সুখেন মদ খেলেও নিজেকে চমৎকার রাশ টেনে রেখেছে। প্রায় স্বাভাবিক গলায় বলল, বীথির সঙ্গে যা করেছেন সেটা এমন কিছু সাংঘাতিক কাণ্ড নয়। রোজ হাজারে হাজারে লোক প্রাকৃতিক কাজ সারতে মেয়েছেলের কাছে যায়, দরাদরি করে, একেবারে বাজারহাট করার মতো ইজি জিনিস। কিন্তু আপনি যেই কাণ্ডটা করলেন অমনি আমার ভিতরে কী যে একটা হল!
কী হল বলুন তো?
একটা বিশ্বাস ভেঙে গেল। মনে হল সবাই তা হলে রক্তমাংসের মানুষ। আমার মতোই।
আমি তো তাই-ই।
সে তো জানি। তবু কাউকে একটু ওপরের মানুষ ভাবতে ভাল লাগে তো। পৃথিবীর সবাই আমার মতো দোষে-গুণে মানুষ, এটা যদি সত্যি হয় তা হলেও বিশ্বাস করতে ইচ্ছে যায় না।
পৃথিবীর সবাই আপনার আমার মতো নয় সুখেন। ওপরের মানুষ অনেক আছে। কিন্তু সে দলের আমি নই।
কেন হলেন না দাদা?–বলে সুখেন দীপনাথের একটা হাত আলতো করে ধরে। বলে, পরদিন আমার এমন রাগ হয়েছিল বীথির ওপর যে, খামোখা একটু কথা-কাটাকাটি লাগিয়ে একটা থাপ্পড় কষিয়েছিলাম গালে।
বীথির তত সব দোষ নয়।
জানি। কিন্তু আমার বিশ্বাসটা যে চলে গেল তার জন্য কারওর ওপর তো ঝাল ঝাড়তে হবে।
দীপনাথ একটা বড় শ্বাস ছেড়ে বলে, সেই সময়ে আমি স্বাভাবিক ছিলাম না।
আপনাকে আমার এখনও ভক্তি হয়। বীথি আর আমি আপনার কথা অনেক বলি। আপনি বীথির সঙ্গে শুয়েছেন বলে হিংসেটিংসে করব এমন বালাই আমার নেই। মাতাল মানুষ, আমার কোনও টানও তেমন নেই। বীথি যে এখনও কেবল আমাকে নিয়েই আছে তা নয়।
বীথি কি এখনও–?
কথাটা শেষ করল না দীপনাথ। একটু বিহ্বল হয়ে তাকিয়ে রইল।
সুখেন বলে, নয় কেন? মেলা টাকা, মেলা সুযোগ, মেলা প্রভাব রোজগার করছে বীথি। ওর হাড়ে-হারামজাদা স্বামী কি এমনি-এমনি ছাড়া পেল জেল থেকে? বীথি কলকাঠি না নাড়লে?
আপনি চুপ করে থাকেন?
আমার কিছু করার নেই। কী করব, কেনই বা করব? আমার তো পড়ে থাকার একটা জায়গা আর একটা দেখাশোনার একজন মানুষ, তা পেয়ে গেছি। বাদবাকিটা আনইমপর্ট্যান্ট।
আমি আপনার মতো নির্বিকার মানুষ দেখিনি।
নির্বিকার? না ঘোর বিকার? ব্রহ্মজ্ঞানীরা দুনিয়ার সব কিছুকে মায়ার খেলা বলে মনে করে, আমার মতন লোকদের ফিলিংও তাই প্রায়। আমার কাছে সবটাই তামাশার মতো লাগে।
কিন্তু বীথি কি চিরকাল আপনার দেখাশোনা করবে? টাকা যখন বন্ধ হবে তখন?
ওঃ, সে অনেক পরের কথা। এখনও আমি দু’হাতে রোজগার করি, চার হাতে ওড়াই। বীথি আমাকে এখনও কিছুদিন যত্নআত্তি করবে। তারপর তাড়াবে একদিন বোধ হয়। আবার না-ও তাড়াতে পারে।
বীথির ওপর আপনার এখনও একটা বিশ্বাস আছে তা হলে।
সুখেন মাথা নেড়ে বলে, না। তবে বীথির বয়স চল্লিশ পার। দিনে দিনে বুড়ো তো হচ্ছে। তারপর স্বভাবগুণে বাজারটা এমনই করে ফেলেছে যে, কেউ ওকে বিশ্বাস করে না। এসব মেয়েছেলে বুড়ো বয়সে ভারী একা আর অসহায় হয়ে পড়ে। তখন আর কাউকে না পেলে হয়তো আমাকেই আঁকড়ে ধরে থাকবে।
সেই আশা?
না, আশা-টাশা নয়! আমি সব কিছুর জন্যই প্রস্তুত। যা হওয়ার হবে। ও নিয়ে ভেবে লাভ নেই।
চলুন মেসে ফিরি।
চলুন। আমার ঘুম পাচ্ছে।
আমার ওখানেই যাবেন?
সুখেন হাসল, ইচ্ছে করলে আপনিও আমার ওখানে আসতে পারেন। আমেরিকা যাওয়ার আগে বীথির সঙ্গে যদি আর-একবার ঘনিষ্ঠতা করতে চান।
সুখেন!–একটা ধমক দিল দীপনাথ।
সুখেন খুব হেসে নিয়ে বলল, যাহা বাহান্ন তাহা তিপ্পান্ন।
এ কথায় রেগে যেতে পারত দীপনাথ। কিন্তু রাগল না। সত্যিই তো। যাহা বাহান্ন তাহা তিপ্পান্ন ভেবেই কি প্রথমবারের পরও আরও বার কয়েক বীথির কাছে যায়নি! প্রথমবারই খিলটা খুলে দিতে যা বাধা ছিল। তারপর অবারিত দ্বার। রাগল না বটে, কিন্তু দীপনাথের একটু দুঃখ হল। সুখেনের কাছে সে এক সময়ে অতিমানব ছিল, আজ আর নেই। না রেগে তাই সে একটু করুণ করে হাসল।
পরদিন সকালে সুখেন ঘুম থেকে উঠে গদাই লস্করি চালে চা খেল, প্রাতঃকৃত্য সারল। তারই ফাঁকে ফাঁকে বলল, তার কোনও দুঃখ নেই। দীপনাথ যেন তার জন্য চিন্তা না করে।
দীপনাথ তার পুরনো বিলিতি কম্বলটা আর কিছু বই, একটা পুরনো পার্কার কলম উপহার দিতে চাইল সুখেনকে। সুখেন নিল না। বলল, ও তো আমি নিলেও রাখতে পারব না। বীথির স্বামী বা ছেলে এসে এক ফাঁকে নিয়ে যাবে। এই সেদিন পঁচানব্বই টাকা দিয়ে এক জোড়া চপ্পল কিনেছিলাম। হাপিস।
দীপনাথের অফিসের গাড়িতে উঠেই এসপ্লানেড অবধি এল সুখেন। তারপর নেমে গেল। দীপনাথের মনে হল, সুখেনের সঙ্গে এই শেষ দেখা। আর হয়তো দেখা হবে না। ওরকম অদ্ভুত জীবনযাপন করতে করতে সুখেন শেষ অবধি কোথায় পৌঁছবে তা ভাবতে ভাবতে বড় ভারাক্রান্ত হয়ে গেল দীপনাথের মন।
জীবনে প্রথম প্লেনে উঠতে ভয় পাচ্ছিল বিলু। মুখ শুকনো, চোখে দুশ্চিন্তা।
প্যাসেঞ্জার লাউঞ্জে আনমনে বসে থেকেও দীপনাথ বিলুকে লক্ষ করল। একটু হাসল। প্লেনে প্রথম প্রথম উঠতে একটু ভয় সকলেরই করে। অস্বাভাবিক নয়। তবে বিলুর তো ভয় থাকার কথা নয়। যার অসুস্থ রোগা স্বামী নিরুদ্দেশ, জীবনে তার আর ভয় পাবার কী আছে!
লাবু লাউঞ্জের কাছে মুখ লাগিয়ে এয়ারোড্রমে দাঁড়ানো প্লেন দেখছিল। মাঝে মাঝে ছুটে এসে দীপনাথকে জিজ্ঞেস করছে, এত বড় প্লেনগুলো সব ওড়ে? কী করে ওড়ে মামা, পড়ে যায় না?… ওই সাদা প্লেনটা বিলেতে যাবে?… আমেরিকায়?… আমরা কখন উঠব?
