স্নিগ্ধদেব আর কী লিখেছে জানেন?
কী লিখেছে?
উনি আপনার লিডার তো?
একশোবার। স্নিগ্ধদেব লাল সেলাম।
শুনুন। স্নিগ্ধ লিখেছে, আমেরিকা প্রথম এক মাস বিস্ময়কর, দ্বিতীয় মাসে উপভোগ্য, তৃতীয় মাসে চমৎকার, চতুর্থ মাসে মৃদু উদ্বেগজনক, পঞ্চম মাসে আরও উদ্বেগজনক, ছ’মাসে বিরক্তিকর, এক বছর পর আমেরিকার মধ্যে একটা আফ্রিকার জঙ্গলের চেহাবা ধবা পড়ে যায়।
ওঃ, ওসব কে না জানে! আমেরিকা হচ্ছে পৃথিবীর সর্বাধিক আলোচিত দেশ। সবাই আমেরিকার সব খবর রাখে।
তবু কথাটা কিন্তু আপনার লিডারের।
তা বটে। কিন্তু আমি এমন কথা বলিনি যে, উনি এখনও আমার লিডার। আমি বলেছি, উনি আমার লিডার ছিলেন।
মণিদীপা একটু ছটাকে হাসি হেসে বলে, উনি কখনও আপনার লিডার ছিলেন না। কেউ কখনও আপনার লিডার ছিল না। থাকলে আপনার আজ এত দ্বিধা দেখা দিত না জীবনে। কমিটমেন্ট না থাকলে মানুষের যেমন ফ্লোটিং নেচার হয় আপনার ঠিক তেমনি।
দীপনাথ একটু হেসে বলে, আপনি আজ সেই পুরনো ফর্মে আছেন।
কিন্তু আপনি তো সেই বেকার ভালমানুষ দীপনাথটি নেই। পালটে গেছেন, অনেক পালটে গেছেন।
খারাপ হয়ে গেছি নাকি?
ভাল কি ছিলেন?
বোস সাহেবের বিশাল দেহ থেকে একটি উদগার বেরিয়ে এল। রেফারির দায়িত্বটা নেওয়া উচিত মনে করে বোস বলল, রিসেস রিসেস। পরের রাউন্ড দীপার খাওয়ার পর।
মণিদীপার মুখ-চোখ থমথমে। বদ্ধ রাগে-আক্রোশে ফেটে পড়ছে।
দীপনাথ উঠে পড়ল। সঙ্গে বোস সাহেবও।
সামনের বারান্দায় চেয়ার পাতা ছিল। বোস আর দীপনাথ এসে বসল মুখোমুখি।
চুপচাপ অনেকটা সময় কেটে যাওয়ার পর বোস বলল, স্টেটসে আমি গিয়েছিলাম বছর দশেক আগে। এখন অনেক কিছু পালটে গেছে।
তাই হবে।—উদাসীন জবাব দেয় দীপনাথ।
একটা কথা বলব?
কী?
উই আর গ্রেটফুল টু ইউ ফর মেনি থিংস। কিন্তু আমি বা দীপা কেউ অকৃতজ্ঞ নই। থ্যাংকস ফর এভরিথিং ইউ হ্যাভ ডান অর ট্রায়েড টু ড়ু ফর আস।
দীপনাথ মৃদু হেসে বলে, আমার জীবন কিছু চেষ্টারই সমষ্টি মাত্র। কিন্তু কিছুই আমার দ্বারা হয়নি। সব চিড় কি জোড় খায়? চেষ্টা কি আমরাও কম করেছি?
কী হবে বোস সাহেব?
আই অ্যাম প্যাসিভলি ওয়েটিং ফর সামথিং টু হ্যাপেন। কিন্তু সেটা যে কী তাও জানি না। হয়তো কিছু একটা হবে। হয়তো হবে।
হোক বোস সাহেব, হোক। আমি আজ উঠি।
দাঁড়ান, দীপা খেয়ে আসুক।
দীপনাথ মাথা নাড়ে, না। আমার একটু কাজ আছে।
বোস সাহেব বুঝদারের মতো মাথা নেড়ে বলে, জানি, ইটস এ বিট সাফোকেটিং ফর ইউ। গুডনাইট দেন।
গুডনাইট।
লেক গার্ডেন্স-এর ফ্ল্যাটটা বুকড হয়ে গেছে কিন্তু।
ধন্যবাদ।
বেরিয়ে আসার সময় খাওয়ার ঘরে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে দীপনাথ। সে জানত, মণিদীপা এখন খাবে না। হয়তো আজ রাতেই খাবে না। ঠিক তাই। মণিদীপা নেই।
মুখ ঘুরিয়ে মণিদীপার ঘরের দরজাটা দেখল দীপনাথ। আঁট করে বন্ধ।
যা ত্যাগ করতে হবে তার দিকে আকৃষ্ট না হওয়াই ভাল। দীপনাথ নেমে আসে দোতলা থেকে। গাড়িতে ওঠে। তারপর মণিদীপার কাছ থেকে বহু দূরের পার্থক্য রচনা করার জন্য মনে মনে প্রস্তুত হয়।
একদিন সকালবেলা হঠাৎ দীপনাথের মনে হল, কেমন আছে সুখেন্দু আর বীথি?
সেইদিনই অফিসের পর তার গাড়ি এসে থামল গড়পাড়ে বীথির বাসার সামনে।
তাকে দেখে যেরকম হইচই পড়ে যাবে বলে ভেবেছিল দীপনাথ, তা হল না। যথারীতি দরজা খুলে বীথি বলল বটে “ওমা! কী ভাগ্যি!” কিন্তু গলায় সেই উত্তাপ এল না। সেই প্যাশন তো নয়ই।
সামনের ঘরেই লুঙ্গি পরে সুখেন বসে। মুখে ভারী অমায়িক হাসি। কিন্তু তা অমায়িকতার বেশি কিছু নয়। দীপনাথের মনে হল, এখন এ বাড়িতে চৌকাঠের গভীরে ঢোকা তার বারণ।
বীথি খাবার নিয়ে এল। মেলাই খাবার। মিষ্টি, কেক, ওমলেট। সেসব ছুঁলই না প্রায় দীপনাথ।
সুখেনকে জিজ্ঞেস করল, কেমন আছেন?
একটু আগেই বোধহয় বড় করে এক ডোজ টেনেছে সুখেন। মুখটা বিকৃত করে বলল, আর দাদা ভাল-মন্দ! সব সমান।
বীথি ঘরে ছিল না। দীপনাথ নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল, বিয়ে করে ভাল লাগছে না?
বিয়ে আবার কী! দাদার যে কথা। এসব আবার বিয়ে নাকি? একসঙ্গে থাকা, কনট্রাক্ট। আজ আছি, কালই যে যার পথ দেখব হয়তো।
বীথির স্বামীর খবর কী?
খবর গণ্ডগোলের। ছেলেও বিগড়েছে।
আপনি তা হলে সুখে নেই বলুন?
খুব সুখে আছি দাদা। খুব সুখে।—বলে সোফার পাশে মেঝেয় আড়ালে রাখা একটা বোতল তুলে অল্প একটু গলায় ঢেলে ছিপি আটকে সরিয়ে রাখে সুখেন। তারপর বলে, হারামির বাচ্চা জেল থেকে বেরিয়ে অবধি কেবল টাকা ঝাকছে।
কে বলুন তো?
বীথির হাজব্যান্ড।
টাকা কেন?
বলছে টাকা না পেলে কেস করবে।
ডিভোর্স হয়নি?
না। মামলা সবে কোর্টে উঠেছিল। ভেবেছিলাম, ব্যাটা যখন ঘানি টানছে তখন আর চিন্তা কী? কিন্তু শালা তিন-তিনটে কেসে কী করে যে প্যারোল পেয়ে গেল! এদিকে আমরা আহাম্মকের মতো কাগজে সইসাবুদ করে বসে আছি।
লোকটা কি ভয় দেখাচ্ছে?
খুব দেখাচ্ছে। বীথিকে নয়, আমাকে। বলছে কী ওই ইংরিজি কথাটা—অ্যাডালটরি না কী যেন, তাইতে ঘানিতে ঘোরাবে।
ছেলে কী বলছে?
সে তো আর-এক কেলো। ছেলে আর বাপ হাত মিলিয়ে ফেলেছে।
হঠাৎ সন্দিহান দীপনাথ প্রশ্ন করে, শুধু ছেলে আর বাপ? ছেলের মাও নেই তো?
কে, বীথি? কী যে বলেন।
শুনুন সুখেন। আমি আমেরিকা চলে যাচ্ছি। বহুদিন আপনার সঙ্গে দেখা হবে না। সারাজীবনেও না হতে পারে। তাই বলে যাচ্ছি, আপনি সবাইকে অতটা বিশ্বাস করবেন না।
