আপনি কি তাই?
আমি এ লাইনে নতুন। তবে অভিজ্ঞতা থেকে জানি।
বোস সাহেব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, কথাটা ঠিক।
আসুন, খেতে দিই।—বলে মণিদীপা উঠল।
যখন খেতে বসার আগে বেসিনে হাত-মুখ ধুচ্ছিল দীপনাথ তখন মণিদীপা কাছে এল আচমকা। মৃদু স্বরে বলল, অনেক দূর। কেন যাচ্ছেন?
চাকরি।
মণিদীপা ঠোঁট কামড়ে একটু হাসে, আমেরিকায় না গেলেও দূরই তো ছিলেন। এ থাউজ্যান্ড লাইট-ইয়ারস।
দূরই ভাল।
ভুলে যাবেন?
সব কি ভোলা যায়? বোসকে দেখবেন। উনি খুব হেলপলেস।
জানি। আমিও তো হেলপলেস।
দু’জনেই হেলপলেস হলে আশা আছে। ইউ ক্যান হেলপ ইজ আদার।
ওসব থিয়োরি, থিয়োরি। জীবন ওরকম নয়।
» ৮২. কী খাচ্ছে, রান্না কেমন হয়েছে
কী খাচ্ছে, রান্না কেমন হয়েছে এসব টের পাচ্ছিল না দীপনাথ! খেতে হবে বলে মুখ নিচু করে খাচ্ছে মাত্র। বহুদিন বাদে মণিদীপার সঙ্গে এই দেখাটা না হলে বুকের মধ্যে পুরোনো ক্ষতের মুখ নতুন করে খুলে যেত না। কষ্ট হত না।
সে বলেছিল, পাত্রী পছন্দ নয়। সেটা মিথ্যে কথা। মণিদীপাকে সে বহুকাল ধরে ভালবাসে। শুধু চৌকাঠ ডিঙোয়নি। ইচ্ছে করলেই ডিঙোনো যেত। আজও ওদের স্বামী-স্ত্রীর যা সম্পর্ক তাতে দীপনাথ এখনও চাইলে অনায়াসে মণিদীপাকে পেতে পারে। কিন্তু কোথায় একটা নৈতিক বাধা, বিবেকবোধ এসে পথ জুড়ে দাঁড়ায়। সজাগ হয়ে ওঠে নানারকম যুক্তিবুদ্ধি, বিধিনিষেধের বোধ। এই জন্যেই কি মাঝে মাঝে তাকে ব্যক্তিত্বহীন বলে গাল দিত মণিদীপা?
ডিনারটা যত আনন্দের হতে পারত ততটা হল না। বোস চুপ। মণিদীপা পরিবেশন করছে।
দীপনাথ কথা খুঁজে পাচ্ছিল না। হঠাৎ একবার জিজ্ঞেস করল, আমেরিকায় স্নিগ্ধদেবেব ঠিকানাটা জানেন?
মণিদীপা একটু শক্ত হয়ে গেল। বলল, কেন?
ভদ্রলোক যখন এ দেশে ছিলেন তখন দেখা হয়নি, এখন বিদেশে একবার দেখা করার চেষ্টা করব।
দেখা করবেন কেন?
দীপনাথ মুখে বিস্ময় ফোটানোর চেষ্টা করে বলে, কেন বলিনি আপনাকে? উনি যে আমারও লিডার ছিলেন।
মণিদীপা মাথা নেড়ে বললে, দেখা করবেন না দয়া করে।
কেন বলুন তো?
কী লিখেছে আমাকে জানেন?
কী?
লিখেছে ভারতবর্ষের প্রোলেতারিয়েতদের চরিত্র আলাদা। তাদের দিয়ে কিছুই হওয়ার নয়। এত অপদার্থ এলিমেন্ট পৃথিবীর কোথাও নেই। প্রতি তিনজন ভারতবাসীর একজন চোর, অন্যজন অলস, তৃতীয়জন কাপুরুষ। আরও লিখেছে, ভারতবর্ষে বিপ্লবী আর অ্যান্টিসোশ্যালের মধ্যে তফাত প্রায় নেই-ই। শুধু পারপাসটুকু আলাদা, নইলে দু’দলই একই কাজ করে। কিছু বুঝলেন?
দীপনাথ হাসিমুখে বলে, এসবই তো কঠোর সত্য। আমিও এরকমই ভেবে রেখেছিলাম। এখন লিডারের মুখে শুনে আরও পেত্যয় হল।
যাদের নিয়ে রসিকতা করা যায় স্নিগ্ধ তাদের দলে পড়ত না। আজ অবশ্য আপনি সবই বলতে পারেন।
আমি রসিকতা করছি না মিসেস বোস।
করলেও দোষ নেই। শুধু প্লিজ, ওর সঙ্গে দেখা করবেন না।
আমি শুধু ভাবছি এই তিনজনের মধ্যে আমি কোন জনা!
কে তিনজন?
ওই যে স্নিগ্ধ লিখেছেন একজন চোর, একজন অলস, একজন কাপুরুষ।
বোস সাহেব নিপাট ভালমানুষি মুখে শুনতে শুনতে এতক্ষণ একটা মাছের মাঝের কাটা চিবোচ্ছিল। হঠাৎ বোস বলে, তৃতীয়জন।
দেন কাওয়ার্ড।–বলে দীপনাথ বোস সাহেবের মুখের দিকে তাকায়।
বোস মাথা নাড়ে, দি টার্ম স্যুটস ইউ, স্যুটস মি, স্যুটস এভরিবডি।
মণিদীপা একটু ফ্যাকাসে হয়। এই কথার খেলার মধ্যে গোপনে একটু হুল দেওয়ার চেষ্টাও কি নেই! দীপনাথকে বুনু কেন কাওয়ার্ড বলবে?
মৃদু স্বরে মণিদীপা বলে, না, দীপনাথবাবু, আপনি কাওয়ার্ড নন।
নই! বলেন কী?
নন। আমি বলছি।
আপনিই তো এতকাল উলটো বলতেন।
মত পালটেছি।
পালটালেন কেন? কোনও বীরত্বের কাজ করেছি নাকি?
তাও করেননি।
তা হলে?
কিছু লোক থাকে, তারা কাওয়ার্ডও নয়, হিরোও নয়। নিস্পৃহ। নিস্পৃহদের কি কাওয়ার্ড বলা যায়?
নিস্পৃহ মানে কি ইন-অ্যাকটিভ?
পুরোপুরি নয়। কোনও কোনও ব্যাপারে ইন-অ্যাকটিভ।
একজ্যাক্টলি।-বলে বোস সাহেব একটু হাসে, আপনি নিজের কর্মক্ষেত্রে অসুরের মতো বলবান। কিন্তু অ্যাজ রিগ্যারডস আদার আর্থলি ম্যাটারস আপনি এক নম্বরের প্রাচীনপন্থী।
প্রাচীনপন্থী মানে কি ইন-অ্যাকটিভ?
তা নয়। কিন্তু এই বাঁধনছেড়া যুগে প্রাচীনপন্থীরা তো কিছুই করতে পারে না। তাই বাধ্য হয়ে তারা জীবনের স্রোত থেকে সরে গোঁজ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। দ্যাট ইজ ইন-অ্যাকটিভনেস।
দীপনাথ মণিদীপার দিকে চেয়ে বলে, আমার আর কী কী ড্র-ব্যাক আছে বলবেন?
অনেক। কিন্ত বুনু যা বলল তা আমার কথা নয়। আমি প্রাচীনপন্থীদের পছন্দ করি। আপনি সেই হিসেবে প্রাচীনপন্থীও নন।
তা হলে?
আপনি নিজেই জানেন না কোনটা ভাল! রক্ষণশীলতা, না প্রগ্রেসিভনেস! তাই আপনার গোটা লাইফ-স্টাইলটাই দ্বিধায় জড়িত।
এটা কি আমার ফেয়ারওয়েল ডিনার, না অন্য কিছু?
এটা আপনার ফেয়ারওয়েল ডিনার নয়। ফেয়ারওয়েল আবার কী? ছ’মাসের জন্য যাচ্ছেন তো!
ছ’মাসের জন্য যাচ্ছি বটে, কিন্তু অফার পেলে সারাজীবন থেকে যাব।
কেন?
আমার তো পিছুটান নেই। দায়-দায়িত্ব নেই।
আর কিছু?
এই দেশ আমার ভালও লাগে না। স্নিগ্ধদেব তো মিথ্যে কথা লেখেননি। তবু তো স্নিগ্ধদেব এ দেশের মুক্তির জন্য কিছু করার চেষ্টা করেছিলেন। আমি তাও করিনি। এখন জানি, করলেও কিছু হবে না। দিনের পর দিন মতলববাজদের পলিটিকস, মানুষের তৈরি করা মানুষের দুর্ভোগ, সবরকম অনিয়ম আর বিশৃঙ্খলা সহ্য করে থেকে যেতে হবে। তার চেয়ে সেই দেশ ভাল। সাদা মানুষরা সেখানে একটা মোটামুটি ভাল জায়গা তৈরি করে রেখেছে।
