রঘু বউকে বলে, কু-বাক্যি না বলছে কে? তোমারটা তো পুরনো হয়ে গেছে, এর কাছে একটা নতুন রকম শুনি না হয়।
আহা, আমার কথা আলাদা। আমি ঘরের লোক বলি সে একরকম। তা বলে নিতাই বলবে কেন?
রঘু খুব ভাবুকের মতো বলে, কুবাক্যি শোেনা কিছু খারাপ নয়। তাতে মন মেজাজ পরিষ্কার হয়ে যায়, মনের ময়লা কেটে যায়, শরীরটাও চনমনে হয়ে ওঠে। বলরে, নিতাই!
জিভ কেটে রঘুর বউ ঘরে ঢুকে যায়।
নিতাই এখন সেয়ানা হয়েছে। কোমরে হাত দিয়ে রঘুকে বলে, আমাকে দিয়ে মেহনত করাবে তো বাপ! তোমার চালাকি জানি। তুমি হচ্ছ সেই স্যাকরা যে নিজের মায়ের সোনা চুরি করে। আগে বলল চা খাওয়াবে, তবে বলব।
খাওয়াব।–রঘু বলল। তারপর সামনের একটা মস্ত জামরুল গাছের তলায় গিয়ে ঠ্যাং ছড়িয়ে গুঁড়িতে ঠেসান দিয়ে বলল, শুরু করে দে।
নিতাই অমনি শুরু করল, তুমি শালা শুয়োরের বাচ্চা…
এমন মুখ চোটাল নিতাই যে রাজমিস্ত্রিরা পর্যন্ত কাজ থামিয়ে হাঁ করে শুনছিল। বাপ-মা চৌদ্দপুরুষ ধরে সে কী গালাগাল! রঘু চোখ বুজে বসে মাথা নাড়ে আর মিটিমিটি হাসে। মাঝে মাঝে বলে ওঠে, হোত আচ্ছা। চালাও।
নিতাই একটু ঝিমিয়ে পড়েছিল। আবার চনমনে হয়ে রঘুর বউ মেয়ে থেকে শুরু করে মা মাসির কেচ্ছা গাইতে শুরু করে দিল।
আধ ঘণ্টাখানেক ঝিম ধরে বসে শুনল রঘু।
ঠোঁটের কোণে ফেনা তুলে নিতাই থেমে দম নিতে নিতে বলল, এবার চা খাওয়াও মাইরি। রোজ রোজ বিনিমাগনা তোমার ভূত ঝেড়ে দিই, কিছু চেয়েছি কখনও?
রঘু তার মেয়েকে ডেকে নিতাইকে চা দিতে বলে দেয়। ফুড়ুক ফুড়ুক হাসছে রঘু। একটু আগের ম্যাড়ম্যাড়ে চেহারাটায় এখন যেন একটু জলুস খুলেছে। বলল, আহা, কী শোনালি রে নিতাই! এমন বহুকাল শুনিনি।
এক গ্লাস চা রোজগার করে ভারী খুশি হয় নিতাই। গাছের তলায় বসে রক্তাম্বরে পেঁচিয়ে গরম পেতলের গ্লাসটা ধরেছে সাপটে। ইস্পাত মাঝে মাঝে কোলে লাফিয়ে উঠে গ্লাসের গন্ধ শুকছে।
রঘু মিস্ত্রিদের কাজ দেখতে দেখতে বলে, ও বাড়ির খবরটবর আছে নাকি রে কিছু?
নিতাই উদাস গলায় বলে, খবর আর কী? বাবু আর গিন্নির মুখ দেখাদেখি নেই।
সে তো পুরনো কেচ্ছা।
আজ এইমাত্র একটা নতুন ছোকরা এসে ঢুকল। কাঁধে ব্যাগ। দেখে মনে হয়, বাড়িতে সেঁধিয়ে গেল পাকাপাকি। ছোট মামাবাবুর আসার কথা ছিল। বোধহয় সে-ই।
মামাবাবু কাকাবাবু অনেক আসবে এখন। নরক গুলজার হবে। চোখ কান খোলা রাখিস। কাল রাতে বাবু বাড়ি ফিরেছিল?
ফিরেছিল।
কদিন ফিরছে না খেয়াল রাখিস।
চায়ে চিনি কম হয়েছে রঘুবাবু। তোমার মেয়েকে একটু চিনি দিয়ে যেতে বলো।
চিনি সস্তা দেখলি? এক ডেলা গুড় নে বরং।
তাই দাও। হাত আসুক।
এক জায়গায় বসে থাকলে নিতাইয়ের কাজ চলে না। গুড়ের ডেলাটা মুড়ির কোঁচড়ে ভরে চা-টা তলানি পর্যন্ত খেয়ে উঠে পড়ল নিতাই।
পথে নামতেই মুখোমুখি কালো এবং গম্ভীর প্রকৃতির মদন ঠিকাদারের সামনে পড়ে গেল। এ লোকটাকে কেন যেন একটু ভয় খায় নিতাই। মাঝে মাঝে মদনকেও বাণ মারে সে।
মদন ভ্রু কুঁচকে গম্ভীর গলায় বলে, এতক্ষণ ওসব অসভ্য কথা বলে কাকে গালাগালি করছিলি?
তা আমি কী করব? স্যাকরা শুনতে চায় যে।
শখ করে কেউ গালাগাল শোনে?
শোনে কি না রঘুকেই জিজ্ঞেস করে না! দেখা হলেই আমাকে খোঁচায় বলার জন্য।
মিছে কথা বলবি তো মুখ ভেঙে দেব।
বলতে বলতে মদন ঘুসি পাকিয়ে এক পা এগোতেই ভারী আত্মসম্মানে ঘা লাগে নিতাইয়ের। এটা কেমন কথা যে, যার তার হাতে সে বরাবর মারধর খাবে, আর অপমান সহ্য করবে?
নিতাই দু পা পিছিয়ে গেল বটে, কিন্তু আঙুল তুলে শাসিয়ে বলল, খবরদার মদন! বদন বিগড়ে দেব কিন্তু।
কিন্তু মদটা চিরকেলে ডাকাবুকো। লাফিয়ে এসে এক খামচায় জটা ধরে ফেলল। নিতাই দেখল, গায়ের জোরে পারবে না। টানতে গেলে জটাও ছিড়বে। সুতরাং সে দু’হাত ওপরে তুলে নাচতে নাচতে বিকট সুরে চেঁচাতে থাকে, ব্যোম কালী! ব্যোম কালী! মহাকালী প্রলয়ংকরী! ভাসিয়ে দে মা! ড়ুবিয়ে দে মা! জ্বালিয়ে দে মা! কানা করে দে। ঠ্যাং ভেঙে দে। শেষ করে দে মা!
মদন ঠিকাদার কালী দুর্গা মারণ উচাটনে বিশ্বাসী নয়। নিতাইয়ের জটা আর দাড়ির কিছু ক্ষয়ক্ষতি হল। মদনের কিলগুলো সাংঘাতিক, চড়ও ভয়ংকর। ফলে নিতাইয়ের কষের দাঁতের গোড়া টনটন করতে লাগল, মাজায় বিষফেঁড়ার যন্ত্রণা। আরও ব্যথা পেত, কেবল নাচানাচির ফলে মদন তেমন জমিয়ে মারতে পারেনি বলে।
মার দেখতে কিছু লোক জুটে গিয়েছিল। শেষমেশ তাদের মধ্যেই দু-একজন এসে ছাড়িয়ে দিল। মদন শাসিয়ে গেল, শ্রীনাথের ছেলেকে তুইই তা হলে অসভ্য গালাগাল শেখাচ্ছিস। কোনওদিন আর মুখ খারাপ করতে শুনলে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারব।
মদন চলে গেলে হি হি করে হাসে নিতাই খ্যাপা। সকলের দিকে চেয়ে বলে, লাগেনি মোটেই। বাহুবন্ধ বাণ চালিয়ে দিয়েছিলাম তো, মদনের হাতে আর শক্তি ছিল না। মারগুলো যেন বাতাসে। ভেসে গেল।
মুখে যাই বলুক, নিতাইয়ের চুলের গোড়া থেকে মাজা পর্যন্ত জ্বালা আর ব্যথা করছে খুব। ভাল করে হাটতে পারছে না। দিনটা ভাল করে গড়ায়নি, এর মধ্যেই যে যার বরাদ্দ তুলে নিচ্ছে। বিড়বিড় করে নিতাই বলতে থাকে, একটাই তো নিতাই বাপ, রয়েসয়ে মারলেই হয়। এই নিতাই হিমালয়ে চলে গেলে কেরানিটা কার ওপর দেখাবে।
মদন শালা লোকও অদ্ভুত। মল্লিবাবুর সে ছিল জিগির দোস্ত। দু’জনের একই সঙ্গে খানাপিনা, একই মেয়েমানুষের কাছে যাতায়াত। মদন ঠিকাদার ছাড়া মল্লিনাথ কারুকে চোখেও দেখতে পেত না। আর মদন ছিল মল্লিনাথের পোষা জীব, এই যেমন ইস্পাত হল খ্যাপা নিতাইয়ের। মল্লিনাথেরও এরকম হঠাৎ হঠাৎ রাগের পারদ লাফিয়ে একশো দশ ডিগ্রিতে উঠে যেত। মল্লিবাবু কত লোককে যে ঠেঙিয়েছে! কিন্তু মদন ঠিকাদার নিজে কখনও মারপিট করত না। তার হয়ে মারপিট করার লোক আছে। কিন্তু আজ হঠাৎ মদনার কী যে হল! নিতাই সহসা বাড়ি ফিরতে সাহস পেল না। মদন যদি গিন্নিমার কাছে গিয়ে লাগিয়ে থাকে যে, সে সজলখোকাকে খারাপ কথা শেখায়?
