্তু মনকে দুর্বল হতে দেয় না প্রীতম। জানে, একবার ভয়কে প্রশ্রয় দিলে আর পরিত্রাণ নেই। মৃত্যুর চেয়েও বহুগুণ ভয়ংকর মৃত্যুভয় ধারেকাছে তরুণ উৎসাহী চিতাবাঘের মতো অপেক্ষা করে আছে। প্রীতম তার অন্ধকার নড়াচড়া চোখের নীল আগুন সব টের পায়, দেখতে পায় তার শরীরের কটাশে ছাপচকর। এক মুহূর্তে হাল ছেড়ে দেওয়ার ভাব দেখলেই লাফিয়ে পড়বে।
ঘুম ভাঙলে তাই প্রীতম একা বোধ করা থেকে নিজের পরিত্রাণ খুঁজছিল প্রাণপণে। সে জানে তার বহু বহু দুর পরিধির মধ্যেও কোনও মানুষ নেই। বউ না, আত্মীয় না, ডাক্তার বা বন্ধুও না। সে একা, আর তার শরীরের অজস্র জীবাণু।
এইসব রহস্যময় জীবাণু কীরকম, কোথা থেকে এল তা জঁহাবাজ ডাক্তারেরাও জানে না। তারা শুধু জানে হাড়ে-মজ্জায় কোনও গোপন অদ্ভুত রন্ধ্রপথে জীবাণুরা দিনরাত অবিরাম কাজ করে চলেছে।
একদিন তারা মেরুদণ্ডের হাড়ের জোড়গুলি পেরিয়ে মগজে পৌঁছে যাবে। আজও অবশ্য ততদূরে পৌঁছয়নি তারা। প্রীতমের চিন্তাশক্তি আজও পরিষ্কার। থট প্রসেসে কোনও গোলমাল নেই। মাঝে মাঝে সে এখনও জটিল কুটিল সব এন্ট্রি দু’বার না ভেবেই করতে পারে। হায়ার অ্যাকাউন্টেন্সির কয়েকটা বই তার শিয়রের কাছে থাকে, সব সময়ে পাশে খাতা, ডটপেন।
তবু প্রীতম জাগে এবং কিছুক্ষণ একা বোধ করে। এই বোধের সঙ্গে তার লড়াই চলছে দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে। প্রায় হারতে হারতেও লড়াইটা টিকিয়ে রেখেছে সে। বাঘের চোখ বোজ অন্ধকারে দপ দপ করে জ্বলে উঠে তাকে দেখে নেয়।
কিন্তু এক বিপুল গভীর অন্ধকারের বাঁধভাঙা স্রোত জানালা দরজার সব রন্ধ্রপথ দিয়ে হুড়হুড় করে ঘরে ঢুকে আসে। বর্ণ গন্ধ আকারহীন সে এক নিষ্ঠুর অন্ধকারের বিপুল সমুদ্র। এই আবছা ভোরে ভয় ভয় করে। কাছে এগিয়ে আসে কি বৈতরণী? প্রীতম তখন খুব খেলোয়াড়ের মতো চোখ বুজে নিজের শরীরের ভিতরে চিরজাগ্রত অবিরাম ক্রিয়াশীল নিদ্রা ও বিশ্রামহীন জীবাণুদেরই ডাকতে থাকে। বলে, তোমরা তো আছ। তোমরা তো আছ! আমি তো একা নই! মৃত্যু পর্যন্ত তোমরা তো থাকবেই সঙ্গে। তারপর একসঙ্গেই মরণ আমাদের।
কথাটা কতদূর ঠিক কে জানে। তবে প্রীতম টের পায় যখনই সে ডাকে তখনই শরীরের ভিতরে ঝাকে ঝাকে কী যেন জেগে ওঠে, সাড়া দেয়। সে কেমন? যেন শরীরের ভিতরে ভিতরে এক রোমাঞ্চ, এক সচেতনতা, এক চনমনে ভাব।
তখন নিশ্চিন্ত হয় প্রীতম। একা কথা বলছে দেখলে বিলু হয়তো তাকে পাগল ভাববে। কিন্তু মাঝরাতে বা খুব ভোরের বেলায় কেউ তাকে দেখার জন্য জেগে থাকে না। তাই প্রীতম একা একা কথা বলে, তোমাদের দোষ নেই। তোমাদের কাজ তোমরা করছ মাত্র। জীবাণুরাই কি শুধু মারে মানুষকে? মানুষ নিজেও কি মারে না? কষ্ট দেয় না? তোমাদের তা হলে দোষ কী বলো? আমার। তাতে কোনও দুঃখ নেই। শরীরটাই তো শুধু আমি নয়। এই হাত, এই পা, এই চোখ, কান, এগুলো আলাদাভাবে কোনওটাই তো আমি নয়। তবে আমি কেন তোমাদের শত্রু ভাবব? তোমরা একটা বাসা দখল করেছ মাত্র, তোমরা জোগাড় করছ বেঁচে থাকার রসদ। অন্যায় ভাবেও তো নয়। বেঁচে থাকার জন্য মানুষও তো কত কী করে। তবু বলি, আমাকে তোমরা ছুঁতে পারেনি আজ পর্যন্ত। কী করে পারবে? দেহটাই তো আর আমি নয়। এর ভিতরেই কোথাও আছে আর-এক আমি, তাকে স্পর্শ করা যায় না।
খুবই আন্তরিকভাবে কথাগুলি বলে প্রীতম। আর তখন তার পুবের জানালার অন্ধকার ক্রমে ফ্যাকাসে হতে থাকে। ভবানীপুরের এই গলির মধ্যে সরাসরি জানালার ওপর সূর্যের আলো এসে পড়ে না প্রথমেই। একটু সময় নেয়। ততক্ষণ এবং যতক্ষণ বিলু না ওঠে এবং চতুর্দিকের কাজকর্ম যতক্ষণ না শুরু হয় ততক্ষণ ঠোঁট অবিরাম নড়ে যায় প্রীতমের। ততক্ষণে সে এক ভয়াবহ লড়াই চালিয়ে যায়। এবং টিকে থাকে একের পর এক দিন।
