বীথিকে বিশ্বাস না করে উপায় নেই।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল দীপনাথ। বীথি তাকে দেহ দিয়েছিল। সেটা বড় কথা নয়। সেজন্য বীথির কাছে তার কোনও ঋণ নেই। কিন্তু সুখেনের কাছে আছে। সুখেন তাকে বড় ভালবাসত। এই লোকটা ছিবড়ে হয়ে যাক তা সে চায় না।
হাসির একটা ব্যর্থ চেষ্টা করে দীপনাথ বলল, লোকটা এ পর্যন্ত কত টাকা নিয়েছে?
হাজার পাঁচেক।
আরও কত চায়?
তার কিছু ঠিক নেই। আমার সঙ্গে দেখা হয় না। বীথিকে এসে শাসায়।
শাসাক না! কোর্টে অ্যাডালটরি প্রমাণ করা কি খুব সোজা? আপনি টাকা দেওয়া বন্ধ করুন।
রান্নাঘবে কাপ-ডিশের শব্দটার দিকে কান রেখেছিল দীপনাথ। শব্দটা বন্ধ হতেই মুখে কুলুপ আঁটল। বীথি আসছে।
চা নিয়ে বীথি ঘরে ঢুকতে তার মুখের দিকে খুব ভাল করে চেয়ে দেখে দীপনাথ। তার জীবনের প্রথম নষ্ট মেয়েমানুষ। এরই সঙ্গে তার জীবনের প্রথম আনন্দ। একে সে কখনও বিশ্বাস করেনি। করা যায় না। সুখেন অন্ধ, তাই বিশ্বাস করে।
কিন্তু এই খপ্পর থেকে সুখেনকে বের করে নেওয়ারও কোনও উপায় নেই। বোকাটা ছিবড়ে হবে।
চা খেয়ে উঠে দাঁড়ায় দীপনাথ। বলে, সুখেন, একটু এগিয়ে দেবেন নাকি শেষবারের মতো!
বীথি হাসল, এগিয়ে দেওয়ার মতো অবস্থা আছে কি না দেখুন। বিকেল থেকে টানা দু’ঘণ্টা ড্রিংক করেছে।
ওর ড্রিংক করা আপনি কমাতে পারেন না?-বীথিকে খুব হালকা গলায় জিজ্ঞেস করে দীপনাথ।
কথা শুনলে তো!
ঠিকমতো বারণ করুন, শুনবে।
বীথি কথাটা নিল না। মোড় ফিরে বলল, আমাদের জন্য কী পাঠাবেন ওখান থেকে?
কী পাঠালে খুশি হবেন?
যা আপনার খুশি। মনে রাখতে পারি এমন কিছু।
কেন? এমনিতে মনে থাকবে না?
কী যে বলেন! থাকবে না আবার! সুখেন তো এখনও সারাদিন আপনার কথা বলে।
বলে?
ভীষণ বলে।
সুখেন টপ করে উঠে গিয়ে লুঙ্গি ছেড়ে একটা প্যান্ট আর হাওয়াই শার্ট পরে বেরিয়ে এল, চলুন দাদা। বীথি, আমার ফিরতে রাত হবে।
কোথায় চললে?
দাদা দূর দেশে চলে যাচ্ছেন। কোথাও গিয়ে একটু বসে সুখ-দুঃখের কথা বলে আসি।
সে তো এখানে বসে বললেই হয়।
না গো, সে আমাদের আলাদা জায়গা আছে।
বলে দেরি না করে দীপনাথকে একদম ঠেলতে ঠেলতে বেরিয়ে আসে সুখেন। তারপর অভ্যাসবশে টানা রিকশা ভাড়া করে।
একটু হেসে দীপনাথ বলে, মোড়ে আমার গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। চলুন।
গাড়ি! ওঃ বাব্বাঃ!
অবাক হওয়ার কিছু নেই। অফিসের গাড়ি।
পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে সুখেন বলে, আমার টানা রিকশার মতো ভাল আর-কিছুকে লাগে না।
গাড়িতে উঠে দীপনাথ জিজ্ঞেস করে, কোথায় যাবেন?
সেই চিনে রেস্তোরাঁয় চলুন।
আমার যে খিদে নেই।
খিদে নেই! তার মানে দাদার এখন টাকা হয়েছে।
তা নয়। খিদের সঙ্গে টাকার সম্পর্ক কী?
আছে। সে পরে হবে’খন। আপনার সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে।
তা হলে চলুন। কথাটা কী?
ওঃ সে অনেক কথা। আমি জীবনে আর কোনও আনন্দ পাচ্ছি না। পাওয়ার কথাও নয় যে!
৮৩. সুখেনের সঙ্গে সন্ধেটা কাটল
সুখেনের সঙ্গে সন্ধেটা কাটল একই সঙ্গে আনন্দে বিষাদে। সুখেন একটু মাতাল ছিলই, আরও হল। ফেরার সময় গাড়িতে বসে বলল, আমি আজ আর বীথির কাছে ফিরব না দাদা। আপনার কাছে থাকতে দেবেন?
বীথি চিন্তা করবে না?
কিসের চিন্তা! আমি নেশাখোর মানুষ, আমার জন্য চিন্তা কী?
নেশা করেন কেন?
নেশা করে ভাল আছি। কোনও ঝামেলায় মনটা জড়ায় না।
আপনার কি খুব ঝামেলা?
মেলা। গায়ে মাখি না বলে।
বীথিকে এখন কেমন লাগছে?
ভাল নয়। আপনার কথাই বোধহয় ঠিক। টাকা থেঁচবার ব্যাপারটায় বীথিও থাকতে পারে। তবে মুখে মাখন।
যদি বীথির নেশা কেটে গিয়ে থাকে, তবে এবাব কেটে পড়ুন না!
সুখেন অসহায়ভাবে নিজের কোলে মুখের এক দলা নাল ফেলে বলে, কোথায় যাব? পড়ে থাকার একটা জায়গা চাই তো। একটা মেয়েছেলে দেখাশোনা করছে।
কিন্তু টাকার ব্যাপারটা?
সে বীথির স্বামী-ছেলে নেয়, অন্যেও নিত। আমার তো সব ঘুষের পয়সা, যায় যাক। ঘুষের পয়সা এমনিতেও থাকে না।
সুখেন, ইউ আর ইন এ ট্র্যাপ, সেটা কি জানেন?
সুখেন পাকা মাতাল। অনেকটা টেনেও যুক্তিবুদ্ধি হারায়নি। দীপনাথের দিকে চেয়ে বলে, খানিকটা টের পাচ্ছি।
সেই ট্র্যাপে আপনি আমাকেও ফেলতে এসেছিলেন, বিয়িং এ ফ্রেন্ড।
সুখেন মাথা নাড়ল। বলল, তা নয়। আমি দেখতে (য়েছিলাম, মেয়েমানুষের অভিজ্ঞতা না থাকার ফলে আপনার একটা ভালমানুষি রোগ হয়েছে কি না।
কী দেখলেন?
তা নয়। আপনার ভালমানুষিটা খাঁটি। কিন্তু তবু একটা খটকা।
কিসের খটকা?
আপনি দাদা ভালমানুষ বটে, কিন্তু বীথির সঙ্গে শুলেন কেন?
দীপনাথ মদ খায়নি। তবু যেন মাথাটা ঝিম করল হঠাৎ। কপালটা চেপে ধরে বলল, তা আমিও জানি না। হয়তো বীথি সুন্দরী বলে।
সুখেন গম্ভীর হয়ে বলে, আপনি অত সস্তা লোক নন। অন্তত আমার মতো তো নন। বীথির মতো সুন্দরী গন্ডায় গন্ডায় আছে। তো কী?
দীপনাথ ড্রাইভারকে সোজা মেসে ফিরতে বলেনি। ময়দানে গাড়ি ঘুরপাক খাচ্ছে নানা পথে। ড্রাইভার এসব কথা শুনতে পাচ্ছে বলে লজ্জা করল দীপনাথের। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের কাছে গাড়ি থামিয়ে তারা নামে এবং মাঠের ঘাসে বসে পাশাপাশি। এ সময়টুকু দীপনাথ তার পদস্খলনের কথা ভাবল। কিছু ভেবে পেল না। এত সহজে অচেনা এক মেয়েমানুষের সঙ্গে সে যে শুতে পারে, তাও জীবনের প্রথম মহিলা সংসর্গ, তা তার বিশ্বাস ছিল না। নিজের ওপর তার আর-একটু নিয়ন্ত্রণ থাকার কথা। বীথি সুন্দরী বলে নয়, বীথি তাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল বলেও নয়, খুব সম্ভব সেই সময়টায় মণিদীপা তাকে প্রায়ই গা-জ্বালানো কথা বলত। হয়তো সেই সময়টায় তার হতাশা এবং ব্যর্থতার কথা সে বড় বেশি ভাবত।
